রাজধানীসহ সারা দেশে মশার উৎপাত বেড়েছে। দিনের বেলায় উৎপাত তুলনামূলক কম থাকলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। এরমধ্যে গত কয়েক দিন বৃষ্টি হওয়ার পর বাসা-বাড়িতে জাঁকিয়ে বসেছে মশা। উৎপাত থেকে রক্ষা পেতে অন্যসব স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখন সরকারি উদ্যোগে ওষুধও ছিটানো হচ্ছে কম। মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে অনেকেই নিজের ক্ষোভের কথা তুলে ধরছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে। এরইমধ্যে করোনাভাইরাসের কারণে যারা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগ আশানুরূপ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া নিয়ে অসুস্থ হলে চিকিৎসা মিলবে কি না এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে। তবে মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে গত ২ এপ্রিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্টিয়ারিং কমিটি একটি সভা করেছে। সেখানে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে বেশকিছু সিদ্ধান্ত এসেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীতে মশার উৎপাত নিয়ে কথা হয় পূর্ব গোড়ানের বাসিন্দা বাবুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গত বছরের আগস্ট-নভেম্বর মাসে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। সারা দেশে আক্রান্ত হয়ে কয়েক লাখ মানুষ চিকিৎসা নেয়। ওই সময় মশার ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রমে তৎপর হয় সিটি করপোরেশন। সেই সময় মশার ওষুধের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। সাধারণ মানুষের ভোগান্তির পর সরকারি নানা উদ্যোগে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছিল।’
এ বাসিন্দা বলেন, ‘এবার মনে হচ্ছে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। কারণ একদিকে সিটি করপোরেশন হাতগুটিয়ে বসে আছে, অন্যদিকে নিজেরাও বাসা-বাড়িতে স্প্রে দিতে পারছি না। করোনাভাইরাসের ভয়ে দোকানে যাওয়া হচ্ছে না। ফলে এখন কপালে কী আছে কে জানে।’
মুগদা এলাকার বাসিন্দা রুপা রায় মশার উৎপাত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের ক্ষোভ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনে ট্যাক্স দিয়েও আমরা কাক্সিক্ষত সেবা পাই না। তাদের (সিটি করপোরেশন) সবচেয়ে বড় কাজ হলো মশক নিধন। এ কাজেই তাদের সবচেয়ে বেশি গাফিলতি করতে দেখা যায়।’ একই কথা বলেন স্থানীয় একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক আফতাবনগর এলাকার বাসিন্দা উম্মে কুলসুম বন্যা। তিনি বলেন, ‘শহরের যেকোনো এলাকার তুলনায় আফতাব নগরে মশার উৎপাত বেশি। এলাকার খালে মনে হয় মশা চাষ হয়। এ খাল নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। ফলে মাঝেমধ্যে মশার ওষুধ ছিটানো হলেও তা কোনো কাজে আসে না। খাল পরিষ্কার না করলে আমরা মশার হাত থেকে রক্ষা পাব না।’
তবে সিটি করপোরেশনের দাবি, রাজধানীর খালগুলোতে বেশিরভাগ কিউলেক্স মশার জন্ম নেয়। শুধু উত্তর সিটি করপোরেশনের এমন অর্ধ শতাধিক জায়গা আছে যেখানে এ মশা জন্ম নেয়। এসব খালের নিয়ন্ত্রণ সিটি করপোরেশনের হাতে না থাকায় তা পরিষ্কারে তারা টাকা খরচ করতে পারে না। ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, ‘খালের দায়িত্ব বেশিরভাগ ঢাকা ওয়াসাসহ অন্য সংস্থার হাতে। তাই এসব খাল পরিষ্কার মূলত তাদের কাজ। সেখানে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে কোনো অর্থ খরচ করার আইনগত সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।’ এ কর্মকর্তা আরও বলেন, নিজেদের দায়িত্বের বাইরে গিয়েও ডিএনসিসির এলাকায় থাকা ১৮শ বিঘা খালের মধ্যে প্রায় ১২শ বিঘা খাল ইতিমধ্যে তারা পরিষ্কার করেছে।
এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক জরিপে সম্প্রতি ঢাকার মশক ঝুকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোর নাম উঠে আসে। জরিপ অনুযায়ী, দুই সিটির মোট ১১টি ওয়ার্ড মশক ঝুঁকিতে রয়েছে। এরমধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৫টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৬টি ওয়ার্ডের নাম উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, ডিএনসিসির ১, ১২, ১৬, ২০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ড মশক ঝুঁকিতে রয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে ডিএনসিসির ৫, ৬, ১১, ১৭, ৩৭ এবং ৪২ নম্বর ওয়ার্ড।
ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. শরীফ আহমেদ বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে সভা করে খাল পরিষ্কার করতে ঢাকা ওয়াসাকে বলেছি। কারণ কিউলেক্স মশা মূলত খাল ও জলাশয়ে জন্ম নেয়।’
তবে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জানান, খাল ও জলাধার ছাড়াও শহরের বস্তি এলাকা, ময়লার ভাগাড়, ঝোপঝাড়, রাস্তার পাশে থাকা ছোট ছোট টায়ারের দোকান, ঢালাই মেশিন, পরিত্যক্ত পলিথিন, কর্কশিট, বিভিন্ন মার্কেটের পরিত্যক্ত ছাদ, দুই বাড়ির মাঝের ফাঁকা স্থানে বৃষ্টির পানি জমে সেখানে মশা জন্ম নেয়। এছাড়া নির্মাণাধীন ভবনে বিভিন্ন পরিত্যক্ত স্থানে এডিস ও কিউলেক্স দুই ধরনের মশা জন্ম নেয়। তাই সরকার এ বিষয়ে অসচেতন বাড়ির মালিকদেরও আইনের আওতায় আনবে।
এদিকে, মশার উৎপাত নিয়ে সরকার প্রধানের ক্ষোভের পর মশক নিধন ও সম্ভাব্য ডেঙ্গু মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এজন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ে বিভাগের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ২ এপ্রিল দুই সিটি করপোরেশন, ক্যান্টনমেন্ট এলাকা, বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নিয়ে একটি সভাও হয়েছে।
এ সভায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি ভবন, লেক, পার্ক, খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর বা কর্তৃপক্ষ। মশা মারার কাজ করবে সিটি করপোরেশন। দীর্ঘ ছুটির সময় বন্ধ থাকা সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলো থেকে এডিস মশার উৎপত্তি যেন না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।’
সভায় ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ লেকগুলো পরিষ্কার করলে আমরা ওষুধ ছিটাব। তাহলে মশা মরবে। এটাই সময় একসঙ্গে কাজ করার। আমি ১৫ মে দায়িত্ব পাব, তবুও এখন থেকেই কাজ করছি।’
জাতীয় পর্যায়ের গঠিত এ কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়, মশার উৎপত্তিস্থল যেমন শহরের সব খাল, নালা, দুটি বাড়ির মধ্যবর্তীস্থলের অপরিচ্ছন্ন স্থান, কাঁচাবাজার, সরকারি অফিসগুলো, সরকারি আবাসিক স্থাপনা জরুরিভিত্তিতে পরিচ্ছন্ন করা হবে। এডিস মশার বিস্তার রোধে অফিস ছুটিকালীন সব সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের টয়লেটের কমোডগুলো বন্ধ রাখা হবে। নির্মাণাধীন ভবন এবং যেসব সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নিজ উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখবে না বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার অভাবে লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যাবে সেসব ব্যক্তি, স্থাপনার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী বারবার জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নেতৃত্বে পরিচ্ছন্নতা অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। প্রয়োজনে প্রতি ওয়ার্ডে ৮টি সাব কমিটি গঠন করে প্রতি কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ২০ জন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সামাজিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করা হবে। আর মশক নিধনে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার স্বার্থে মন্ত্রণালয়, সব সিটি করপোশেন, ঢাকা ওয়াসা সম্মিলিতভাবে কাজ করবে।
