সাদা-কালোর চৌষট্টি খোপের খেলায় এক সময় (সাবেক) সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্য ছিল অবিসংবাদিত। তখন ঠা-াযুদ্ধের সময়। মার্কিনিদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে টক্কর দিচ্ছে রুশরা। অখ- সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়ার জন্ম হওয়ার আগে দাবার ভুবনে নতুন এক তারকার জন্ম হলো। ১৯৮৫ সালে আনাতোলি কারপভকে হারিয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন গ্যারি কাসপারভ। এরপর ‘সোভিয়েত স্কুল অব চেস’ নামে একটা শব্দ ইতিহাসে জায়গা করে নিল। আর প্রায় দেড় দশক ধরে দাবার দুনিয়া শাসন করলেন কাসপরভ।
আজারবাইজানে জন্ম নেওয়া এই রুশের জন্যই ২৩ বছর আগে এইদিন দাবার ইতিহসে বিখ্যাত হয়ে আছে। ১৯৯৭ সালে আইবিএম কম্পিউটার ডিপ ব্লু’র সঙ্গে কাসপারভের ম্যাচ নিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই শুরু হয়েছিল। প্রথমবার ডিপ ব্লু’র বিপক্ষে কাসপারভ খেলতে বসেন ১৯৯৬ সালে। ছয় ম্যাচের সিরিজ জিতেছিলেন তিনি ৪-২-এ। পরের বছর ৩ মে থেকে নিউ ইয়র্কে শুরু হয় ফিরতি সিরিজ। দর্শক আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। আইবিএম কম্পিউটার ডিপ ব্লু’র কাছে সেবার হার মানতে হয়েছিল দাবার ঈশ্বরকে। ৩ মে’র প্রথম ম্যাচ তিনি জিতেছিলেন দারুণ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে। কিন্তু এরপর আর জিততে পারেননি। দুটিতে হেরেছিলেন তিনটি ড্র হয়। দাবার জগতে এই লড়াইকে দেখা হয় মানুষের ওপর যান্ত্রিক আধিপত্যের স্মারক হিসেবে। যদিও সেই ফলাফল মেনে নিতে পারেননি কাসপারভ। তিনি ডিপ ব্লু’র বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে ম্যাচ পুনরুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছিলেন। যদিও তার সেই দাবি পূরণ হয়নি। সেই লড়াইয়ের পর ডিপ ব্লু অবসর নিয়েছিল। আর কখনো খেলেনি। সুপার কম্পিউটারের কাছে নিজের হার সম্পর্কে কাসপারভ পরে বলেছিলেন, ‘আমি ফাইটিং স্পিরিট হারিয়ে ফেলেছিলাম।’
প্রথমবার তাহলে সুপার কম্পিউটারের বিপক্ষে কীভাবে জিতেছিলেন কাসপারভ? অনেকেই বলেন, ১৯৯৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারিতে তিনি যেই ডিপ ব্লু-কে হারিয়েছিলেন তার প্রোগ্রাম তত উন্নত ছিল না। পরের বছর কাসপারভকে অনেক উন্নত কম্পিটারের বিপক্ষে লড়তে হয়েছিল। প্রথমবার কম্পিউটারকে হারানোর পর উচ্ছ্বসিত কাসপারভ বলেছিলেন, ‘এটা ছিল বিস্ময়কর এক মানবিক পদক্ষেপ। আমি অনেক কম্পিউটারের বিপক্ষে খেলেছি। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। নতুন ধরনের এক প্রতিভার স্নিগ্ধ সুবাস পাচ্ছিলাম আমার টেবিলের চারপাশে।’ প্রথমবার সুপার কম্পিউটারকে হারানোর পর মানবপ্রতিভার অফুরন্ত ভা-ারের ওপর আস্থা বাড়িয়েছিলেন কাসপারভ। কিন্তু পরের বছর তিনি হেরে গেলে অন্যরকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। লোকে জোরেশোরে বলতে শুরু করে, একদিন মানবসভ্যতার দখল নেবে যন্ত্র।
গ্যারি কাসপারভ জন্মেছিলেন বাকুতে। এখন যেটা আজারবাইজানের অংশ। ১৯৬৩ সালে এটা ছিল অবিভক্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন। তিনি যখন বেড়ে উঠছেন তখন সোভিয়েত রাশিয়ার পাড়ায় পাড়ায় ছিল দাবা স্কুলের ছড়াছড়ি। দাবার মতো একাকিত্বের খেলায় সাফল্য পেতে বেশিদিন লাগেনি কাসপারভের। মাত্র ২১ বছর বয়সে আনাতোলি কারপভকে হারানোর পর গ্যারি কাসপারভ টানা ৮ বার (১৯৮৫-১৯৯৩) বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত ছিলেন বিশ্ব র্যাংকিংয়ে এক নম্বর। ফর্মের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় আচমকাই অবসর নিয়েছিলেন।
সালটা ছিল ২০০৫। এর ১২ বছর পর আবার আন্তর্জাতিক দাবায় ফেরেন কাসপারভ। আমেরিকার মিসৌরিতে সেন্ট লুই র্যাপিড অ্যান্ড ব্লিৎজ টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলেন। দাবার গ্র্যান্ড স্ল্যাম হিসেবে পরিচিত ওই টুর্নামেন্টে ওয়াইল্ড কার্ড পেয়েই নামেন তিনি। তবে দীর্ঘ অবসর জীবন থেকে ফেরার পর কঠিনতম প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ৫৪ বছরের কাসপারভ ভালো করতে পারেননি। টুর্নামেন্টে খেলেছিলেন দুনিয়ার সেরা নয়জন দাবা। ছিলেন সেই সময়ের এক নম্বর ম্যাগনাস কার্লসেন, দুই নম্বর হিকারু নাকামুরা, সার্জেই কারিয়াকিন, ফাবিয়ানো কারুয়ানার মতো দাবা মস্তিষ্করা। ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার পুরস্কার মূল্যের ওই টুর্নামেন্টে নামার আগে মজা করে কাসপারভ বলেছিলেন, ‘দাবার ঘুঁটিগুলো ঠিকঠাক সরানোটা মনে রয়েছে কি না দেখতে চাই। যদি না থাকে, তবে তার পরই কি পুনঃঅবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া উচিত?’
খেয়ালি কাসপারভ পেশাদার টুর্নামেন্টে আর বেশিদিন খেলেননি। দ্রুতই আবার অবসর নেন। তবে ছোটখাটো টুর্নামেন্টে বারবারই খেলতে দেখা গেছে। একাধিক বইও লিখেছেন। মানবাধিকার কর্মীর ভূমিকায় নেমেছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কট্টর সমালোচনাও করেছেন। রাশিয়ায় সক্রিয় রাজনীতিতেও অংশ নিয়েছিলেন। তবে পুতিনের আক্রোশে দেশে টিকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ২০১৪ সালে রাশিয়া ছেড়ে ক্রোয়েশিয়ার নাগরিকত্ব নেন। তবে যেখানেই থাকুন সব সময় রুশ আভিজাত্যের অহংকার নিয়ে চলেন। একবার বিশ্বনাথন আনন্দের সঙ্গে ভ্যাসেলি তোপলভের ম্যাচের আগের দিন মস্কো থেকে কাসপারভ বললেন, ‘আনন্দের খেলায় কোনো নতুনত্ব নেই, এই দাবা থেকে বিশ্বের কিছু শেখার নেই।’ কথাটা জেনে ভারতের সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হেসে বলেছিলেন, ‘রাশিয়ান ছাড়া কাউকে বিশ্বসেরা দেখতে পারে না ও। সেটাই ওর সমস্যা।’
