করোনাভাইরাসের ক্ষতিতে প্রণোদনা

তহবিলের ৯২ শতাংশ জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক

আপডেট : ০৩ মে ২০২০, ০৬:২৮ এএম

মহামারী করোনাভাইরাসে অচল হয়ে পড়েছে সারা বিশ্ব। এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিশ্বের প্রায় সব দেশই লকডাউনে রয়েছে। আর দীর্ঘদিনের লকডাউনের কারণে অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রবৃদ্ধিতে নেমেছে ধস। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতি মিটিয়ে অর্থনীতিকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সরকারও শিল্প, সেবা, কৃষি ও এসএমইসহ বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা ঘোষণা করে। মূলত স্বল্পসুদের ব্যাংকঋণের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও ব্যাংক খাতে তারল্য সংকটের কারণে প্রণোদনার ঋণ বিতরণ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রণোদনা তহবিলের ৯২ শতাংশের জোগান দিয়ে করোনা মোকাবিলায় স্বল্পসুদের ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

করোনাভাইরাসে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি মেটাতে ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গত ৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিল্প, সেবা, এসএমই, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের আকার বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতের জন্য মোট ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে কৃষি এবং নিম্ন আয়ের পেশাজীবী কৃষক ও প্রান্তিক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের জন্য আরও ৮ হাজার কোটি টাকার স্বল্প সুদের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন তিনি। সব মিলিয়ে করোনাভাইরাসে সৃষ্ট ক্ষতি মেটাতে প্রণোদনা প্যাকেজের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮০ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। ঘোষণা অনুযায়ী প্রণোদনার এ ঋণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিতরণ করবে আর এতে সুদহারে ভর্তুকি দেবে সরকার। তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট থাকায় প্রণোদনার ঋণ বিতরণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণোদনার ঋণের ৯২ শতাংশ তহবিলের জোগান দেয়।

বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার তারল্য রয়েছে। প্রণোদনার ঋণ দিতে হলে ব্যাংকগুলোতে তীব্র তারল্য সংকট তৈরি হবে। তাই প্রণোদনা ঋণ বিতরণ সহজলভ্য করতে ৫৫ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা তহবিল জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর গত ২৫ মার্চ থেকে দুই দফায় নগদ জমা সংরক্ষণের (সিআরআর) হার দেড় শতাংশ কমানোর ফলে ব্যাংক ব্যবস্থায় আরও ১৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকার তারল্যের জোগান দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বাইরে আলাদা এক সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্বল্প সময়ের জন্য নেওয়া ধারের সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে তারল্যের প্রয়োজনে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কম সুদে ঋণ নিতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী যে প্রণোদনা ঘোষণা করেন তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার স্বল্প সুদের ঋণ সুবিধা রয়েছে। তবে করোনার সময়ে ব্যাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অর্থ সংকট চরমে থাকায় শিল্প ও সেবা খাতের এই তহবিলে তারল্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ঋণের সুদহার হবে ৯ শতাংশ, যার মধ্যে সরকার সাড়ে ৪ শতাংশ ভর্তুকি হিসেবে দেবে। তিন বছর মেয়াদি এ তহবিল থেকে বড় শিল্প ও সেবা খাতের কোম্পানিকে গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে শুধু চলতি মূলধন (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) ঋণ দেবে ব্যাংক। কোনো খেলাপি বা তিনবারের বেশি ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান এই তহবিল থেকে ঋণ পাবে না। কোনো একক গ্রহীতা সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য এই ঋণের সুবিধা পাবেন। ঋণের মেয়াদ বাড়লেও এক বছরের বেশি সুদ ভর্তুকির সুবিধা পাবেন না।

প্রণোদনা প্যাকেজে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার যে তহবিল রয়েছে, যার মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা জোগান দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো সিএমএসএমই খাতে ঋণ দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১০ হাজার কোটি টাকার এই পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবে। তিন বছর মেয়াদি এ তহবিল থেকে শুধু চলতি মূলধন (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) ঋণ দেবে ব্যাংক।

করোনাভাইরাসে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় রপ্তানি খাতকে সহায়তার উদ্দেশ্যে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) পরিমাণ দেড় বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ইডিএফ তহবিলে যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানিকারকদের জন্য ইডিএফ তহবিল থেকে ঋণের সুদের হার কমিয়ে ২ শতাংশে বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য গত ১২ এপ্রিল ভিডিও কনফারেন্সে বক্তৃতাকালে বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পরই শস্য ও ফসল খাত ব্যতীত কৃষির অন্যান্য খাত তথা মৌসুমভিত্তিক ফুল ও ফল চাষ, মৎস্য চাষ, পোলট্রি, ডেইরি ও প্রাণিসম্পদ খাতে ঋণ বিতরণের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৮ মাস (৬ মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ) মেয়াদি এ ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৪ শতাংশ। এছাড়া নিম্ন আয়ের পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই তহবিল থেকে নিম্ন আয়ের বিভিন্ন পেশাজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে পারবেন। ক্ষুদ্র ঋণদানকারী এনজিওদের মাধ্যমে এই ঋণ বিতরণ করা হবে, যার সুদহার হবে ৯ শতাংশ।

করোনাভাইরাসে রপ্তানি খাতকে সহায়তার উদ্দেশ্যে পণ্য জাহাজীকরণ থেকে শুরু করে রপ্তানি প্রক্রিয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত সময়ের জন্য ঋণ দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে ওই প্রি-শিপমেন্ট তহবিল গঠন করা হয়েছে। ওই তহবিল থেকে সর্বোচ্চ চার মাস মেয়াদে ৬ শতাংশে ঋণ নিতে পারবে। এছাড়া রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্প ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিয়ে এই তহবিল থেকে ঋণ নিতে পারবে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় যে ঋণ বিতরণ করতে হবে, তার মধ্যে ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব উৎস থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা দিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের বর্তমান তারল্য থেকেই ওই ঋণ দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে প্রণোদনার ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর ওপর তেমন কোনো চাপ তৈরি হবে না।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে এবিবি চেয়ারম্যান আলী রেজা ইফতেখার বলেন, সরকার ঘোষিত প্যাকেজ বাস্তবায়নের সুবিধার্থে ব্যাংকগুলোর বিধিবদ্ধ নগদ জমার হার (সিআরআর) ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া রেপোর সুদহারও কমানো হয়েছে। ফলে আমানত সংকুচিত এবং নগদ উত্তোলনের চাপ সত্ত্বেও ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট হবে না। ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় তহবিল সহায়তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ এবং নীতি সহায়তার প্রশংসা করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত