সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে মাঠের পুলিশ

আপডেট : ০৪ মে ২০২০, ০৪:৪৪ এএম

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। করোনায় ফ্রন্টলাইনে সেবা প্রদানকারী ডাক্তার ও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে পুলিশেও। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন পাঁচ পুলিশ সদস্য। আক্রান্ত হয়েছেন ৮৫৪ পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে শুধু ডিএমপিতেই ৪৪৯ জন। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ১১৩ জন। আর আক্রান্তদের মধ্যে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যই বেশি। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসামগ্রী না থাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ সাধারণ মানুষের কাছাকাছি সবচেয়ে বেশি যেতে হচ্ছে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের। সংক্রমণ থেকে পিছুই ছাড়ছে না পুলিশকে। দিনে দিনে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। যেভাবে পুলিশ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে তাতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছেই। এমনকি পরিবারের সদস্যরাও থাকছেন আতঙ্কে।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, যাদের আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে তাদের মধ্যে অনেকেই খারাপ অবস্থায় আছেন। তারা জানিয়েছেন, হোটেলে ও স্কুল-কলেজে রাখা হলেও সেখানকার পরিবেশ ভালো নয়। অস্বাস্থ্যকর অবস্থার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। বাথরুমের অবস্থা ভালো নয়। নিজেদের খাবার নিজেরাই সংগ্রহ করছেন। তবে পুলিশের কর্তা ব্যক্তিরা বলেছেন, যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তাদের সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, করোনা সংকটের প্রথম থেকেই বিদেশফেরতদের অবস্থান শনাক্ত করে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত, আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাসপাতালে পাঠানো, লকডাউন নিশ্চিত করা, ত্রাণ বিতরণ, শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত থেকে শুরু করে করোনায় মৃত ব্যক্তিদের দাফনসহ প্রায় সবক্ষেত্রেই পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে নানা কার্যক্রমের জন্য পুলিশ সদস্যদের সরাসরি জনসাধারণ এবং আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে নিজেদের মধ্যেও করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সুপার হাসান উল হায়দার জানিয়েছেন, করোনায় যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের উন্নতমানের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনে থাকা সদস্যদের সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখা হচ্ছে। সিনিয়র কর্মকর্তারা নিয়মিত সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি বলেন, জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে থেকে মানুষকে নিরন্তর সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ থেকে ব্যতিক্রম পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। মানুষকে সচেতন করা এবং বাসায় খাবার পৌঁছে দেওয়াসহ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মারা যাওয়াদের দাফন পর্যন্ত করছেন পুলিশ সদস্যরা। তারপরও মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী পাচ্ছেন না। পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং করোনায় সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ সদস্যরা। তারা আরও বলছেন, মুখস্থ বুলি আওড়ালেই হবে না। দুই লাখ সদস্যের পরিবারে মড়ক থামাতে দরকার বাস্তবসম্মত করোনা ব্যবস্থাপনা। পদ বিবেচনায় নয়, বাহিনীর কর্মী হিসেবে সবার সুচিকিৎসা নিশ্চিতের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু করোনাযুদ্ধে নয়, অতীতে এ রকম অনেক দুর্যোগ পুলিশ মোকাবিলা করেছে সফলতার সঙ্গে। এবারও তারা অত্যন্ত সচেতনভাবে করছে। করোনাভাইরাস ভয়ংকর, তা জেনেও তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে বীরের মতো। তবে তারা যেন আক্রান্ত না হয় সেজন্য পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রতিরোধক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ও হচ্ছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেসব বিধিনিষেধ দিয়েছে সেগুলো মেনে পেশাগত কাজ করতে হবে। কোনো পুলিশ সদস্যের শরীরে এ রোগের সন্দেহ দেখা দিলে তা সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা করাতে হবে। আমরা সার্বক্ষণিকভাবে পুলিশের নিরাপত্তাসহ সার্বিক আইনশৃঙ্খলার মনিটরিং করছি।

বিদায়ের আগে সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছিলেন, পুলিশের ট্রেনিং নেই, তবু করোনাযুদ্ধে মাঠে আছে। স্বাভাবিকভাবে পুলিশের এ সময়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব গণজমায়েতে বাধা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। আর সেই কাজটি করতে গিয়ে বাইরে ডিউটির সময় পুলিশ সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছেন। অসাবধানতাবশত মানুষের কাছাকাছি চলে যাওয়ায় তারা সংক্রমিত হচ্ছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনা সংক্রমণ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে পুলিশ যে দায়িত্ব পালন করে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে জীবনের ঝুঁকি রয়েছে জানার পরও সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, দেশ ও জনগণের প্রতি কমিটমেন্টের জায়গা থেকে পুলিশ সদস্যরা নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। ইতিমধ্যে আমাদের বেশ কয়েকশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন এবং পাঁচজন গর্বিত সদস্য দেশের জন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। আমরা তাদের জন্য গর্বিত। বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা তাদের এ ত্যাগকে, এ শোককে শক্তিতে পরিণত করে সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছেন এবং মনোবলের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সুরক্ষাসামগ্রী তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং প্রতিনিয়তই পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া ভুক্তভোগী এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

করোনায় পুলিশের এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল পদমর্যাদার সদস্যরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন উল্লেখ করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসে সংকটের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করছেন এসআই, এএসআই ও কনস্টেবলরা। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিদের সৎকার কিংবা আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার কাজে সরাসরি মাঠপর্যায়ের সদস্যরাই যুক্ত হচ্ছেন। প্রতিনিয়ত করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার কারণে তাদের নিজেদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ অবস্থায় এসব সদস্যের সর্বোচ্চ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা দরকার। তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা সাধারণত প্যাট্রল টিম, চেকপোস্ট এবং ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে দায়িত্ব পালন করেন। বেশিরভাগ সদস্যই পুলিশ ব্যারাকে থাকেন, যেখানে একটি রুমে অন্তত ১২ জন কনস্টেবল বসবাস করেন। এটা তাদের আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম বড় কারণ। আক্রান্তদের বেশিরভাগই নিরাপত্তাসামগ্রীর অভাব এবং শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত না করার কারণে আক্রান্ত হয়েছেন। আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনে যারা আছেন তাদের মধ্যে কেউ সমস্যায় থাকলেও থাকতে পারেন। তারপরও আমরা সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশের দুই লক্ষাধিক সদস্য বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে থেকে মানুষকে নিরন্তর সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য প্রথমত তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত সেসব সচেতনতার বার্তার বিষয়ে সদস্যদের আপডেট করা হচ্ছে। এছাড়া সিনিয়র কর্মকর্তারা নিয়মিত পুলিশ লাইনসে গিয়ে সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছেন।

খিলগাঁও থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এভাবে কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। আবার আমাদের ওপর রাষ্ট্রের দায়িত্বও আছে। যেটি জনগণের জন্য করে যাওয়া। এ কাজ করতে গিয়ে ঝুঁঁকি জেনেও অনেক সময় আমার মতো অনেকেই পরিবারের কথা চিন্তা করে বাসায়ও যান না। তিনি বলেন, আমাদের কাজটি জনগণের সঙ্গে। তারপরও আবার করোনার কারণে জনগণের সঙ্গে আরও বেশি মিশে যেতে হচ্ছে। এ কারণে অনেক সময় অনেক কিছুই মানাও যাচ্ছে না। তবে আমরা এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাব।

কোয়ারেন্টাইনে থাকা পুলিশের কয়েকজন সদস্য অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশিরভাগ সদস্য ঢাকার ১৫টি আবাসিক হোটেল ও কয়েকটি স্কুল-কলেজে রাখা হয়েছে। এখানের পরিবেশ তেমন ভালো নয়। অনেকটা অস্বাস্থ্যকর। বাথরুম নোংরা। খাওয়া-দাওয়া নিজেদেরই সংগ্রহ করতে হয়। হোটেলের কর্মকর্তা বা কোনো কর্মচারী থাকে না। খুব ভয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। তারা আরও জানান, বড় স্যাররা যদি আমাদের দিকে ভালোভাবে নজর দেন তাহলে আমাদের জন্য ভালো। আমরা করোনাকে জয় করে আবার দেশের সেবায় নেমে পড়ব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত