বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও খাদ্য উৎপাদনের তুলনায় আমদানিনির্ভরতা কম নয়। তাই তো লকডাউন-পরবর্তী আসন্ন খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী জনগণকে পরামর্শ দিয়েছেন এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি খালি না রাখার। কীভাবে কৃষিপ্রধান দেশে পুঁজিতান্ত্রিক বিকাশের জন্য হলেও ভূমি সংস্কার জরুরি, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আজকের চীন, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়া। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এ দেশের কৃষি অনেক আগেই সাধারণ কৃষকের আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে। ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশে উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য এবং কৃষিনির্ভর বাণিজ্য সুবিধা’ শীর্ষক এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ২০২০ সালের মধ্যে ৮০০ কোটি ডলার সমমানের উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের চাহিদা দেখা দেবে বাংলাদেশে। তাই বেশি পরিমাণে খাদ্যপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বাড়তি প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আমরা কী দেখেছি, কাঠামোগত উন্নয়ন, যা জনগণের সেকেন্ডারি নিডস সেটা বাড়াতেই সরকার বেশি তৎপর ছিল। বিশ্বব্যাংক তখন এমন একটা প্রস্তাবও করেছিল যে, বছরের পর বছর বন্যা-খরাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের যে কোটি কোটি টাকার মূলধন ও পরিশ্রম নষ্ট হয়, সে ক্ষতি পূরণে খাদ্য উৎপাদনে সিজনাল শস্যবীমা চালুর পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রান্তিক কৃষক খুব একটা লাভবান হবে না, এমন একটা কারণ দেখিয়ে সে প্রস্তাব অনেকটা প্রস্তাবনাতেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়। উপরন্তু কৃষককে হাইব্রিড বীজের জাঁতাকলে পিষ্ট করে রাখার প্রক্রিয়া বলবৎ রাখা হয়েছে। কৃষক বেশি ফলনের আশায় হাইব্রিড বীজের শরণাপন্ন হয়। একই সঙ্গে তাকে জোগান দিতে হয় অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের। অনেক সময় ভারত ও চীন থেকে আসা নিম্নমানের বীজ থেকে নানা রকম ব্যাকটেরিয়ার কবলে পড়ে ধান ও এ জাতীয়
কৃষি, যার ফলে কৃষককে একই ধানক্ষেতে বারবার সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। ফলে উৎপাদন ব্যয় বহু গুণে বেড়ে যায়। প্রকারান্তরে ফলনও আশানুরূপ হয় না। যার ফলে কৃষক সর্বস্বান্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। এ দেশের কৃষি মূলত হাইব্রিড, রসায়ন ও কীটনাশকের কবলে বন্দি। আর এসব সুফল ভোগ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। এভাবে কৃষককে বীজ, সার, কীটনাশকের কবলে ফেলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কৃষিতে দেওয়া ভর্তুকির টাকা লুট করে নিয়ে যায়।কৃষক পায় লবডঙ্কা।
আবার অনেক সময় দেখা যায়, এ দেশের কৃষি ক্ষেত্রে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর বিভিন্ন সময়ে না-না পরামর্শ দিয়ে থাকে, যতটা না কৃষকের স্বার্থে তার চেয়ে বেশি তাদের স্বার্থকে প্রসারিত করার জন্য। যদিও ইতিহাস থেকে নীল চাষের বাস্তবতা এখনো মানুষ বিস্মৃত হয়নি, তথাপি নীল চাষ মানবখাদ্য ও পশুখাদ্য উৎপাদনের রূপ ধরে এখনো বহু উন্নয়নশীল দেশে বিদ্যমান। মূলত কৃষিকে কৃষকবান্ধব করে তোলার বা দেশে একটা কৃষিবিপ্লব ঘটানোর সদিচ্ছা কোনো সরকারের মধ্যেই তেমন দেখা যায়নি। তাই তো ‘হাইব্রিড বীজের দরকার নেই’ বিশেষজ্ঞরা এমন মতামত দিলেও বাণিজ্যের কারণে সরকার তা এড়িয়ে যেতে পারে না। অথচ এ দেশের
কৃষক কৃষিকে তার জীবন ধারণের উপায় হিসেবে নিলেও কখনো বাণিজ্য হিসেবে নিতে পারে না বা সেই সুযোগ তার নেই। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত থেকেছেন বরাবরই। কৃষিপণ্যের মাঠপর্যায়ের মূল্য ও বাজারমূল্যের পার্থক্য যোজন যোজন। এ ক্ষেত্রে সরকারকে কখনো কৃষকের উৎপাদিত পণ্য কেনার ক্ষেত্রে সাবসিডি দিতে দেখা যায় না। গত দুই বছর ধান উৎপাদনকারী কৃষক তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এ বছর আজ সারা পৃথিবী যখন করোনা মহামারীর কবলে বিপর্যস্ত, তখন খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় বিশে^র সব দেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। নিজেদের প্রয়োজনে কৃষিভিত্তিক উন্নয়নশীল দেশগুলো খাদ্য রপ্তানি বন্ধ বা সীমিত করতে পারে। ইতিমধ্যে কম্বোডিয়া চালের রপ্তানি স্থগিত করেছে এবং কাজাখস্তান নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যদ্রব্য রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এ কারণে অসুবিধায় পড়তে যাচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলো। ব্রিটেন, যাদের আশি ভাগ খাবার বাইরে থেকে আসে, যুক্তরাষ্ট্র ও অনেক ধনী দেশ এখনই উদ্বিগ্ন। তারা হয়তো প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহে মরিয়া হয়ে উঠবে। আর এখনই সময় আমাদের দেশের খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সব ধরনের কৃষিপণ্যের উৎপাদন নিশ্চিত করা। নতুবা গেল বছরের পেঁয়াজ-কাণ্ডে কেউ বিস্মিত হন নাই নিশ্চয়ই! সে ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে এবং নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।
১. কৃষি খাতকে সরকারি ক্রয় ও ভর্তুকির মাধ্যমে টিকে থাকতে সরকারকে সহায়তা করতে হবে।
২. ধানের মূল্য মণপ্রতি এক হাজার টাকার ওপরে নির্ধারণ করতে হবে, ও ধান ক্রয়ে ভর্তুকি নিশ্চিত করতে হবে। আর বিশেষ করে মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি কৃষক যেন সেই মূল্য পান, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
৩. সরকার কৃষিতে যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে (যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প) তার সুদের হার কমিয়ে বা সুদ মওকুফ করে অবিলম্বে কৃষককে ঋণ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিতে হবে।
৪. সরকারি খাসজমি ভূমিহীন কৃষককে আবাদ করার জন্য লিজ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে এবং অনুপস্থিত ভূমি মালিকদের জমি আবাদ করার জন্য আহ্বান জনানো যেতে পারে।
৫. দেশজুড়ে লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত গরুর খামার, হাঁস-মুরগির খামার, চিংড়িঘের, মাছের খামারগুলোকে ক্ষতি এড়াতে দ্রুত সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে সচল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
এ দেশে কৃষি ক্রমশ কৃষকের হাতছাড়া হয়ে কোম্পানির হাতে চলে যাচ্ছে। যে কারণে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সে কারণে কৃষি খাতের ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পাশাপাশি রপ্তানিনির্ভর কৃষিব্যবস্থা প্রণয়ন করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ কৃষিভিত্তিক রাষ্ট্রে কৃষি খাতের উন্নয়ন ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব না।
লেখক : কথাসাহিত্যিক
