করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে নানা নতুন শর্ত মেনেই অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচল শুরুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলোকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অরগানাইজেশনের (আইকাও) গাইডলাইন মানতেই হবে। দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো আগামী ৮ মে থেকে ফ্লাইট চলাচল শুরুর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এখনো ফ্লাইট চলাচল শুরুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রের এই সংস্থাটি ফ্লাইট চালুর কথা ভাবছে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচল শুরুর পর বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও চলাচল শুরু হতে পারে চলতি মাসের শেষ দিকে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই যাত্রীরা বসবেন। এক্ষেত্রে একেকটি ফ্লাইটে যাত্রী কমে দাঁড়াবে অর্ধেকে। প্রত্যেক যাত্রীকে একটি করে মাস্ক, এক জোড়া হ্যান্ড গ্লাভস ও ছোট একটি হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেবে এয়ারলাইন্স কর্র্তৃপক্ষ। যাত্রী অর্ধেক ও করোনা সুরক্ষার সরঞ্জামের কারণে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার ভাড়া বাড়বে প্রায় দ্বিগুণ।
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএটিএ) মহাপরিচালক আলেকজান্দ্রি দে জুনিয়াক গত সপ্তাহে বলেন, আইকাও কিংবা সরকার যদি উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোকে শারীরিক দূরত্ব কার্যকরের নির্দেশ দেয়, তবে কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ আসন ফাঁকা থাকবে এবং এয়ারলাইন্সকে তাদের টিকিটের দাম অন্তত ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিতে হবে। এসব না করলে এয়ারলাইন্সগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়বে। করোনাভাইরাসের কারণে গত জানুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত বিমান চলাচল প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। গত মাসের শেষ দিকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পুনরায় চালুর কথা ছিল ভিয়েতনামের। কিন্তু তারা পারেনি। চলতি মাস থেকে চলাচল শুরু হতে পারে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে চীনে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট আগের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ সক্রিয় আছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২০ সালে বৈশ্বিক যাত্রী পরিবহন গত বছরের তুলনায় অর্ধেক কমবে এবং উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর ৩১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের লোকসান গুনার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের বিমানবন্দরগুলোতে ৭ মে পর্যন্ত ফ্লাইট ওঠানামায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচলের ব্যাপারে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা কীভাবে যাত্রীদের হ্যান্ডেল করবে, বুকিং নেবে ইত্যাদি বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ফ্লাইট চলাচল শুরু হলে বেশ কিছু পরিবর্তন করতেই হবে। করোনা পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবসান না ঘটার আগেই যদি ফ্লাইট চালাতে হয়, তাহলে দুনিয়াব্যাপী ফ্লাইট চলাচলে কিছু নতুনত্ব আনতেই হবে। এটা যে শুধু ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময়েই মানা হবে তা নয়। ভাইরাস-পরবর্তী সময়ও বিশ্বে বিমানের ফ্লাইট সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিবর্তন চোখে পড়বে। আইকাও ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিটি নিয়মাবলি মানতেই হবে।
বেবিচকের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে আকাশপথে চলাচলের ধরন অনেকটা পাল্টে যাচ্ছে। ফ্লাইট অভ্যন্তরে চিরচেনা দৃশ্য দেখা যাবে না। আইসোলেশন ম্যানেজমেন্ট তৈরি হবে। করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলে কিছু অভিন্ন নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আইকাও ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মেনে ফ্লাইট চলাচলে আনা হচ্ছে এমন পরিবর্তন। বেবিচকের এক কর্মকর্তা বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে এয়ারলাইন্সগুলো লোকসানে পড়েছে। তাদের কথা চিন্তা করে আমরা আইকাও ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর গাইডলাইনগুলো পর্যবেক্ষণ করে আগামী ৮ মে থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলো চলাচল করার ব্যাপারে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের সাথেও যোগাযোগ করেছি। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচলের ব্যাপারে সিগন্যাল পেয়েছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন নিয়মে বিমান চলাচল শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। বেবিচক কর্মকর্তারা আরও জানান, ফ্লাইটগুলো চলাচল শুরু করতে বেশ কিছু নতুন শর্ত দেওয়া হয়েছে। ওইসব শর্ত মানতেই হবে। নতুন নিয়মে ফ্লাইট চলাচল শুরু হওয়ার পর ককপিট ও কেবিন ক্রুর পাশাপাশি যাত্রীদের ড্রেস কোডসহ অন্যান্য আচরণবিধি পাল্টে যাবে। প্রতিটি উড়োজাহাজে দুই থেকে আড়াই মিটার দূরত্ব রেখে যাত্রী বসাতে হবে। ক্রু ও যাত্রীদের মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ঘন ঘন খাবার সরবরাহে ক্রুদের ব্যবহার করা যাবে না। যাত্রীদের বেশি করে পানি দেওয়া হবে। উড়োজাহাজ সার্বক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতেই হবে। আসনগুলো জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজনে পাইলট ও ক্রুদের উন্নতমানের পিপিই পরতে হবে।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোকাব্বির হোসেন সম্প্রতি জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস বৈশ্বিক বিষয়। লকডাউন-পরবর্তী বিমান চলাচল ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসুরক্ষার করণীয় অবশ্যই প্রাধান্য পাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করতে হবে, যাত্রীর বোর্ডিং হবে, চেকইন হবে, ইনফ্লাইটে কীভাবে ক্রুরা তাদের ডিল করবেন, সেসবই আইকাও থেকে গাইডলাইনে দেওয়া হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে সেই গাইডলাইন পেয়েছি।
বেসরকারি উড়োজাহাজ কোম্পানি ইউএস বাংলা ও নভোএয়ারের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আগামী ৮ মে থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চলাচলের ব্যাপারে একটি নির্দেশনা পাওয়া গেছে। ফ্লাইট সংখ্যা নিয়মিত থেকে কম হবে। ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ যাত্রী নেওয়া যাবে। প্রতিটি ফ্লাইটের আগে বিমান জীবাণুমুক্ত করতে হবে। যাত্রীকে নতুন হ্যান্ড গ্লাভস ও মাস্ক দিতে হবে। বিমানবন্দরগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে জীবাণুনাশক ছিটাতে হবে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ তিনটি ফ্লাইট ছাড়ার অনুমতি নিতে হবে। তারা আরও জানান, একেকটি ফ্লাইটে অন্য সময়ের চেয়ে অর্ধেক যাত্রী কমে আসবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই যাত্রী বসানো হবে। প্রতিটি আসনে একজন করে যাত্রী বসবে। এতে বিমানের খরচও অনেক বেড়ে যাবে। তাদের একজন বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া আমরা কোনো উপায় দেখছি না। অন্য সময়ের চেয়ে যাত্রী ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। প্রত্যেক যাত্রী, পাইলট ও ক্রুকে রাখা হবে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায়। সবাইকে করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা দেওয়া হবে।
ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের জেনারেল ম্যানেজার কামরুল ইসলাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, যাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার সব নিয়মকানুন মানা হবে। যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর প্রতিবারই উড়োজাহাজে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হবে। উড়োজাহাজের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা হবে। চেকইন কাউন্টারে ৩ ফিট দূরত্বে দাঁড়িয়ে যাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করাসহ আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আরও নিয়ম এলে তাও মানা হবে। তিনি বলেন, ফ্লাইট চালানোর ব্যাপারে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। যাত্রী, পাইলট ও ক্রুদের সব ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হবে।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে চারটি এয়ারলাইন্স কোম্পানি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনা করে। তবে মার্চ থেকে তিন মাসের জন্য ফ্লাইট চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। ১৫ মে পর্যন্ত সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ৮ মে ফ্লাইট চলাচল শুরু হলে সেক্ষেত্রে শুধু নভোএয়ার ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সই ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে। তবে আমরা বিমান কর্র্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছি, বিশেষ বিবেচনার আওতায় এনে তারা যেন ফ্লাইট চলাচল শুরু করে। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও চলাচল শুরু হবে। তবে ১৫ মে’র পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সেক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এভিয়েশন খাত। চলমান মহামারীর মাঝেও কিছু কিছু এয়ারলাইন্স নতুন নিয়মে ফ্লাইট চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সপ্তাহখানেক আগে করোনাভাইরাসের মধ্যেই বিশ্বের আটটি শহরে সীমিত আকারে ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিয়েছে এমিরেটস এয়ারলাইন্স। এই সংস্থাটি কয়েক দিন ধরে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে ফ্রাঙ্কফুর্ট, জাকার্তা, জোহানেসবার্গ, লাগোস, লন্ডন, ম্যানিলা ও তিউনিসে। সংস্থাটি সামাজিক দূরত্ব ও যাত্রীর সব ধরনের সুরক্ষা দিয়েই ফ্লাইট চালাচ্ছে।
