জাতীয় স্বার্থ ও পরিবেশ সুরক্ষার শিক্ষা

আপডেট : ০৫ মে ২০২০, ০৫:২৯ এএম

করোনা মহামারীর দুর্যোগে দেশ-বিদেশে নানা হতাশার মধ্যে এক আশাজাগানিয়া সংবাদ হয়ে এলো টেংরাটিলা মামলায় কানাডীয় জ্বালানি কোম্পানি নাইকোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জয়ের রায়। সুনামগঞ্জের ছাতকে টেংরাটিলা গ্যাস কূপ বিস্ফোরণের ঘটনায় কানাডীয় কোম্পানি নাইকোকে দায়ী করে বাংলাদেশের পক্ষে এ রায় দিয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত। ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউট (ইকসিড) ট্রাইব্যুনালে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই রায় হয়েছে। টেংরাটিলায় দুই দফা বিস্ফোরণের জন্য নাইকো দায়ী এবং এজন্য বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ দিতে হকে নাইকোকে। রবিবার এক ভিডিও সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। তবে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কত হবে, তা পরবর্তী শুনানি শেষে নির্ধারণ করবে ইকসিড ট্রাইব্যুনাল। এ রায়ের লক্ষ্যণীয় দিক হলো ইকসিড টেংরাটিলা বিস্ফোরণের ঘটনায় খনিজসম্পদের ক্ষতির সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টিও যুক্ত করেছে।

ছাতকের টেংরাটিলা গ্যাস ক্ষেত্রের উন্নয়নে ২০০৩ সালে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে চুক্তি করে রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী কোম্পানি বাপেক্স। নাইকো সেখানে অনুসন্ধান কূপ খনন করার সময় ২০০৫ সালের জানুয়ারি ও জুন মাসে দুই দফা বিস্ফোরণ ঘটে। এতে গ্যাসক্ষেত্রটির বিপুল মজুদ পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিরাট এলাকাজুড়ে পরিবেশ ও সম্পদের ক্ষতি হয়। একই সঙ্গে গ্যাসক্ষেত্র ও আশপাশের অঞ্চলের মানুষ বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন থেকে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের কার্যক্রমে নাইকোর অনেক ত্রুটি ছিল, তারা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কাজ করেনি। বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়েছে, নাইকো সেই চুক্তিও ভঙ্গ করে। সালিশি ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেই বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগে গ্যাসের ক্ষতি বাবদ ১১৮ মিলিয়ন এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি বাবদ ৮৯৬ মিলিয়ন ডলারের একটি হিসাব ট্রাইব্যুনালে দেওয়া হয়েছিল। এর সঙ্গে এখন পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির হিসাব যোগ করা হবে। ২০০৫ সালে ওই বিস্ফোরণের পর এখন পর্যন্ত সেখানে গ্যাস বের হচ্ছে। সুতরাং এখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের যাচাই-বাছাইয়ের পর ট্রাইব্যুনাল ক্ষতিপূরণের চূড়ান্ত পরিমাণ নির্ধারণ করবে।

টেংরাটিলা মামলার তাৎপর্য ব্যাপক। গত দেড় দশক ধরে টেংরাটিলা কাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ এবং টেংরাটিলা মামলার বাঁক পরিবর্তনগুলো যে শিক্ষা দিচ্ছে তার তাৎপর্য অনুধাবন করাটা জরুরি। টেংরাটিলা ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ্য করলে দেশের জ¦ালানি খাতে দুর্নীতি ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সরকারগুলোর নিস্পৃহতা ও অদক্ষতার বিষয়গুলোও সামনে চলে আসে। প্রথমত, একটি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় চুক্তি সম্পাদনের সময় তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের রাজনৈতিক নেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ নিয়ে বাংলাদেশের আদালতে, কানাডার আদালতে ও ইকসিডে মামলা হয়। কানাডার আদালতে প্রমাণিত হয়েছে যে বাপেক্স-নাইকো চুক্তি সম্পাদনে দুর্নীতি হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, মামলা পরিচালনায় অদক্ষতা ও যথাযথ তৎপরতার অভাবে হারতে বসেছিল বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে সরকারি তৎপরতার বাইরে উচ্চ আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মামলাটি ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ক্যাবের মামলার সূত্র ধরে দেশের সর্বোচ্চ আদালত নাইকোর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং বাংলাদেশের কাছে নাইকোর গ্যাস বিক্রির ২৭ মিলিয়ন ডলার আটকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে নাইকোকে চাপে ফেলতে সক্ষম হয়।

বিভিন্ন হিসাব অনুসারে ধারণা করা হচ্ছে, অভিযুক্ত কোম্পানি নাইকোর কাছ থেকে টেংরাটিলা কাণ্ডের ক্ষতিপূরণ বাবদ বাংলাদেশ প্রায় আট হাজার কোটি টাকা পেতে পারে। বিপুল জাতীয় সম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে এবং এ কারণে রাষ্ট্রের জ¦ালানি খাতে যে সংকট হয়েছে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের মধ্য দিয়ে হয়তো তার অনেকখানি পুষিয়ে নিতে পারবে বাংলাদেশ। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই কানাডীয় কোম্পানি নাইকো দেউলিয়া ঘোষিত হলেও ক্ষতিপূরণ আদায়ে বাংলাদেশের ৯ নম্বর ব্লকে নাইকোর যে শেয়ার রয়েছে তার পুরো মালিকানা নিয়ে নেওয়ার কৌশল নিতে পারে বাংলাদেশ। পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে নাইকোর যে সম্পদ আছে এ সালিশি আদালতের মাধ্যমে সেখান থেকেও ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করতে পারে বাংলাদেশ। এসব বিষয়ে তৎপরতা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ টেংরাটিলা মামলা থেকে জাতীয় স্বার্থরক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষার শিক্ষা নেওয়া। জ্বালানি খাতে বিদেশি কোম্পানি কিংবা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় যে প্রকল্পগুলো চলছে কিংবা আগামীতে যে প্রকল্প নেওয়া হবে সেসব ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থরক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষার শিক্ষা মেনে চলার অঙ্গীকার করতে হবে সরকারকে। নইলে ভবিষ্যতেও অন্য কোনো নামে টেংরাটিলার মতো দুর্যোগে পড়তে হবে দেশকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত