করোনা মহামারীর দুর্যোগে সংগত কারণেই সবচেয়ে বেশি আলোচিত-সমালোচিত হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত। দেশজুড়ে সামাজিক পর্যায়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগ বাড়ছে করোনা পরীক্ষার অপ্রতুল ব্যবস্থা আর হাসপাতালগুলোতে করোনার যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিয়ে। চিকিৎসা দিতে গিয়ে শুরু থেকেই চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরা ব্যাপক সংখ্যায় করোনা সংক্রমণের শিকার হন। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা তিনশোর বেশি। এতে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েছে। আরেকদিকে, সংক্রমিতদের সংস্পর্শে আসায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসক ও নার্সকে কোয়ারেন্টাইনে যেতে হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব কারণে করোনা চিকিৎসার নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও নার্সের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী দিনগুলোতে সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সংখ্যাও বাড়তে থাকবে। তাই হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে সংকট উত্তরণে সরকারের দুই হাজার চিকিৎসক ও পাঁচ হাজার নার্স নিয়োগ আশাব্যাঞ্জক খবর।
সরকারি কর্ম-কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশের পর করোনাভাইরাস সংক্রমণে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় দুই হাজার ডাক্তার নিয়োগ দিয়ে সোমবার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের স্বাস্থ্য ক্যাডারের প্রবেশপদে রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে সাময়িকভাবে নিয়োগ প্রদান করা হলো। প্রথমে ৩৯তম বিসিএসে অপেক্ষমাণ তালিকার চিকিৎসকদের নন-ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ করার কথা থাকলেও এই দুই হাজার চিকিৎসককে ক্যাডার হিসেবেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নতুন এ চিকিৎসকদের আগামী ১২ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ কর্র্তৃক নির্দেশিত বা পদায়িত কার্যালয়ে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই দিনে সিনিয়র স্টাফ নার্স পদে ৫ হাজার ৫৪ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করেছে পিএসসি। এ নার্সদের নিয়োগ হবে ২০১৮ সালের সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগ পরীক্ষার অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে। আশা করা হচ্ছে নতুন এ নার্সদের নিয়োগও শিগগিরই চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে। এদিকে করোনা আক্রান্ত রোগীদের জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদানের শর্তে ২ হাজার ৬৫৪ সেবাকর্মী নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান/হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এ সেবাকর্মী নিয়োগ দেবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এ সেবাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে ল্যাবরেটরি অ্যাটেনডেন্ট, আয়া, ওয়ার্ডবয় ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী। স্বাস্থ্যসেবা খাতে দুর্যোগকালের জনবল সংকট মোকাবিলায় এ দুই হাজার নতুন ডাক্তার, পাঁচ হাজার নতুন নার্স এবং হাসপাতালকর্মীরা কাজ শুরু করলে সংকট মোকাবিলায় কিছুটা গতি আসবে বলে আশা করছে সরকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মান অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য একজন চিকিৎসক থাকতে হয়। সেখানে বাংলাদেশে প্রতি তিন হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক আছেন একজন। দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ধরলেও জনসংখ্যার অনুপাতে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার চিকিৎসক প্রয়োজন। এ হিসাবে চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশে চিকিৎসক ঘাটতি প্রায় ৭০ শতাংশ। এ পরিপ্রেক্ষিতে দুর্যোগকালের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে নিয়োগ দেওয়া হলেও দুই হাজার চিকিৎসক নিয়োগ অবশ্যই আশাব্যঞ্জক ঘটনা। তবে এ চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ ও কাজে যোগদান যেন কোনোরকম দীর্ঘসূত্রতায় আটকে না যায় সে বিষয়েও মনোযোগ দেওয়া জরুরি। নইলে যে উদ্দেশ্যে দ্রুত এ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সেটাই ব্যাহত হতে পারে। আর করোনা চিকিৎসার সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করতে যাওয়া এ চিকিৎসক ও নার্সদের সবার জন্য যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক বা পিপিইসহ অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জামাদি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের জন্য করোনা চিকিৎসার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা নিশ্চিত করাটাও জরুরি। নইলে সদ্যই চাকরিতে প্রবেশ করা চিকিৎসক ও নার্সদের পক্ষে যথাযথ সেবা দেওয়া মুশকিল হয়ে উঠতে পারে।
আশা করা যায় নতুন এ জনবল হাসপাতালগুলোতে করোনা চিকিৎসার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও গতি সঞ্চার করবে। কিন্তু সংক্রমণ বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশ থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা এবং করোনা পরীক্ষার হার বাড়ানো নিয়ে উদ্বেগ দূর করতেও সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই বলছেন, আইইডিসিআরে প্রায় তিন হাজার নমুনা আটকে রয়েছে। বলা হচ্ছে, অনেকেই করোনা আক্রান্ত হয়ে কিংবা সংক্রমণের কারণে কোয়ারেন্টাইনে থাকায় গবেষণাগারগুলোতে ল্যাব কর্মকর্তা ও টেকনিশিয়ানের অভাব রয়েছে। কিন্তু এ দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন পরীক্ষা তদারকি করার যোগ্যতাসম্পন্ন গবেষক ও টেকনিশিয়ানদের নিয়োগ করে এ বিষয়ে গতি আনা যেতে পারে। গবেষণাগার পরিচালনায় লোকবল বাড়িয়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ফল প্রদানে গতি আনা এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আশু কর্তব্য। হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী এবং গবেষণাগারে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার প্রয়োজনীয় লোকবল নিশ্চিত করা করোনা মোকাবিলার লড়াইয়ে সাফল্য বয়ে আনুক এটাই প্রত্যাশা।
