সংক্রমণের সব পথ খোলা

আপডেট : ০৬ মে ২০২০, ০৫:১৮ এএম

দেশে করোনা পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। একদিকে যেমন গুচ্ছ গুচ্ছভাবে সংক্রমণ এলাকা বাড়ছে; তেমনি মৃদু লক্ষণ নিয়ে এখনো শনাক্তের বাইরে ৮০ শতাংশ রোগী ধীরে ধীরে জটিল হয়ে উঠছে। এমনকি রোগটির যে ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ প্রবণতা, তাতে এমনিতেই দেশে করোনা পিকে বা চূড়ায় উঠতে কিছুটা বেশি সময় লাগবে। নামতেও সময় নেবে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়বে। তার ওপর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ঠিকমতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় ও এসব উদ্যোগের বৈজ্ঞানিক দিক নিয়ে প্রশ্ন ওঠায়, করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এই মুহূর্তে করোনা সংক্রমণের সব পথই খোলা। স্বাস্থ্য বিভাগের নেওয়া অনেক সিদ্ধান্তই অবৈজ্ঞানিক। লকডাউন দিয়ে মানুষকে ঘরে রাখার পরিবর্তে রাস্তায় নামার সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব রক্ষার কথা বলে সামাজিকভাবে অনেক বেশি মেলামেশার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে রোগটির সংক্রমণ বাড়ছে। অথচ মে মাসটা দেশে করোনার জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ মাসে সংক্রমণের গতি শ্লথ করা বা ন্যূনতম হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা না গেলে, রোগটির প্রকোপ কমতে অনেক বেশি সময় লাগবে।

এমনকি বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে একসময় দেশে করোনা ঘনীভূত মহামারীর দিকে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একসময় আর কোনো কিছুতেই রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তখন হার্ড ইমিউনিটি (অর্থাৎ রোগীর শরীরে সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা) হবে একমাত্র উপায়। মাঝখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিকসহ নানামুখী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে দেশকে।

এ ব্যাপারে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা যদি সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে না পারি, যাদের করোনা হচ্ছে তাদের যদি আইসোলেশন না করতে পারি, আর কোয়ারেন্টাইন ঠিকমতো না করতে পারি, তাহলে ঘনীভূত মহামারীর দিকেই যাচ্ছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যেভাবে দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট খুলছে, গার্মেন্টস কলকারখানা খুলছে, মানুষ মানুষের সঙ্গে যত বেশি মিশবে, ততই বিপদ বাড়বে। যেভাবেই হোক, মিক্সিং যত বাড়বে, তত বিপদ হবে।

এ বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে দিয়ে আরও বলেন, মে মাসটা এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। তার মধ্যে ঈদে দোকান খুলছে, গার্মেন্টস খুলেছে। শ্রমিক ও কর্মীরা আসা-যাওয়া করছে। বিভিন্ন অফিস খুলছে। এসব ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ রোগটি নিয়ন্ত্রণে আমাদের একটাই উপায় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা, কোয়ারেন্টাইন ও বেশি করে টেস্ট করে জেনে রাখা কারা রোগী, কাদের আইসোলেট করতে হবে। এর বাইরে এটা নিয়ন্ত্রণে আর কোনো পথ নেই। এটা করলেই আমরা করোনাকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারব। আর যদি এসব না মানি, এটা সহনীয় পর্যায়ে থাকবে না, পরিস্থিতি নিয়তির ওপর ছেড়ে দিতে হবে।

এমন অবস্থার মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার দেশে এক দিনে করোনায় সর্বোচ্চ ৭৮৬ জনের আক্রান্তের রেকর্ড হয়েছে। সর্বশেষ ১৪ এপ্রিল আক্রান্তের সংখ্যা দুইশোর ঘরে ছিল। এরপর প্রতিদিনিই তা গড়ে একশ করে বেড়েছে। একই সময়ে বেড়েছে নমুনা পরীক্ষা ও ল্যাবরেটরির সংখ্যাও। ১৪ এপ্রিল নমুনা পরীক্ষা হয় ১ হাজার ৯০৫টি এবং ল্যাবরেটরি ছিল ১৭টি। এর মধ্যে ঢাকায় নয়টি ও ঢাকার বাইরে আটটি। সেখানে গত ২০ দিনের মাথায় গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৫ হাজার ৭১১টি এবং ল্যাবরেটরি সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩টি। এর মধ্যে ঢাকায় ১৭টি ও ঢাকার বাইরে ১৬টি।

একইভাবে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে রোগীর সংখ্যাও। ১৪ এপ্রিল যেখানে শনাক্ত হয়েছিলেন ২০৯ জন ও মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১২ জন, সে সংখ্যা গত ২৪ ঘণ্টায় এসে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৭৮৬ জন ও ১০ হাজার ৯২৯ জনে। অর্থাৎ গত কয়েক দিনের আক্রান্তের সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যায় খানিকটা ওঠানামা থাকলেও প্রতিদিনই অন্তত কয়েকশো মানুষ এ ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।

এমন অবস্থার মধ্যেই গত ২৬ এপ্রিল দেশের অধিকাংশ গার্মেন্টস কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। সময় বাড়ানোর ফলে দোকানপাটে মানুষ আরও বেশি সময় ধরে কেনাকাটা করতে পারছেন। সীমিত পরিসরে চালু হয়েছে কিছু সরকারি দপ্তর। জনগণের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে রমজান ও ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সীমিত পরিসরে দোকানপাট ও শপিং মল ১০ মে থেকে চালু রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তই করোনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে এসব সিদ্ধান্তকে অবৈজ্ঞানিক বলেও মনে করছেন তারা।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভাইরোলজিস্ট দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংক্রমণের সব পথই খোলা এখন। এর কারণ হচ্ছে এখানে করোনা নিয়ন্ত্রণে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেগুলো বিজ্ঞানসম্মত নয়। এসব সিদ্ধান্তের জন্য বিশেষায়িত জ্ঞান লাগে। প্রত্যেকটা রাষ্ট্রে প্রতিদিন ব্রিফ করছেন হয় ভাইরোলজিস্ট, নতুবা কীটতত্ত্ববিদরা। এখানে করছেন কর্মকর্তারা। তারা বুঝতে পারছেন না তারা যেসব সিদ্ধান্ত নেবেন সবগুলোই ভুল হবে। ১৭ সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি করা হয়েছে। তারাও কিছুই জানেন না কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে। যে যার মতো করে প্রভাব বিস্তার করছে। যা হচ্ছে সবই অবৈজ্ঞানিক। যেখানে লকডাউন আরও কঠোর করার কথা, তখন আমরা নানাভাবে শিথিল করে দিলাম। ফলে আক্রান্ত বাড়ছে। যে সংখ্যা আমরা পাচ্ছি, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। পরীক্ষা বাড়ালে শনাক্ত সংখ্যাও বাড়বে।

এই ভাইরোলজিস্ট বলেন, দেশে যেখানে এখন টেস্ট দরকার ১৫ থেকে ২০ হাজার, সেখানে করছি পাঁচ হাজারের কিছু বেশি। অর্থাৎ যোগ্য লোক যোগ্য জায়গায় নেই। টেকনিক্যাল কমিটিতে ভাইরোলজিস্ট ও এপিডেমিওলজিস্ট থাকবেন, তারা গাইডলাইন দেবেন। তাদের রাখা হয়নি। কিছু পরিচিত মুখ দিয়েই করোনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

তাহলে সমাধান কিসে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা যদি সঠিকভাবে সোশ্যাল ডিসটেনস মেইনটেন করি, তাহলে সংক্রমণ ফ্লাট হয়ে পিকে উঠতে বেশ সময় নেবে। আর যদি সবকিছু ওপেন করে দিই, সবাই একসঙ্গে মিশতে থাকি, তাহলে একলাফে ওপরে উঠে যাবে। তারপর কমবে।

কমার কারণ উল্লেখ করে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, আমরা যদি সোশ্যাল ডিসটেনস মেইনটেন না করি, তাহলে যে ৮০ শতাংশ লোকের মধ্যে করোনার কোনো উপসর্গ নেই, তাদের অ্যান্টিবডি তৈরি হবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে। এরা যদি আক্রান্তদের সান্নিধ্যেও যায়, তাহলেও এদের কিন্তু আর রোগ হবে না। সে আরেকজনকে সংক্রমিত করবে না, ছড়াবে না। এটাকে আমরা বলি হার্ড ইমিউনিটি। এই হার্ড ইমিউনিটি কিন্তু আসল জিনিস। এটা যখন তৈরি হবে, চূড়াটা ফ্লাট হতে হতে শেষ হবে। নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় সামান্যভাবে থাকবে। দেশে ওই রকম ঘটনা ঘটবে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে যে করোনার বৃদ্ধি, সেটা কিন্তু এক জায়গায় অনেক দিন ধরে বাড়ছে, বিষয়টা কিন্তু সেরকম নয়। এক জায়গার সংক্রমণ কমে গিয়ে আরও দুই জায়গায় বাড়ছে। দুই জায়গায় সংক্রমণ কমে যাচ্ছে, আরও চার জায়গায় বাড়ছে। গুচ্ছ গুচ্ছভাবে কমছে বাড়ছে, ছোট ছোট ঢেউয়ের মতো। এই ছোট ছোট ঢেউগুলো যোগ করে মোট যে সংখ্যা আসছে, সেটার উচ্চতা কম, কিন্তু চওড়া বেশি। মানে সময় বেশি লাগছে সংক্রমণ হতে। উঠতেও সময় লাগছে, নামতেও সময় বেশি লাগবে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বেশি। সরকারিভাবে যে রোগীর যে সংখ্যা, এর বাইরেও কিন্তু মৃদু লক্ষণ নিয়ে আরও রোগী আছে। আমার হিসাবে এটা লক্ষাধিক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে যেটা দিচ্ছে, এটা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা। আজ পর্যন্ত ১০ হাজার। এর ১০ গুণ মৃদু লক্ষণের রোগী আছে।

এ কীটতত্ত্ববিদ বলেন, করোনা শনাক্তের সংখ্যা কিন্তু প্রতি সপ্তাহে গড়ে একশ করে বাড়ছে। বৃদ্ধিটা একলাফে হচ্ছে না। এটা যেহেতু সারা দেশে ছোট ছোট ক্লাস্টারে হচ্ছে, এগুলো কন্ট্রোল করা যাচ্ছে। সে কারণে এটার স্থায়িত্বকাল হয়তো দীর্ঘ হবে, ক্ষয়ক্ষতিটা কম হবে। যদি আমরা বড় কোনো ক্লাস্টার হওয়া থেকে ঠেকাতে পারি, ঘনীভূত মহামারী যদি না হয়, তাহলে আমরা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হব। কিন্তু সীমিত পরিসরে না থেকে যদি ঢালাওভাবে কারখানা, দোকানপাট খুলে দিই, ঈদের কেনাটাকার নামে সব রাস্তাঘাটে ভিড় করি, তাহলে কিন্তু ওই বিপর্যয় আমাদের সামনে আছে, যেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি বা উহানে হয়েছিল।

এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, বাংলাদেশ অন্য দেশগুলোর মতো সেই অবস্থানে যায়নি। কিন্তু ঈদকে সামনে রেখে যদি কোনো ভুল করি, তাহলে সর্বনাশ হবে। ঈদ না, বলতে হবে আমার জরুরি কেনাকাটার জন্য কিছু কিছু দোকান নিয়ম মেনে খুলেছি। যেভাবে এতদিন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো খোলা ছিল, এত বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। মুদির দোকান নিয়মমাফিক চলেছে। রেস্টুরেন্টগুলো খোলা ছিল। নিয়ম মেনে চলেছে। কিন্তু ইফতারের নামে যদি ভিড় হয়, ঈদের কেনাকাটার নামে যদি অনাবশ্যক ভিড় হয়, আড্ডা হয়, তাহলে সর্বনাশ। তাহলে কিন্তু আমরা একটা বড় ধাক্কায় পড়ব। এখন তো প্রথম ঢেউ হচ্ছে। সেই ঢেউয়ের ঘাড়ের ওপর বড় সুনামির ঢেউ শুরু হবে। কাজেই আমাদের সাবধান থাকতে হবে।

এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, সরকার তো বলছে স্বাস্থ্যবিধির কথা। কিন্তু পাবলিকের কাছে কী বার্তা যাচ্ছে? ঈদকে সামনে রেখে কেনাকাটার সীমিত আকারে দোকানপাট খোলা রাখা হচ্ছে। এটা তো মানুষ যাতে দল বেঁধে বের হয়, সেটাতে উৎসাহ জোগাবে। বলতে হবে জরুরি কেনাকাটার জন্য কিছু দোকান খোলা হচ্ছে। যারা নিয়মবিধি মানবে, সেসব দোকান খোলা থাকবে। যারা মানবে না তারা করবে না। জরুরি কিছু উৎপাদনের জন্য কারখানা খোলা যেতে পারে, যারা নিয়মবিধি মেনে কারখানার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যকরভাবে রাখতে ও যাতায়াতে পরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারবে, তারাই কারখানা খোলা রাখবে। যারা পারবে না, তারা খোলা রাখবে না। তার মানে এখানে পুরো অ্যাপ্রোচটাই ভুল। মানুষ ভাবছে লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে। কাগজে-কলমে কিন্তু লকডাউন শিথিলের কথা নেই। ছুটি কিন্তু বেড়েছে। কিন্তু মেসেজটা যাচ্ছে লকডাউন শিথিল। চলো বাইরে যাই। জরুরি কেনাকাটা ছাড়া বের হতে পারবে না।

এ ব্যাপারে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো উপায় আছে, সূত্র একটাই টেস্ট করতে হবে, শনাক্ত করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এখনো কোনো দেশ এর কোনো বিকল্প বের করতে পারেনি। আফ্রিকার সেনেগালের মতো দেশ যদি পারে, আমরা কেন পারব না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত