ঈদের কেনাকাটার জন্য সীমিত পরিসরে বিপণিবিতান ও দোকানপাট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণায় উভয় সংকটে পড়েছে দেশ। একদিকে সরকারঘোষিত সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার আগেই অঘোষিত লকডাউন পরিস্থিতি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আরেকদিকে গত কয়েক দিন ধরে করোনা সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা লাগাতার বাড়তে থাকায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। সংক্রামক রোগ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ার করে দিচ্ছেন যে, চলতি মে মাসজুড়ে করোনার হটস্পট ও সংক্রমিত গুচ্ছ এলাকাগুলোতে রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে পরিস্থিতি ঘনীভূত মহামারীতে রূপ নিতে পারে। এ অবস্থায় সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এখন নিজেরাই বিপণিবিতান ও মার্কেট খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন মার্কেট কর্তৃপক্ষ ও দোকানমালিকরা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুরক্ষায় শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার শর্তে ১০ মে থেকে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দোকানপাট ও শপিং মল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল সরকার। কিন্তু শিথিল লকডাউনে সুরক্ষা আইন মেনে চলা আদৌ সম্ভব হবে কি না তা নিয়েই অনিশ্চিত সবাই। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের শুভবুদ্ধির উদয়ই এ উভয় সংকট থেকে পরিত্রাণ দিতে পারে।
ব্যবসায়ীদের চাপে মার্কেট খোলার অনুমতি দিলেও সরকার মার্কেট কর্র্তৃপক্ষ ও দোকান মালিকদের জানিয়ে দিয়েছে, স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করতে না পারলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমন পরিস্থিতিতে বুধবার রাজধানীর বড় দুই শপিংমল বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স ও যমুনা ফিউচার পার্ক কর্র্তৃপক্ষ জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে ঈদের আগে মার্কেট না খোলার ঘোষণা দেওয়ায় বাকি ব্যবসায়ীরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েছেন। এর ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিপণিকেন্দ্র বায়তুল মোকাররম মার্কেটও ঈদ পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত জানায়। এছাড়া ঢাকাবাসী মধ্যবিত্তের অন্যতম প্রধান বিপণিকেন্দ্র ঢাকা নিউ মার্কেট এবং ইসলামপুরের পাইকারি কাপড়ের মার্কেটও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দুয়েক দিনের মধ্যেই মার্কেট খোলা বা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা দেবে বলে জানিয়েছে। বড় বড় এ জনপ্রিয় বিপণিকেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখার ঘোষণা আসতে থাকায় ছোট মার্কেট এবং এলাকাভিত্তিক দোকানমালিকরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তবে বিভিন্ন এলাকার মাঝারি আকারের কিছু কিছু শপিং মল ইতিমধ্যেই খোলা রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। এদিকে মার্কেট খুললে ১৪টি নির্দেশনা মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। ক্রেতাদের নিজ নিজ এলাকার ২ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত শপিং মলে যাতায়াত নিশ্চিত করতে এবং সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র বহন করা এর অন্যতম। কিন্তু এসব বিধিনিষেধ কতটা কাজ করবে সে বিষয়ে সবাই সন্দিহান।
ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদ দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় উৎসবের একটি। প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও দোকানিরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং দোকানিদের বাৎসরিক আয়ের বড় উৎস এ ঈদের বাজার। কিন্তু এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে সব ধরনের পাইকারি ও খুচরা বেচাকেনা বন্ধ থাকায় কঠিন সময় পার করছেন তারা। আয় বন্ধ থাকায় বিপুলসংখ্যক দোকান কর্মচারী বেতনভাতা পাচ্ছেন না। তাই মার্কেট খুললে মালিকরা বেতন দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারবেন বলে মনে করছেন। কিন্তু ঈদের বাজারেও দোকান বন্ধ রাখতে হলে নিজেদের পুঁজি রক্ষা, দোকানের ভাড়া পরিশোধ করা কিংবা কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কোনোটাই পারবেন না ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। মার্কেট ও দোকানমালিক সমিতির নেতারা বলছেন, এ ক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে কোনো প্রণোদনা না থাকায় তারা চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন। তাই ঈদকে কেন্দ্র করে মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের জন্য খুবই কঠিন।
এমতাবস্থায় করোনাবিষয়ক জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্যরা মঙ্গলবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, বিপণিবিতান, শপিং মল খুলে দিলে বস্তুতপক্ষে সবকিছুই খুলে দিতে হবে। একটি ব্যবসার সঙ্গে আরেকটি জড়িত। ফলে কোনোভাবেই স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হবে না। তারা স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছেন। এদিকে সিনিয়র মন্ত্রীরা বলছেন, সরকারপ্রধান চান ব্যবসায়ীরা জনস্বার্থ এবং পরিস্থিতি বুঝে নিজেরাই যেন দোকান খোলা থেকে বিরত থাকেন। জনস্বাস্থ্যবিদরাও বলছেন, বাংলাদেশের যে পরিস্থিতি তাতে কোনোভাবেই দোকানপাট খোলা রেখে স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব নয়। ফলে মার্কেট ও দোকানপাট করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ উৎসকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তাই ব্যবসায়ী ও সরকারকেও এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এ ক্ষেত্রে জনগণের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করে ঈদের বাজার খোলার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসাই সবার জন্য মঙ্গলজনক হবে। তবে সেটা করতে হলেও সরকারকে ব্যবসায়ী, দোকানমালিক ও কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তায় এগিয়ে আসতে হবে। আর যদি ঈদের বাজার খুলেই দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে নাগরিকদের নিজেদেরই সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। নইলে তা সবার জন্যই আত্মঘাতী হতে পারে।
