গতি হারিয়েছে কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণকাজ

আপডেট : ০৯ মে ২০২০, ০৪:০৮ এএম

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গতি হারিয়েছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের কাজ। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের কাজ বন্ধ ঘোষণা না হলেও তা চালু আছে নামকাওয়াস্তে। চীনা প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের একটি অংশ প্রকল্পে থাকলেও নেই দেশি শ্রমিকরা। তাছাড়া গত চার মাস ধরে চীন থেকে আসেনি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও কাঁচামাল। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ে আদৌ প্রকল্প শেষ হবে কি না এ নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্টরাও। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে দেশি শ্রমিকরা কাজে নেই। চারদিকে চলছে লকডাউন। এর মধ্যে চীন থেকে যেসব সরঞ্জাম আসার কথা, করোনার কারণে তাও আসেনি। এ অবস্থায় প্রকল্প এলাকায় থাকা কেবল চীনা প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের দিয়ে যতটুকু সম্ভব কাজ চলছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও এখন পর্যন্ত চীনা বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিকরা দেশে ফিরে যাওয়ার কথা বলেননি। তিনি বলেন, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সীমিত আকারে যে প্রকল্পের কাজ চালু রয়েছে এটাই এ মুহূর্তে সান্ত¡না।

চীনের আর্থিক সহায়তায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকায় ‘মাল্টি লেন রোড টানেল আন্ডার রিভার কর্ণফুলী প্রজেক্ট’ শীর্ষক প্রায় ৯ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সরকার। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং প্রকল্পের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। এ প্রকল্পের মাধ্যমে চীনের সাংহাই শহরের মতো চট্টগ্রাম শহরকে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ মডেলে গড়ে তোলা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আধুনিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এ প্রকল্পের মূল্য উদ্দেশ্য।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, চীনের পক্ষ থেকে সময়মতো অর্থ ছাড় না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ শুরু করতেই যথেষ্ট বিলম্ব হয়। যে কারণে টানেল খননের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের শেষের দিকে। কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। চীন ও বাংলাদেশ সরকারের (জি-টু-জি) যৌথ উদ্যোগের এই প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে চায়না কমিউনিকেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি)। গত মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ছিল ৫১ শতাংশ। কিন্তু এরপর করোনা-পরিস্থিতিতে পড়ে গত দেড় মাসে কাজের উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। তারা জানান, মূলত চীন থেকে আসা সেগমেন্ট গিয়েই নদীর তলদেশে টানেলের রিং তৈরি করা হচ্ছে। একটি রিংয়ের ২ মিটার সম্পন্ন করতে ৮টি সেগমেন্ট লাগে। প্রকল্পের জন্য মোট ২০ হাজার সেগমেন্ট আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এসেছে মাত্র অর্ধেক। করোনা সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে বন্ধ হয়ে যায় সেগমেন্ট তৈরির কারখানা। অন্যদিকে দেশে দেশে লকডাউনের কারণে পরিবহন ব্যবস্থায়ও নেমে আসে বিপর্যয়। যে কারণে প্রকল্পের জন্য যথাসময়ে সেগমেন্ট আসার বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ জানান, প্রকল্পের মূল কাজের জন্য ‘সেগমেন্ট’ হচ্ছে মূল উপকরণ। এখন করোনা প্রাদুর্ভাবের আগে ১০ হাজার সেগমেন্ট এসেছে। এরপর আর আসেনি। এছাড়া লকডাউন পরিস্থিতির কারণে দেশি শ্রমিকরাও কাজে আসতে পারছে না। পরিস্থিতি যদি এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে স্বাভাবিক হতো তাহলে আমরা কাভার করে আসতে পারতাম। কবে নাগাদ আবার আমরা স্বাভাবিক কাজে ফিরতে পারব, তাও বলা যাচ্ছে না। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে কি না তা এখন নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

প্রসঙ্গত, সার্ক দেশগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলই হচ্ছে প্রথম সড়ক টানেল। প্রকল্পটির প্রস্তাবনায় এর অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে বলা হয়েছে, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে এবং এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হবে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হবে। কর্ণফুলী নদীর পূর্বপ্রান্তের প্রস্তাবিত শিল্প এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত চট্টগ্রাম শহর, চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দরের সঙ্গে উন্নত ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হবে। ফলে ভ্রমণ সময় ও খরচ কমবে এবং পূর্বপ্রান্তের শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও প্রস্তুতকৃত মালামাল চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দর ও দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পরিবহন প্রক্রিয়া সহজ হবে। কর্ণফুলী নদীর পূর্ব প্রান্তের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের ফলে সেখানে পর্যটনশিল্প বিকশিত হবে। সার্বিকভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজীকরণ, আধুনিকায়ন, শিল্পকারখানার বিকাশ সাধন ও পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের ফলে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্প নির্মিত হলে বেকারত্ব দূর হওয়াসহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে প্রস্তাবনায় উল্লেখ রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত