চট্টগ্রামে এক দিনেই নতুন করে ৫৮ জন কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ায় সামাজিক সংক্রমণের বিষয়টি আবারও আলোচনা উঠে এসেছে। চট্টগ্রামে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত মোট ১৯৩ করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ করে চলতি মাসের প্রথম সাত দিনেই ১২৬ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া আরও ৭ রোগী বাইরের জেলা থেকে পজিটিভ হয়ে এসে চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, এটি শুধু আতঙ্কেরই নয়, অশনিসংকেতও। বারবার বাসা থেকে বের হয়ে অকারণে সাধারণ মানুষের অলিগলিতে ঘোরাঘুরি ও জনসমাগম স্থান এড়িয়ে না চলার ফল এটা। আসছে দিনে সংক্রমণের হার আরও বেশি হবে বলেও মনে করছেন তারা। নগর ও গ্রামের বাসিন্দারা সামাজিক দূরত্ব না মেনে চলার ফলেই সংক্রমণের হার বাড়ছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনও।
সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে, চলতি মাসের ১ মে চট্টগ্রামে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে তিনজন, ২ মে তিনজন, ৩ মে ৫ জন, ৪ মে ১৬ জন, ৫ মে ছয়জন ও ২২ জন, ৬ মে ১২ জন এবং ৭ মে দুই ল্যাবে ৫৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়।
গত ২৬ মার্চ থেকে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা শুরু হয়। এরপর ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়েও কভিড-১৯ শনাক্ত পরীক্ষা শুরু হয়। চট্টগ্রামের দুটি পরীক্ষাগারে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার একশ নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এরমধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছে মোট ১৯৩ জনের। এরমধ্যে গত বৃহস্পতিবার বিআইটিআইডির ল্যাবে ১৯৮ নমুনা পরীক্ষা করে ১৮ জনের শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া যায়। এছাড়া গতকাল শুক্রবার প্রকাশ হওয়া গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে সিভাসুর ল্যাবে ৬১ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৪০ জনের করোনাভাইরাস পজিটিভ এসেছে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি জানান, সিভাসুর ল্যাবে ৬১টি নমুনা পরীক্ষায় ৪০টি পজিটিভ এসেছে। এদের মধ্যে দুজন কক্সবাজার ও খাগড়াছড়ি জেলার হলেও তারা চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন আছেন।
চট্টগ্রামে আক্রান্তদের মধ্যে উপজেলার আছে ১৪ জন। এর মধ্যে সাতকানিয়ায় ৭ জন, সীতাকু-ে ৫ জন, হাটহাজারীতে একজন এবং বোয়ালখালীতে একজন আছেন। চট্টগ্রাম নগরীতে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২৬ জন। এদের মধ্যে নগরীর অলংকার ও বহদ্দারহাট এলাকার ২ জন, হালিশহরের ৩ জন, কসমোপলিটন, আগ্রাবাদ, মেহেদীবাগ এলাকার ৩ জন, বাকলিয়ায় ৪ জন, নাসিরাবাদ ও মোগলটুলী এলাকায় ২ জন, ইপিজেড এলাকায় ২ জন, সরাইপাড়ায় ১ জন আছেন। এছাড়া নগরীর ফিরিঙ্গীবাজার, দামপাড়া, আইসফ্যাক্টরি, মির্জাপুল, সদরঘাট, আমবাগান রেলওয়ে কলোনি, সাগরিকা কাজিরদীঘি এলাকায় একজন করে করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের এক চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এত রোগী যে শনাক্ত হচ্ছে এসব লকডাউন শিথিল করে দেওয়ার ফল। মানুষকে আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে, প্রশাসন কঠোর হলে হয়তো সংক্রমণ কমত। মানুষ এখন বাইরে আড্ডা দিচ্ছে, লকডাউন এলাকা উৎসুক হয়ে দেখতে যাচ্ছে। ইফতারি কিনতে ভিড় করছে, গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে। এসব করতে গিয়ে ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
ফৌজদারহাট বিআইটিআইডির ল্যাব ইনচার্জ ডা. শাকিল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার উপযোগী করে সিভাসুতে পরীক্ষার জন্য পাঠাই। আমাদের ল্যাবেও নমুনা জট কমেনি। বর্তমানে আট শতাধিক নমুনা পরীক্ষা জন্য পেন্ডিং। সামনের দিনে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে।’
স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদের (স্বাচিপ) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক ডা. মিনহাজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরীক্ষার সংখ্যা বেড়েছে, তেমনি শনাক্তের হারও বেড়েছে। তবে মানুষের অসচেতনতায় সংক্রমণ বাড়ছে। শনিবার থেকে চমেকের ল্যাবেরও করোনা পরীক্ষা শুরু হবে। এখন উচিত সাধারণ মানুষের সচেতন হওয়া, তাহলে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যাবে। পরীক্ষাগার বাড়ছে, আইসিইউ স্থাপন হয়েছে। এখন যদি অপ্রয়োজনে বাজারে ঘোরাঘুরি ও অলিগলিতে আড্ডা বন্ধ না হয়, তাহলে বিপর্যয় ঠেকানো তো সম্ভব হবে না।’
অন্যদিকে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিয়ম অনুযায়ী নমুনা পরীক্ষার পাশাপাশি উপজেলার নমুনা পরীক্ষায়ও জোর দিচ্ছি। নগর ও গ্রামের বাসিন্দারা সামাজিক দূরত্ব না মানার ফলেই সংক্রমণের হার বাড়ছে। চট্টগ্রামের এই আক্রান্তরা সামাজিক সংক্রমণের শিকার। বাসায় থাকলে এমন পরিস্থিতি হতো না।’
নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে উল্লেখ করে সিভিল সার্জন আরও বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার ছিল চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ রেকর্ড। জনগণের কাছে আকুল আবেদন করছি, অযথা বের হবেন না। এতে নিজের ক্ষতির চেয়ে পরিবারের সদস্যদের বেশি ক্ষতি হচ্ছে।’
