তৌসিফ আহমেদ : ক্রিকেটের লাওনেল রিচি

আপডেট : ১০ মে ২০২০, ১২:২৬ এএম

তৌসিফ আহমেদ দেখতে ঠিক লাওনেল রিচির মতো! চোখ, চুল, মুখের গড়নে হুবহ মিল। আরও একটা মিল আছে। মার্কিন শিল্পীর ...is it me you’re looking for?... গানের মতোই তৌসিফের অভিষেক।

১৯৮০ সালে পাকিস্তান সফরে অস্ট্রেলিয়া। তৌসিফ তখন করাচিতে ক্লাব ক্রিকেটে খেলেন। অলিগলিতে বল করেন। জাভেদ সাদিক নামে একজন তাকে দেখে পাকিস্তান দলের ম্যানেজার মুশতাক মোহাম্মদকে জানান। এসব ক্ষেত্রে নিয়ম হলো নেটে ডেকে এনে পরখ করা। সেই নিয়ম মেনে পরের দিন পাকিস্তান দলের নেটে ডাকা হলো তৌসিফকে। এরপর যা হলো তা সিনেমার চিত্রনাট্যকে হার মানাবে। নেটে জাভেদ মিয়াঁদাদকে দু-দুবার বোল্ড করেছিলেন। কী হয়েছিল তৌসিফের মুখ থেকেই শোনা যাক, ‘মুশতাক মোহাম্মদ আর অধিনায়ক জাভেদ মিয়াঁদাদ আমার বোলিং দেখে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, করাচি টেস্ট শুরুর একদিন আগে ইলিয়াস খানকে বাদ দিয়ে একাদশে জায়গা করে দিলেন।’

মাত্র ২২ বছরে গ্রেগ চ্যাপেলের অস্ট্রেলিয়াকে ঝাঁকুনি দিয়ে টেস্ট শুরু করলেন। প্রথম ইনিংসে তৌসিফের বোলিং ৩০.২-৯-৬৪-৪। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৪-১১-৬২-৩। এই তিন উইকেটের একটি অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল, অন্যটি কিম হিউজ। প্রথম ইনিংসেও হিউজকে আউট করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়াকে হারাল পাকিস্তান। এমন শুরুর পর যতদূর যাওয়ার কথা ছিল যেতে পারেননি। চিরকাল দুই সতীর্থ আবদুল কাদির আর ইকবাল কাশিমের ছায়ায় পড়ে থেকেছেন। থাকতে থাকতে এক সময় ফুরিয়ে গেছেন। অথচ তার ক্যারিয়ারের দিকে চাইলে এখনো মনে হয়, ‘ফুরত না যদি, আহা...।

প্রথম টেস্টে আলো ছড়ানোর পর ইউনাইটেড ব্যাংকের স্পোর্টস ডিপার্টমেন্টে চাকরি হলো। ১৬ বছর সেই দলের হয়ে খেলেছেন। অবসরের পর ১৯৯৮ থেকে ২০০১ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ম্যাচ রেফারির দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর শারজাতে থিতু হন। সেখানে নিজের অ্যাকাডেমি আছে। কোচিং করান। পিসিবির চাকরি নিয়ে আবার পাকিস্তানে ফেরেন ২০০৮ সালে। তৌসিফের জীবনটা এমনই নিস্তরঙ্গ যে দেখে আফসোস হয়। অথচ কী না ছিল তার। ক্লাসিক অফস্পিনারের মতো বাতাসে দারুণ ফ্লাইট করাতে পারতেন। ১৯৮৫ সালে শারজার রথম্যানস কাপে তার ফ্লাইট বুঝতে না পেরে কপিল দেব আর আজহারউদ্দিন বোল্ড হন। খেলা ছাড়ার পর বলেছিলেন, ‘স্পিনারের আসল গুণ হলো বল ঘোরানোর ক্ষমতা। লাইন লেন্থ আসবে পরে।’ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অভিষেক টেস্ট সিরিজে ১২ উইকেট নিয়েছিলেন। এর পরের দুই সিরিজে তাকে বিবেচনা করা হয়নি। একে কী বলবেন, ট্র্যাজেডি? তৌসিফের জীবনে এমন ট্র্যাজেডি আরও আছে।

টেস্ট অভিষেকের পর টানা দুই বছর ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফর্ম করেছেন। ২৪ রানে ১১ উইকেট নেওয়ার পরও টেস্ট দলে সুযোগ মেলেনি। কারণ পাকিস্তান দলে তখন একটা স্পিন স্লটের জন্য লড়াই করতেন কাদির, কাশিম আর তৌসিফ নিজে। তাই অধিকাংশ সময় স্কোয়াডে থাকলেও একাদশে জায়গা হয়নি তার। খেলতে পেরেছেন মাত্র ৩৪ টেস্ট। গড় আর ইকোনমি রেট কিন্তু কাদিরের চেয়েও এগিয়ে তৌসিফ। ৩১.৭২ গড়ে ৯৩ উইকেট নিয়েছেন। ইকোনমি রেট ২.২৭। কাদির ৬৭ টেস্টে ২৩৬ উইকেট নিয়েছেন ৩২.৮০ গড়ে। ইকোনমি রেট ২.৭১।

তৌসিফ নিজের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছিলেন ১৯৮৬-৮৭ ভারত সফরে। বেঙ্গালুরুতে সিরিজের শেষ টেস্টে ১৩৯ রানে ৯ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। ওটা ছিল সুনীল গাভাস্কারের শেষ টেস্ট। দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৬ রান করেছিলেন ভারতের কিংবদন্তি। স্পিনের বিপক্ষে কীভাবে খেলতে হয় তার উদাহরণ হিসেবে সানির সেই ইনিংসটার কথা বলা হয় এখনো। শেষ টেস্টে ম্যাচসেরাও হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ম্যাচটার আসল হিরো তো তৌসিফ। তার কারণেই ১৬ রানে জিতেছিল পাকিস্তান। প্রথম দিন মানিন্দর সিং নিয়েছিলেন ৭ উইকেট। সবাই ধরেই নিয়েছিল পাকিস্তানি স্পিনাররা ভালো করবে। করেছিলও। তবে সেই পারফরম্যান্সের সঙ্গে একটা ঘটনার যোগসূত্র আছে। টেস্টের প্রথম দিনের শেষে এক অনুষ্ঠানে বিষেণ সিং বেদির সঙ্গে তৌসিফ আর কাশিমের দেখা। তারা টিপস চাইলে বেদি বলেন, ‘এই উইকেটে বেশি স্পিন করার চেষ্টা করলে বল এতটাই টার্ন করবে যে, তা ব্যাটসম্যান আর স্টাম্পকে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবে। কাজেই লাইন লেন্থে মনোযোগ দাও।’ তৌসিফ ঠিক তাই করেছিলেন। ম্যাচ শেষ হলে ক্ষুব্ধ ভারতীয় মিডিয়া সর্দারের বুদ্ধি নিয়ে কটাক্ষ করতে শুরু করে। ঠোঁটকাটা বেদি উত্তরে বলেছিলেন, ‘দুই পাকিস্তানি স্পিনারের সঙ্গে আমার মাত্র পাঁচ মিনিট কথা হয়েছে। ওদের যা বলেছি তা গত কয়েক বছর ধরে আমি ভারতীয় স্পিনারদেরও বলছি। না বুঝলে আমার কী দোষ।’ মিয়াঁদাদের শেষ বলে ছক্কার সেই ইতিহাসখ্যাত ম্যাচে তৌসিফেরও অংশ আছে। ১৯৮৬’র অস্ট্রেলেশিয়া কাপের ফাইনালে চেতন শর্মাকে যে বলে ছক্কা মারেন মিয়াঁদাদ, তখন অন্য প্রান্তে ছিলেন তৌসিফ, ‘আমি ১১ নম্বরে ব্যাট করতে নেমেছিলাম। ৫ রান দরকার ছিল। বল না দেখে পঞ্চম বলে আমি রানের জন্য দৌড় দিয়েছিলাম। অল্পের জন্য রান আউট হইনি। এরপর বড় মিয়ার সেই ছক্কা।’

তৌসিফ প্রথম টেস্ট খেলেছিলেন বন্ধুর কাছ থেকে জুতা ধার করে। টেস্টে ১০০ উইকেট পাননি বলে আফসোস ছিল। রূপকথার মতো অভিষেকের পর এই সামান্য চাওয়াও পূরণ হয়নি। উপেক্ষিত নায়কদের চাওয়া আর কবে পূরণ করেছে ক্রিকেট! জন্মদিনে শুভেচ্ছা তৌসিফ আহমেদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত