চিকিৎসক মেয়ের হৃদয়বিদারক বর্ণনা

৮ হাসপাতাল ঘুরে কুর্মিটোলায় অতিরিক্ত সচিবের মৃত্যু

আপডেট : ১০ মে ২০২০, ০৪:৫৩ এএম

চিকিৎসার আশায় একের পর এক ৮টি বড় বড় হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে এক অতিরিক্ত সচিবের। তার নাম গৌতম আইচ সরকার। তিনি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। কিডনি রোগে আক্রান্ত গৌতমের মেয়ে চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও তাকে সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালে ভর্তি করাতে ব্যর্থ হন। শেষে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তির এক দিন পর তিনি মারা যান। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে গতকাল শনিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে দুদকের এক কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে। তার নাম খলিলুর রহমান।

মৃত গৌতম আইচের মেয়ে ডা. সুস্মিতা জানান, তার বাবাকে আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন হলেও দেওয়া সম্ভব হয়নি। ৮-৯টি হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে পরে এক আত্মীয়ের চেষ্টায় বৃহস্পতিবার রাতে কভিড-১৯ রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তার বাবাকে। শনিবার দুপুরে তার বাবার মৃত্যু হয়।

সুস্মিতা বলেন, করোনার কোনো উপসর্গ না থাকলেও অন্য কোনো উপায় না পেয়ে অনেক কষ্টে বাবাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করাই। বাবার আইসিইউ সাপোর্ট খুব দরকার ছিল, কিন্তু তা পাওয়া যায়নি। বাবার চিকিৎসাই হলো না, তিনি মারা গেলেন। আমি ডাক্তার হয়েও কিছু করতে পারলাম না।’

জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা হটলাইন ৩৩৩-এ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা দেন ডাক্তার সুস্মিতা। নিজে চিকিৎসক হয়েও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন যে শ্বাসকষ্ট থাকলেও তার বাবা কভিড-১৯ রোগী নন, আর তিনি তার বাবার রোগের আদ্যোপান্ত জানেন।

সুস্মিতা বলেন, ‘বাবার কিডনির সমস্যা ছিল, নিয়মিত ডায়ালাইসিস করা হতো। ডায়ালাইসিসের সময় প্রায়ই হঠাৎ করে প্রেসার বেড়ে যেত, শ্বাসকষ্ট হতো, লাংসে পানি চলে আসত। আইসিইউ সাপোর্ট হলে ঠিকও হয়ে যেত। গত বৃহস্পতিবার ল্যাবএইড হাসপাতালে অতিরিক্ত সচিব গৌতমের ডায়ালাইসিসের সময় প্রেসার বাড়ার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ল্যাবএইডের ইমার্জেন্সি থেকে আমাকে (সুস্মিতা) ফোন করা হয়।’

সুস্মিতা বলেন, ‘আমি বাবাকে ল্যাবএইডে ভর্তি করাতে বলি। তখন তারা বলে, তাদের কনসালট্যান্ট নেই, ভর্তি রাখতে পারবে না। তারা জানায়, ল্যাবএইডে আইসিইউ সাপোর্ট দিতে পারবে না। তাই প্রেসার কমানোর ওষুধ দিয়ে বাসায় নিয়ে যেতে বলে। ল্যাবএইডে তিনি নিয়মিত যে ডাক্তারকে দেখান, তিনিও সেদিন ছুটিতে ছিলেন। আমার কাছে মনে হয়েছে বাসায় আনা ঠিক হবে না, এই মুহূর্তে অক্সিজেন দরকার। বিকেল ৪টায় ডায়ালাইসিস শেষ হয়, আমরা বাবাকে নিয়ে বিকেল ৫টার দিকে ইউনাইটেড হাসপাতালে যাই। তাদের কথা, শ্বাসকষ্ট যেহেতু হচ্ছে, কভিড-১৯ কি না? তার কোনো জ¦র ছিল না। আমি নিজে ডাক্তার পরিচয় নিয়ে সবকিছু বুঝিয়ে বললাম। তখন তারা বলল, কোনো রেফারেন্স ছাড়া তারা ভর্তি নিতে পারবে না। সেখানে আমরা কভিড-১৯ টেস্ট করাতে চাইলে তারা আইইডিসিআরের কথা বলে। কিন্তু তারা (আইইডিসিআর) তো টেস্ট করানো বন্ধ করে দিয়েছে!’ পরে গৌতমকে নিয়ে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান তার মেয়ে।

সুস্মিতা বলেন, ‘তারাও টেস্ট করানোর কথা বলে স্কয়ারে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখান থেকে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে আসি, কিন্তু তারা পেশেন্টকে দেখেইনি, চেকও করেনি। তারা বলে, ভর্তি নিতে পারবে না। যেহেতু আমি এই হাসপাতালে কাজ করেছি, আমি অতিরিক্ত পরিচালকের সঙ্গে কথা বলি। তিনি চেস্ট এক্স-রে করিয়ে আনতে বলেন। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছিল বাবা স্ট্রোক করেছে। কারণ তার কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর তিনি কভিড-১৯ টেস্ট করানোর কথা বলেন। ওখানে আইসিইউ সাপোর্ট দিতে পারবেন না বলে জানানোয় স্কয়ারে নিয়ে যাই।’

সুম্মিতা বলেন, ‘স্কয়ার বলে, আমাদের পক্ষে ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয়, আমরা টেস্ট বন্ধ করে দিয়েছি। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে যাই। তারা বলে, এই পেশেন্টকে কার্ডিয়াক সাপোর্ট দেওয়া দরকার, কিডনির পেশেন্ট যেহেতু। আমাদের এই সাপোর্ট শুরু হয়নি, আমরা পারব না। সেখান থেকে সোহরাওয়ার্দী কার্ডিয়াকে যাই। তারা রাখতে পারবে না বলে জানায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কথা বলি, তারাও বলে, এই মুহূর্তে ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয়। আমি মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালেও গিয়েছি।’

ডা. সুস্মিতা বলেন, ‘আমাদের আশপাশে এমন কোনো হাসাপাতাল নেই যেখানে ভর্তি করানোর চেষ্টা করিনি। পরে সাড়ে ৯টার পর যখন আর কিছু করার ছিল না তখন আমরা বাসায় এসে বসে থাকি। কারণ আমাদের আর কিছুই করার ছিল না। আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে একজন ডাক্তার হিসেবে আমি জানতাম বাবার কী হয়েছে, কিন্তু আমি কোথাও তাকে আইসিইউ সাপোর্টে নিতে পারলাম না। তার একটা আইসিইউ সাপোর্ট হলেই হতো, আমি তার হিস্ট্রিটা খুব ভালোমতোই জানি। বাবা (গৌতম) ডা. রফিকুল আলমের পেশেন্ট ছিলেন, পরে আমরা মনোজ জামান স্যারকে দেখাতাম। ডা. রফিকুল আলম বাবাকে ভালোমতোই চেনেন, বাবার সমস্যা মাঝে মাঝে খুব জটিল হয়, তার আইসিইউ সাপোর্ট দরকার হয়। সব হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি করাতে ব্যর্থ হয়ে মৃত্যুপথযাত্রী বাবাকে নিয়ে যখন বাসায় বসে আছেন, তখন তাদের এক আত্মীয় অনেক চেষ্টার পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে একটা ‘সিট ম্যানেজ’ হওয়ার খবর জানান।

সুস্মিতা বলেন, ‘রাত ১০টার দিকে আমাদের একজন রিলেটিভ একটা রেফারেন্সে কুর্মিটোলায় একটা জেনারেল বেডের অ্যারেঞ্জ করেন। বাবার অক্সিজেনের খুব বেশি দরকার হওয়ায় তার কভিড-১৯-এর কোনো উপসর্গ না থাকলেও তাকে ওই হাসপাতালে নিয়ে যাই। বাবাকে আলাদা কেবিনে রাখা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে বাবার অক্সিজেন ফল করতে শুরু করল। যে বেডে তাকে রাখা হয়েছিল, সেখানে সরকারি ডাক্তার সেখানে যায়নি। তারা আমাকে ওষুধ বুঝিয়ে দেয়, আমিই ওষুধ খাওয়াচ্ছি, আমার ভাই অক্সিজেন দিচ্ছে।’

ডা. সুস্মিতা বলেন, ‘হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানায়, শুক্রবার সকালে কভিড-১৯ পরীক্ষা করাবেন। আমরাও সেটাই চাইছিলাম। কভিড-১৯-এর রিপোর্টটা পেলে সেই অনুযায়ী আমরা অন্য ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, প্রয়োজনে ভালো কোনো বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাতাম। কিন্তু শুক্রবার সারা দিন তারা টেস্টই করায়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর তারা বলছে, আগেই নমুনা নেওয়া দরকার ছিল। আমরা বললাম, এখন নিয়ে নেন। আমরা এখনো করাতে চাই। আমি ডাক্তার হিসেবে মনে করি, বাবার কভিড-১৯-এর কোনো উপসর্গ ছিল না। ডায়ালাইসিসের সময় তার আগেও এমন হয়েছে। এ অবস্থায় হাসপাতালগুলো চাইলেই তাকে ভর্তি নিতে পারত। কভিড-১৯ সন্দেহ হলে প্রয়োজনে আইসোলেশনে রাখতে পারত, কিন্তু কেউ সেটা করেনি। বাবার সঠিক চিকিৎসা হয়নি। আমরা ভয় পাচ্ছিলাম স্ট্রোক করেছে। একটা পা নাড়াতে পারছিলেন না, কথাও বলতে পারছিলেন না। ল্যাবএইডের ইমার্জেন্সি থেকেও বলেছে, উনি মনে হয় স্ট্রোক করেছেন।

সুস্মিতা বলেন, ‘আমি আমার বাবাকে নিয়ে সাফার করছি, ...এটা নিয়ে আমি কথা বলব; বিশেষ করে নরমাল যারা পেশেন্ট, কভিড-১৯ না, আমার বাবার মতো কিডনির পেশেন্ট, তারা কী করবেন, তাদের জন্য কী করছেন?

দুদক কর্মকর্তার মৃত্যু : এদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দুদকের এক কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।  শনিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান সহকারী মারা যান। তার নাম খলিলুর রহমান। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আলাউদ্দিন আল আজাদ এ তথ্য নিশ্চিত করেন।  তিনি বলেন, খলিলুর রহমানের মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে।

দুদকের উপপরিচালক শাহীন আরা রেখা তার ফেইসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘আমাদের সহকর্মী মো. খলিলুর রহমান, প্রধান সহকারী, দুদক (বি:অনু:ও তদন্ত-২ ) শাখায় কর্মরত ছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি ওমরাহ করে এসেছিলেন। খলিলুর রহমানের গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠি। তার ঢাকার বাসা মানিকনগর এলাকায়। তিনি ১০-১২ দিন যাবৎ সর্দি জ্বরে ভুগছিলেন। গতকাল শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে টেস্ট করা হয়। টেস্টে করোনা পজিটিভ হলে সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শনিবার দুপুর দেড়টায় মারা যান তিনি।’

এর আগে গত ৬ এপ্রিল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান দুদকের পরিচালক ও ২২তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা জালাল সাইফুর রহমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত