খুলনার কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল

৪ বছর বেতনহীন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

আপডেট : ১১ মে ২০২০, ০৪:২১ এএম

টানা ৩৪ বছর ধরে খুলনার কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আশায় আছেন রাজস্বভুক্ত হওয়ার। সেই আশায় টানা ১৪ বছর (১৬৮ মাস) অর্ধেক এবং প্রায় চার কাজ করে যাচ্ছেন ‘বিনা বেতনে’। এক মধ্যে কেউ চাকরি ছেড়ে গেছেন, কেউ নিয়েছেন অবসর। জীবনের তাগিদে কেউ কেউ অফিস সময়ের বাইরে করছিলেন অন্য কোনো পেশার কাজ। কিন্তু হঠাৎ করে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে টানা ছুটি ও অলিখিত লকডাউনে সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে তাদের। মিলছে না কোনো সরকারি সহায়তাও। এই অবস্থায় হোস্টেলটির বর্তমান ও সদ্য সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে পড়েছেন মানবেতর অবস্থায়। ১৯৮৬ সালে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্প উদ্বোধনের তিন বছরের মধ্যে রাজস্বভুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। এরপর দুই দফায় হোস্টেলটি সরকারিকরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। তবে যতবারই প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে, ততবারই মিলেছে মৌখিক আশ্বাস। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিষয়টি সম্পর্কে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাছে মতামতও চাওয়া হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু আজও কোনো সুরাহা হয়নি তার।

এর মাঝে অবশ্য ‘আয়ের মাধ্যমে ব্যয় নির্বাহ’ করার নির্দেশনা দেওয়া হয় মন্ত্রণালয় থেকে। তাতে বলা হয়, হোস্টেলটির সিট ভাড়া দিয়ে যে আয় হবে তা থেকেই আনুষঙ্গিক খরচসহ বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু খুলনার মতো একটি শহরের ১৫০ সিটের হোস্টেলটির বেশিরভাগ সিটই খালি থাকায় আয় পর্যাপ্ত হয় না কখনই। ফলে নিয়মিত বেতন-ভাতা পান না কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

খুলনা নগরের বয়রায় কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলটির প্রকল্প মেয়াদ শেষ হলে তা সরকারিকরণ করার কথা থাকলেও হয়নি। ২০০৬ সালে তৎকালীন খুলনা জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ফিরোজা বেগম হোস্টেলটি সরকারিকরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। জবাবে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক নূরুল কবির সিদ্দিক হোস্টেলটিতে রাজস্ব পদ সৃষ্টির প্রস্তাব পেশ করতে বলেন। সে অনুযায়ী, হোস্টেল সুপার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও খুলনা জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা নার্গিস ফাতেমা জামিন ১২ জনের পদ সৃষ্টির লিখিত প্রস্তাব দেন। এরপর এ ব্যাপারে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

শুরুতে এখানে কর্মরত ছিলেন ১৯ জন। বেতন-ভাতা না পাওয়ায় অনেকে চলে গেলেন। বর্তমানে কর্মরত ৮ কর্মচারী। এর মধ্যে একজন হিসাবরক্ষক, একজন স্টোরকিপার, পিয়ন একজন, বাবুর্চি একজন, খাদ্য পরিবেশনকারী দুজন, দারোয়ান দুজন ও একজন ঝাড়ুদার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোস্টেলের এক কর্মচারী জানান, সদ্য অবসরে যাওয়া ও বর্তমান কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় দেড় কোটি টাকা বাকি রয়েছে। বেতন বকেয়া পড়ার মধ্যেই সেখানে সংস্কার কাজ হয়েছে তিনবার। সর্বশেষ ২০১৮ সালে ভবন পূর্ণ মেরামতের জন্য দেওয়া হয় ৬ কোটি টাকার অনুদান। 

দীর্ঘ ৩৪ বছর অফিস সহকারী পদে চাকরি করে অবসর নিয়েছেন আব্দুল মান্নান। তিনি জানান, ২০১৭ সালের মার্চ থেকে কোনোরকমের বেতন-ভাতা না পাওয়ায় এবং তার আগের টানা ১৪ বছরের অর্ধেক বেতন বকেয়া থাকায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তাদের পরিবারগুলো। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে সর্বশেষ বেতন পাই। এর পর আর কোনো বেতন-ভাতা পাইনি। এর আগে ২০০৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত অর্ধেক বেতন পেয়েছি। আমি অবসরে এসেও কোনো টাকা পাইনি। এক বছর এলপিআর এর সময়ে কোনো বোনাস মেলেনি।’

এদিকে বর্তমানে সেখানে যারা কর্মরত আছেন তারা পড়েছেন আরও খরাপ অবস্থার মধ্যে। জীবনের তাগিদে কেউ কেউ অফিস সময়ের বাইরে করছিলেন অন্য কোনো পেশার কাজ। কিন্তু করোনা বাধ সেধেছে তাতেও। পাচ্ছেন না ন্যূনতম কোনো সহায়তাও। হোস্টেলের বর্তমান কর্মচারী খায়রুল নেচ্ছা বলেন, এখানে যে কার চাকরি করি তা বুঝি না। বেতন ভাতা কিছু পাই না। প্রায় মাসখানেক আগে একটু ত্রাণ পেয়েছিলাম। কিন্তু তাতে আর কয়দিন চলে। হোস্টেলের আয়া ও বাবুর্চি সেতারা বেগম জানান, প্রায় চার বছর ধরে কোনো বেতন পাই না। সংসার চালাতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারিনি। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না।

হোস্টেলের আয়া সুফিয়া বলেন, ঘরভাড়া দিতে পারছি না। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে আমাদের। অফিস থেকে বাকি বেতন না দিলে ছেলেরা বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেছে।

বিষয়টি নিয়ে খুলনা জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা নার্গিস ফাতেমা জামিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটি যাতে রাজস্বভুক্ত করা হয় সে কারণে সব পত্রসহ আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সচিবকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। তবে করোনার কারণে সব কাজ বন্ধ। বকেয়া বেতনের বিষয়ে তিনি বলেন, সেই বিষয়টিও মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করছে।

এই কর্মকর্তা বলেন, এমনিতেই বেতন না পেয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এর মধ্যে করোনার কারণে হোস্টেল বন্ধ থাকায় চরম বিপদে পড়েছেন তারা। অবশ্য বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নববর্ষের ভাতা দেওয়া হয়েছে। ২০-২২ দিন আগে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। আমাদের আর কিছু করার নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত