লভ্যাংশের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ২০১৯ সালের লভ্যাংশ নীতি ঠিক করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জন্য কোনো ব্যাংক নগদ ও বোনাস মিলিয়ে ৩০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিতে পারবে না। এমনকি নগদ লভ্যাংশ চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে বিতরণ করতে পারবে না ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি বিবেচনায় লভ্যাংশ সংক্রান্ত চারটি স্তর নির্ধারণ করে গতকাল একটি সার্কুলার জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের লভ্যাংশ পলিসি নির্ধারণের কারণে এর ফলে অন্তত ১২টি ব্যাংকে ২০১৯ সালের জন্য লভ্যাংশ না দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কারণ সঞ্চিতি সংরক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতিপূর্বে গৃহীত ডেফারেল সুবিধা নিয়েছে এসব ব্যাংক।
করোনাভাইরাসে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মেটাতে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য বজায় রাখতেই এমন পদক্ষেপ নিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তের ফলে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এমনিতেই তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণসহ মুনাফা পরিস্থিতির অবনতির কারণে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের শেয়ারদর তলানিতে নেমেছে। আবার পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেনেও খরা দেখা দিয়েছে। এখন ব্যাংকের লভ্যাংশ সংক্রান্ত পলিসি নির্ধারণ করে দেওয়ায় ব্যাংক খাতের শেয়ারে আগ্রহ হারাবেন বিনিয়োগকারীরা।
নামমাত্র ডাউনপেমেন্টে খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণের সুযোগ ও ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের সুদ ৯ শতাংশে নামিয়ে আনায় ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্যে অবনতির আশঙ্কা করছিলেন বিনিয়োগকারীরা। এমন আশঙ্কা থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছেন। এতে পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী এ খাতটি গত দুই বছর ধরে বিপুল পরিমাণে বাজার মূলধন হারিয়েছে, যা গত দুই বছর ধরে পুঁজিবাজারের পতনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল যে লভ্যাংশ পলিসি নির্ধারণ করেছে, তাতে ২০১৯ সালের জন্য কোনো ব্যাংক ১৫ শতাংশের বেশি নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না। আর নগদ ও বোনাস মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে পারবে।
২০১৯ সালের জন্য ইতিমধ্যেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কিছু ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গতকালের সার্কুলারের মাধ্যমে জানিয়েছে যে, ইতিমধ্যে যেসব ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করে ফেলেছে, সেগুলোর লভ্যাংশের হার যদি নির্ধারিত সীমার বেশি হয়ে থাকে তাহলে তা স্থগিত করে বেঁধে দেওয়া পলিসি অনুসারে নতুন করে লভ্যাংশ ঘোষণা করতে হবে। এছাড়া নগদ লভ্যাংশের ক্ষেত্রে ২০ সেপ্টেম্বরের আগে তা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করা যাবে না। সার্কুলারটি গতকাল দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণে দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট চাপ থেকে উত্তরণে বৃহৎ শিল্প ও সিএমএসএমই খাতে সরকার ঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনা বাস্তবায়নে সহজলভ্য অর্থ সংস্থানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই দুটি বড় পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলা করে ব্যাংকগুলো যাতে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিতে যথার্থ অবদান রাখতে পারে সে লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোর মুনাফা অবণ্টিত রেখে মূলধন শক্তিশালী করার মাধ্যমে পর্যাপ্ত তারল্য বজায় রাখা একান্ত অপরিহার্য। এ উদ্দেশ্যে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের রিটার্নের বিষয়টি সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে ২০১৯ সালের ব্যাংকের লভ্যাংশ পলিসি নির্ধারণ করা হলো।
সার্কুলারে বর্ণিত লভ্যাংশ নীতিমালা অনুসারে সঞ্চিতি সংরক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতিপূর্বে গৃহীত ডেফারেল সুবিধার অধীন নয় এমন বা ২০১৯ সালের জন্য কোনো ডেফারেল সুবিধা গ্রহণ ছাড়াই যেসব ব্যাংকের ২ দশমিক ৫ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ বাফারসহ ন্যূনতম সাড়ে ১২ শতাংশ বা তার বেশি মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম, সেসব ব্যাংক তাদের সামর্থ্য অনুসারে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ নগদসহ মোট ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে।
যেসব ব্যাংক ডেফারেল সুবিধার অধীন নয় বা ২০১৯ সালের জন্য এই সুবিধা নেয়নি সেসব ব্যাংক মূলধন সংরক্ষণ বাফারসহ নূ্যূনতম ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ বা তার বেশি মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম, সেসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে তাদের সামর্থ্য অনুসারে সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদসহ মোট ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারবে।
ডেফারেল সুবিধার অধীন নয় বা ২০১৯ সালের জন্য কোনো ডেফারেল সুবিধা সম্পূর্ণরূপে সমন্বয় করা ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণ বাফারসহ ন্যূনতম ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ বা তার বেশি থাকে, সেসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতিতে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ নগদসহ মোট ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে।
ডেফারেল সুবিধার অধীন নয় বা ২০১৯ সালের জন্য কোনো ডেফারেল সুবিধা নিয়ে সম্পূর্ণরূপে সমন্বয় করা ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণ বাফারসহ ন্যূনতম ১১ দশমিক ২৫ শতাংশের কম কিন্তু ন্যূনতম সংরক্ষিত মূলধন ১০ শতাংশ রয়েছে এমন ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বোনাস ঘোষণা করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ব্যাংককে অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে।
