নতুন রকমের বিচারে উচ্ছ্বসিত আইনজীবীরা

আপডেট : ১২ মে ২০২০, ০৬:১৫ এএম

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে নতুন যুগে প্রবেশ করছে আদালত। আইনজীবী, সাক্ষী ও আসামিদের শারীরিক উপস্থিতি ছাড়াই তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ভার্চুয়াল আদালতে চলবে বিচার কার্যক্রম। ওয়েব পোর্টালে নিবন্ধন করে আইনজীবীকে করতে হবে মামলার শুনানির আবেদন। ই-মেইলে আইনজীবীকে শুনানির সময় জানিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের লিংক পাঠানো হবে। অ্যালার্ট দেওয়া হবে খুদে বার্তার মাধ্যমে। নির্দিষ্ট সময়ে বিচারক ও আইনজীবীরা যুক্ত হবেন ভিডিও কনফারেন্সে। শুনানি শেষে আসবে আদেশ।

বাংলাদেশের সংবিধান, আইন ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী উচ্চ ও অধস্তন আদালতে মামলার পক্ষভুক্ত বা তাদের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবীদের সশরীরে আদালতে উপস্থিত হয়ে শুনানি ও বিচার কার্যক্রমে অংশ নিতে হয়। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে আদালত বন্ধ থাকায় প্রযুক্তির মাধ্যমে (ভার্চুয়াল কোর্ট) আদালত চালুর সিদ্ধান্ত নেয় সুপ্রিম কোর্ট। গত ৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘আদালত কর্র্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০’-এর খসড়া অনুমোদনের পর ৯ মে এ সম্পর্কিত অধ্যাদেশ জারি করা হয়। গত রবিবার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকায় জানানো হয়, অধস্তন আদালতে আপাতত আসামির জামিন শুনানি হবে। ইতিমধ্যে চেম্বার কোর্ট গঠনসহ হাইকোর্টে তিনটি বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার ঘোষিত ছুটি এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ‘প্র্যাকটিস ডাইরেকশন’ অনুসরণ করে সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতে বিচার কার্যক্রম এভাবে পরিচালিত হবে বলে জানানো হয়।

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান আগামী ১৪ ও ২০ মে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে চেম্বার কোর্টে শুনানি গ্রহণ করবেন। এছাড়া বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের আলাদা বেঞ্চে বিভিন্ন মামলার শুনানি হবে। যেখানে অতি জরুরি রিট ও দেওয়ানি মামলা, ফৌজদারি মামলার জামিন আবেদনের ওপর শুনানি হবে। ইতিমধ্যে মামলার আবেদন পাঠানোর জন্য চেম্বার আদালতের জন্য একটি ও হাইকোর্টের তিন বেঞ্চের জন্য আলাদা তিনটি ইমেইল ঠিকানা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। গতকাল সোমবার হাইকোর্টে বেশ কিছু জামিনের আবেদন ও রিট আবেদন করা হয়েছে। 

ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিচার কার্যক্রমের প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশেও বিচার কার্যক্রমের এই উদ্যোগে উচ্ছ্বসিত আইনজীবীরা। তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে কিছু সমস্যা হলেও ধীরে ধীরে এ পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু না হওয়া পর্যন্ত ভার্চুয়াল আদালত খুবই উপযোগী হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটসহ আইনজীবীদের সবার সম্পৃক্ততা, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিতের দাবি জানান তারা।

এদিকে ভার্চুয়াল আদালত ব্যবহারের বিষয়ে আইনজীবীদের জন্য ‘আমার আদালত : ভার্চুয়াল কোর্টরুম ব্যবহার ম্যানুয়াল’ নামে একটি নির্দেশিকা গত রবিবার প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। প্রযুক্তির মাধ্যমে আদালত পরিচালনার জন্য একটি ওয়েব পোর্টালও চালু করা হয়েছে। মামলার আবেদন, শুনানি এ পোর্টালের মাধ্যমে হবে। ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগকে কয়েক দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অধস্তন আদালতের জন্য ২১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। 

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসজনিত সংকটে দু’মাস ধরে আদালত বন্ধ। শারীরিকভাবে উপস্থিত হয়ে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবীরা আদালতে যেতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল কোর্ট একটি ভালো উদ্যোগ। ইতিবাচক দিক হচ্ছে, এর মাধ্যমে বিচারপ্রার্থী মানুষ অন্তত বিচারের দ্বারে যেতে পারছে, একটি আবেদন করতে পারছে, সে সম্ভাবনাটা তো হলো। বিচার পাওয়ার পথটা চালু হলো।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু সমস্যা হলো বিচারক, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী কেউই এটির সঙ্গে অভ্যস্ত নন। প্রথম পর্যায়ে কিছু সমস্যা হয় তো হবে। তবে সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে পারব। আর আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু না হওয়া পর্যন্ত এভাবে বিচারকাজ চালাতে হবে। তবে প্রতিটি আইনজীবীকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে যাতে কেউ মনে না করেন যে তিনি বঞ্চিত হচ্ছেন।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি মামলায় জামিনের আবেদন করেছি। পরশু (বুধবার) শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এতে করে আদালতের অনেক সময় বাঁচবে। দীর্ঘদিন ধরে আদালতের দরজা বন্ধ ছিল। এর মাধ্যমে বিচারের পথ খুলল। আমরা চাই এটি শুধু করোনাকালীন সময়ের জন্য নয়, ভবিষ্যতের দিক বিবেচনা করে স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি এভাবে বিচার কার্যক্রম হোক।’

যেভাবে হবে মামলার শুনানি : বাদী বা বিবাদীর পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে প্রথমে নিবন্ধন করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় নিজের নাম, ছবি, ইমেইল ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দিয়ে ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে। এটি সম্পন্ন হলে আইনজীবী ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করে ভার্চুয়াল কোর্ট পোর্টালে প্রবেশ করবেন। সেখানে আসামির জামিনের আবেদন ও বেইল বন্ড সংক্রান্ত দুটি ঘর থাকবে। জামিনের আবেদন করতে হলে জামিন সংক্রান্ত ঘরটিতে প্রবেশ করে জামিনের আবেদন, ওকালতনামা ও সংযুক্ত নথিপত্র তিনটি ধাপে আপলোড করতে হবে। তবে এর জন্য কোনো আবেদন ফি লাগবে না।

আবেদন দাখিলের কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ কর্মকর্তার মাধ্যমে আবেদনটি শুনানির জন্য গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। শুনানির জন্য বিচারকের অনুমোদনের পর আবেদনকারী আইনজীবীর ইমেইলে শুনানির সময় জানানোসহ ভিডিও কনফারেন্সে শুনানির জন্য একটি লিঙ্ক দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ে ওই লিঙ্কে প্রবেশ করে আইনজীবী বিচারকের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স শুনানিতে যুক্ত হবেন। জামিন মঞ্জুর হলে একই পোর্টালে বেইল বন্ড দাখিল করতে পারবেন আইনজীবী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত