রোজায় লেশমাত্র লৌকিকতার অবকাশ থাকে না; লোক-দেখানো ভাব থাকে না। এটি বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার একটি অতি গোপন বিষয়। নামাজ, হজ, জাকাতসহ অন্য ইবাদত-বন্দেগি আদায় করলে দেখা যায়। পরিত্যাগ করলেও বোঝা যায়। কিন্তু রোজার ক্ষেত্রে লোক-দেখানো বা শোনানোর সুযোগ থাকে না। ফলে রোজার মধ্যে ইখলাস, আন্তরিকতা বা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা নির্ভেজাল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রোজাদার আমার জন্যই পানাহার ও সহবাস পরিহার করে।’ (মুসলিম)
শুধু আল্লাহর ভয়েই বান্দা পানাহার থেকে বিরত থাকে। না হলে পৃথিবীর কোনো শক্তি এমন আছে, যা তাকে গোপনে এক ঢোক পানি পান করা থেকে বিরত রাখতে পারে? রোজাদার পিপাসায় কাতর হয়, অজুর জন্য মুখে পানি নেয়; কিন্তু একটু পানিও গলার নিচে নামতে দেয় না। কার ভয়ে, কার ভালোবাসায়? একমাত্র আল্লাহতায়ালার ভয়ে, আল্লাহতায়ালার ভালোবাসায়। নির্জন স্থানে কেউ দেখছে না, কিন্তু আল্লাহ দেখছেন। কেউ জানছে না, কিন্তু আল্লাহ জানছেন। স্বাধীন মানুষ তার খাবারের স্বাধীনতা ভোগ করছে না, তার যৌন চাহিদা মেটানোর স্বাধীনতা ভোগ করছে না কোন সে শক্তি? এটি রোজাদারের আত্মিক শক্তি, নৈতিক শক্তি ও তাকওয়ার শক্তি। রোজাদারের এই যে বোধ, এই যে চেতনা এটা অন্য কোনো ইবাদতে দেখা যায় না। এর জন্য রোজাদারকে ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হয়। ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
মাহে রমজান বিশেষভাবে সবর ও ধৈর্যের মাস। হাদিস শরিফে এসেছে, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘রমজান সবরের মাস, আর সবরের প্রতিদান জান্নাত।’ (বায়হাকি)
যেকোনো কাজে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক কঠিন বাস্তবতা রয়েছে, যেখানে সবর ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই প্রয়োজন। কঠিন অনেক সমস্যার সমাধান হচ্ছে ধৈর্য ও সবর। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সবর ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৪)
সবর না থাকার কারণে মানুষ অনাকাক্ষিত বহু সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। অনেক সময় কারণে-অকারণে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। রোজা রেখে যেন ধৈর্যের বাঁধ না ভাঙে, সেজন্য নবী করিম (সা.) আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ। যখন তোমাদের কেউ রোজা থাকে, সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে এবং মূর্খের মতো কাজ না করে। কেউ যদি তাকে গালি দেয় বা ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার।’ (বোখারি, হাদিস : ১৯০৪; মুসলিম, হাদিস : ১১৫১)
মুমিনের ধৈর্যের প্রয়োজন জীবনের সব ক্ষেত্রে, বিপদ-আপদে, মুসিবত, কষ্ট ও জটিলতায়। মুমিন ব্যক্তি বিশ্বাস করে, যত সংকটই আসুক না কেন, সব আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। ফলে সে বিপদে পড়েও ক্ষোভ, হতাশা ও অস্থিরতা প্রকাশ করে না। নিজের ভাষা ও আচরণ সংযত রাখে। কারণ সে আল্লাহর প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী। সে তকদিরে বিশ্বাস করে। তকদিরে বিশ্বাস করা ইমানের ছয়টি স্তম্ভের একটি। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘...আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। আর যে আল্লাহর প্রতি ইমান আনে তিনি তার অন্তরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন।’ (সুরা তাগাবুন, আয়াত : ১১)
ইমানদারের জন্য বিপদ-মুসিবত নিয়ামতস্বরূপ। কারণ এতে গুনাহ মাফ হয়। বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে তার প্রতিদান পাওয়া যায়। মুমিন বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি কান্নাকাটি করে। আল্লাহর কাছে নিজের অভাব ও অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে। সৃষ্ট জীব থেকে বিমুখ হয়ে এক আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।
লেখক : তরুণ আলেম ও ফতওয়াবিষয়ক গবেষক
