ওএমএস তালিকায় সচ্ছল আ.লীগ নেতার স্ত্রী, কন্যাসহ ১৩ স্বজন

আপডেট : ১৩ মে ২০২০, ০৬:১৬ এএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বহু পদের অধিকারী আওয়ামী লীগ নেতা আলহাজ শাহ আলমের ওএমএস ডিলারশিপ বাতিলে ‘কারণ দর্শানো’র নোটিস পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসক। সচ্ছল এ আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে তার স্ত্রী, সন্তান, শ্যালক, ভাই ও ভাতিজাসহ ১৩ স্বজনের নাম সম্প্রতি ঘোষিত ওএমএস তালিকায় অন্তর্ভুক্তের অভিযোগ পেয়েছে জেলা প্রশাসন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জেলা ওএমএস কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান গত সোমবার ডিলার মো. শাহ আলমের কাছে তার ডিলারশিপ কেন বাতিল করা হবে না মর্মে ব্যাখ্যা তলব করেন।

শাহ আলম জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক, জেলা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্য সচিব, জেলা চেম্বার পরিচালক, হোটেল রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি এবং জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কমিটির সদস্য পদে রয়েছেন।

আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলমকে লেখা কারণ দর্শানোর চিঠিতে বলা হয়, ‘কভিড-১৯ সংক্রমণের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পৌর এলাকার দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে কাউতলীর শহীদ লুৎফুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ওএমএস ডিলার হিসেবে আপনি (শাহআলম) ১০ টাকা কেজির চাল বিক্রি করছেন। ১০নং ওয়ার্ডের ওএমএসের সম্প্রতি ঘোষিত ভোক্তা তালিকায় আপনার স্ত্রী, মেয়ে ও ভাই-বোনসহ নিকট আত্মীয়স্বজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন মর্মে বিভিন্ন মাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে। যা ন্যায়সংগত নয়।’ এ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ওএমএস নীতিমালা অনুযায়ী তার ডিলারশিপ কেন বাতিল করা হবে না তা আগামী দুই কর্মদিবসের মধ্যে জানাতে বলা হয় চিঠিতে।

জানতে চাইলে খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুবীর কুমার নাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযুক্ত মো. শাহ আলম আমাদের তালিকাভুক্ত একজন ওএমএস ডিলার। ওএমএসের তালিকায় নিজের পরিবার-পরিজনের নাম আসায় আমার দেওয়া চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক ইতিমধ্যে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছেন।’

অন্যদিকে জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান বলেন, ‘আমরা ডিলার শাহ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তার কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দিয়েছি। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ডিলার শাহ আলমের বিরুদ্ধে ওএমএস নীতিমালা অনুযায়ী ভিক্ষুক, ভবঘুরে, সাধারণ শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, পরিবহন শ্রমিক, চায়ের দোকানদার এবং হিজড়া সম্প্রদায়ের লোকজনের বদলে নিজের স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের নাম বিশেষ ওএমএস তালিকায় ওঠানোর বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। এরপরই তদন্তে নেমে প্রশাসন তার স্ত্রী-সন্তানসহ ১৩ জনের নাম পায় তালিকায়। তারা হচ্ছে শাহ আলমের স্ত্রী মোছাম্মৎ মমতাজ আলম, মেয়ে আফরোজা, কাতারপ্রবাসী শ্যালকের স্ত্রী মোছাম্মৎ জান্নাতুল ইসলাম, আরেক শ্যালকের স্ত্রী আছমা ইসলাম, বোন শামসুন্নাহার, মালয়েশিয়াপ্রবাসী ভাতিজা নাছির, ভাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিবহন শ্রমিক সমিতির সভাপতি মো. সেলিম, আরেক ভাই মো. আলমগীর, শ্যালক মো. তাজুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলাম, বোনের দেবর আতাউর মিয়া, লুৎফুর মিয়া ও মাহবুব মিয়া। ওয়ার্ড পর্যায়ে কাউন্সিলরের নেতৃত্বে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী একজন এবং একজন করে শিক্ষক, রেড ক্রিসেন্ট, এনজিও, ইমাম, পুরোহিত ও গণমাধ্যম প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি এ তালিকা প্রণয়ন করবে বলে নির্দেশনা থাকলেও আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলম নিজের কর্র্তৃত্বে তালিকা করে তার পরিবারের লোকজনের নাম ঢুকিয়ে দেন। এ নিয়ে ফেইসবুকে লেখালেখিসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে খবর প্রচারিত হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তোলপাড় শুরু হয়। বিভিন্ন মহল থেকে নিন্দার ঝড় উঠে।

নদী রক্ষা সংগঠন নোঙর-এর জেলা সমন্বয়ক ব্যবসায়ী শামীম আহমেদ তার ফেইসবুক ওয়ালে লেখেন, ‘আমি লজ্জিত এমন মানুষ আমাদের ব্যবসায়ী নেতা, রেড ক্রিসেন্টের মতো সংস্থার নেতা, যে আদর্শকে বুকে লালন-পালন করি সে রাজনৈতিক দলের নেতা! আমি লজ্জিত, আমি মর্মাহত...।’

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আলহাজ শাহ আলম বলেন, ‘এ ব্যাপারে স্থানীয় কাউন্সিলর বলতে পারবেন। তারা যাচাই-বাছাই করে তালিকা চূড়ান্ত করেছে। তাছাড়া আমি কোনো কার্ড বণ্টন করিনি। আমি হলাম শুধু ডিলার। ডিলার কোনো কার্ড দিতে পারে না।’

শাহ আলমের বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পৌরসভার ১০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকবুল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের কাউতলী এলাকার ওএমএস তালিকা তৈরি করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলমের বড় ভাই সাঈদুর রহমান। তার কাছ থেকে প্রাপ্ত তালিকাটি আমি যাচাই-বাছাই না করেই পৌরসভায় জমা দিয়েছি। এটি আমার ভুল হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত