সব নিয়ম পায়ে দলে চলেন নজরুল ইসলাম মজুমদার

আপডেট : ১৪ মে ২০২০, ০৪:১০ এএম

বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও নাসা গ্রুপের কর্ণধার শীর্ষস্থানীয় এ ব্যবসায়ী নেতার বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, অনিয়ম ও আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এবং পাচারের অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সীমা লঙ্ঘন করে শত শত কোটি টাকার ঋণও নিয়েছেন নজরুল ইসলাম মজুমদার। সেই ঋণের অপব্যবহারও করেছেন তিনি। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

অভিযোগ আছে, ক্ষমতার বিশেষ প্রভাববলয় ব্যবহার করে জমি দখলও করেছেন নজরুল ইসলাম মজুমদার। তবে তার বিরুদ্ধে ব্যাকিং সেক্টরের পাশাপাশি সমাজ ও প্রশাসনের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে চান না।

জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি অন্তত ১৩টি ব্যাংকে নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপ ও এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ব্যাংক থেকে সীমা অতিরিক্ত ঋণ নিয়েছেন তিনি। রপ্তানির আগে ব্যবহারের জন্য ঋণ নিলেও তা ভিন্ন খাতে নিয়ে গেছেন। এসব ঋণের শত শত কোটি টাকা আবার নগদে উত্তোলন করেছেন। অবৈধ লেনদেনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজের মালিকানাধীন এক্সিম ব্যাংককে ব্যবহার করেছেন তিনি।

দেশের আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা বিএবির এ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নাসা গ্রুপ ও এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান যে পরিমাণ আমদানি করেছে, তার চেয়ে অনেক কম রপ্তানি করেছে। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য রপ্তানি না করে খোলা বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও আমদানি-রপ্তানিতে জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে। গত চার বছরে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের মধ্যে কমপক্ষে ২১০ কোটি টাকা যুক্তরাজ্যসহ একাধিক দেশে পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পাচার করা ওই টাকায় এসব দেশে তিনি তার আত্মীয়স্বজনের নামে বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি কিনেছেন বলে জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নাসা গ্রুপের টেক্সটাইল ইউনিট ৮০১ কোটি ৭৮ লাখ টাকার পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে ২০১৬ সাল ছাড়া অন্য তিন বছরে আমদানির তুলনায় রপ্তানি কম ছিল। চার বছরে আমদানির বিপরীতে ৭১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫, ’১৭ ও ’১৮ সালে আমদানির তুলনায় ১১৫ কোটি টাকা কম রপ্তানি হয়েছে। ২০১৬ সালে আমদানির তুলনায় ২৮ কোটি টাকা বেশি রপ্তানি হয়েছিল।

একইভাবে নাসা গ্রপের গার্মেন্টস ইউনিটের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ ও ’১৭ সালে এ ইউনিটটি ব্যাক টু ব্যাক এলসিতে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করেছে, তার বিপরীতে ১০৫ কোটি টাকার কম রপ্তানি হয়েছে। উল্লিখিত চার বছরে নাসা গ্রুপের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস ইউনিট আমদানির তুলনায় ২২০ কোটি টাকা কম রপ্তানি করেছে। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, রপ্তানিকৃত পণ্যে স্থানীয়ভাবে মূল্যসংযোজন প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। এ হিসাবে ১০০ টাকার পণ্য আমদানি করা হলে রপ্তানি মূল্য অন্তত ১৫০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু নজরুল ইসলাম মজুমদারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি মূল্যের তুলনায় রপ্তানি মূল্য কম হওয়ায় বিষয়টিতে তৈরি পোশাক শিল্পমালিকরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

তার নাসা গ্রুপের বিরুদ্ধে রপ্তানির উদ্দেশ্যে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য খোলা বাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। আমদানির তুলনায় রপ্তানি কম হওয়ায় এমন অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, রপ্তানির উদ্দেশ্যে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। কর ফাঁকির অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যেখানে বন্ড সুবিধা আনা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি কর আইন পরিপন্থী। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জরিমানার পাশাপাশি লাইসেন্স বাতিল হতে পারে বলে জানিয়েছেন কর কর্মকর্তারা।

বন্ড সুবিধা ও আমদানি-রপ্তানিতে জালিয়াতির বাইরে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সীমা অতিক্রম করে ঋণ নিয়েছেন বিএবি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। সরকারি-বেসরকারি অন্তত ১৩টি ব্যাংক ঋণ নিয়েছে তার মালিকানাধীন নাসা গ্রুপ। এর মধ্যে দেশের শরিয়াহভিত্তিক একটি বড় ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা নাসা গ্রুপ।

শরিয়াহভিত্তিক ওই ব্যাংকটির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, টেক্সটাইল ইউনিটে ২০১৫ সালে ঋণসীমা ছিল ১৪৫ কোটি টাকা, কিন্তু নেওয়া হয়েছে ৩৫৩ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ২৮ কোটি টাকা সীমা অতিক্রম করে ঋণ নেওয়া হয় ১৭৮ কোটি টাকা। শুধু টেক্সটাইল নয়, অনুমোদিত সীমা ভেঙে নাসা গ্রুপের গার্মেন্টস ইউনিটও ঋণের ক্ষেত্রে একই ধরনের অনিয়ম করেছে। গার্মেন্টস ইউনিট ২০১৫ ও ’১৬ সালে ওই ব্যাংকটির বেঁধে দেওয়া ঋণসীমার মধ্যে থাকলেও ’১৭ ও ’১৮ সালে সীমার অতিরিক্ত ঋণ নিয়েছে।

২০১৭ সালে নাসা গ্রুপের গার্মেন্টস ইউনিটের ঋণসীমা ছিল ৪১০ কোটি টাকা। কিন্তু ঋণ নিয়েছে ৫২৯ কোটি টাকা। এতে সীমার চেয়ে ১১৯ কোটি টাকা বেশি নিয়েছে। ২০১৮ সালে ঋণসীমা ৪১০ কোটি টাকা থাকলেও গার্মেন্টস ইউনিটটি ঋণ নিয়েছে ৪৬৮ কোটি টাকা। এখানে সীমার চেয়ে ৫৮ কোটি টাকা বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। গ্রাহকের ব্যবসা বাড়লে ঋণসীমা বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও নাসা গ্রুপ তা নেয়নি।

ব্যাংকটি তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, নাসা গ্রুপ বাই সালাম (স্পেশাল) ঋণের তহবিল ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছে। এক খাতের ঋণ অন্য খাতে ব্যবহারের সুযোগ না থাকলেও নাসা গ্রুপ তা ভঙ্গ করে অন্য খাতে ব্যবহার করেছে।

বাই সালাম হচ্ছে একটি প্রি-শিপমেন্ট ফাইন্যান্স প্রোডাক্ট। রপ্তানির আগে উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু রাখার জন্য ৭ শতাংশ সুদে এ ঋণ বিতরণ করা হয়। চার শর্তে এ ধরনের ঋণ বিতরণ করা যায়। এগুলো হলো (১) মূল রপ্তানি চুক্তি বা ঋণপত্র (এলসি) লিয়েন রাখতে হবে। (২) মূল রপ্তানি চুক্তির প্রকৃত ব্যবহারের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হবে। (৩) ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ৯০ দিন, অর্থাৎ ৩ মাস এবং (৪) প্রত্যাবাসিত রপ্তানি মূল্য দ্বারা দায় সমন্বয় করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, নাসা গ্রুপ কোনো রপ্তানি চুক্তি/ঋণপত্র লিয়েনে রাখেনি। নিয়মানুযায়ী রপ্তানি মনিটরিংও করা হয়নি। এছাড়া প্রভাব খাটিয়ে তিন মাসের পরিবর্তে ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয়েছে ১২ মাস। শুধু তাই নয়, এসব ঋণের মেয়াদ এমনভাবে কৌশলে দায় পরিশোধ করা হয়েছে যা লেনদেনের তারিখ ধরা হয়েছে খেলাপি হয়ে যাওয়ার এক বা দুদিন আগে। এমনকি যখনই নাসা গ্রুপের কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার সময় হয়েছে, তখনই বাই সালাম (স্পেশাল) সৃষ্টি করে সে ঋণকে সমন্বয় করে দেখানো হয়েছে।

বাই সালামের (স্পেশাল) অর্থ চেক, পে-অর্ডার ও নগদ অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে অন্য ব্যাংকেও স্থানান্তর করেছে নাসা গ্রুপ। যার বড় অংশই নজরুল ইসলামের মালিকানাধীন এক্সিম ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়েছে। এসব লেনদেনের বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, গ্রাহক কর্র্তৃক চেক, পে-অর্ডার বা নগদ অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ অন্যান্য ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। এসব অর্থ কোথায় ও কী উদ্দেশ্যে চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়েছে এবং কোন খাতে ব্যবহৃত হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে এটা নিশ্চিত যে, এ ক্ষেত্রে সজ্ঞানে ও সুস্পষ্টভাবে ঋণের তহবিল ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নাসা গ্রুপ ওই ব্যাংক থেকে ২১৫ কোটি টাকারও বেশি অর্থ অন্য ব্যাংকে সরিয়ে নেয়। এর মধ্যে বেশিরভাগ অর্থ এক্সিম ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়। স্থানান্তর করা অর্থের মধ্যে ১১৮ কোটি টাকা নগদ উত্তোলন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইসলামি ধারার ওই ব্যাংক ছাড়াও আরও অন্তত ১০টি ব্যাংকে এলসি খোলে নাসা গ্রুপ। নাসা গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসিতে অতিরিক্ত আমদানি ও নামমাত্র রপ্তানি দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। গ্রাহক কর্র্তৃক সজ্ঞানে ও সুস্পষ্টভাবে এসব ঋণের অর্থ ভিন্ন খাতে ব্যবহার করা হয়েছে, যা গুরুতর আর্থিক অনিয়ম বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত