বাংলাদেশে সংক্রমিত নতুন করোনাভাইরাসের (সার্স সিওভি-২) জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করেছেন চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিএইচআরএফ) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা। অণুজীব বিজ্ঞানী ড. সেঁজুতি সাহার নেতৃত্বে চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ঢাকার গবেষণাগারে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের পুরো কাজ হয়েছে। লন্ডন থেকে গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরের এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ড. সেঁজুতি সাহা।
দেশ রূপান্তর : যে ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্সিং করলেন আপনারা সেটির সঙ্গে অন্য দেশে উন্মোচিত জিনোমের নিশ্চয় মিল আছে...
ড. সেঁজুতি সাহা : আমরা মাত্র একটা ভাইরাস সিকোয়েন্স করেছি। এতে আমরা খুবই গর্বিত। কারণ আমরা বাংলাদেশি সম্পূর্ণভাবে কাজটা করেছি সিকুয়েন্সিংয়ের। এই প্রথম আমরা একটি আরএনএ ভাইরাসকে বাংলাদেশি সিকোয়েন্স করলাম। এটা নিয়ে আমাদের অনেক গর্ব। যে ভাইরাসটা আমরা সিকোয়েন্স করেছি সেটার সঙ্গে আমাদের এখন মনে হচ্ছে ইউরোপে যে ভাইরাসগুলা সার্কুলেট করছে ওটার সঙ্গে অনেক মিল আছে। কিন্তু আমাদের আরও অনেক বেশি অ্যানালাইসিস করতে হবে খুব কনফিডেন্টলি আরও কথা বলার জন্য।
দেশ রূপান্তর : আমরা জেনেছি, ভাইরাসটির অনেকগুলো স্ট্রেইন আছে। কয়টি স্ট্রেইনের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা?
ড. সেঁজুতি সাহা : আসলে এরকম অনেক কথায় চলছে যে এগুলোর অনেক স্ট্রেইন আছে। কেউ বলে তিনটা কেউ বলে পাঁচটা। ব্যাপারগুলো কোনো কিছুই এখনো কনফার্ম না। এ পৃথিবীর বড় বড় ভাইরোলজিস্ট বা সায়েন্টিস্টের সঙ্গে যদি আমরা কথা বলি উনারা কিন্তু বলবেন অনেক টাইপের ভাইরাস আছে। সার্স কভিডও কিন্তু একটা ভাইরাস। কিন্তু যেকোনো ভাইরাসই যখন ছড়ায় অনেক রকম চেঞ্জ আসে তার মধ্যে। ওই চেঞ্জটাকে বলে মিউটেশন। এটাই সাধারণ, কিন্তু প্রত্যেকটা মিউটেশন হওয়ার মানে এটাই না যে সে স্ট্রেইন হয়ে গেছে। চেঞ্জগুলো আসলেই তাকে নতুন স্ট্রেইন বানিয়ে দিচ্ছে কি না, ভয়ংকর হয়ে যাচ্ছে কি না বা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে কি না এটা জানার জন্য আমাদের আরও অনেক কাজ করতে হবে। পৃথিবীতে আরও অনেক কাজ করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : আমাদের এখানে আনুমানিক সক্রিয় কয়টি স্ট্রেইন?
ড. সেঁজুতি সাহা : আমাদের দেশে আমরা মাত্র একটা ভাইরাসের সিকোয়েন্সিং করেছি। আমাদের মনে হচ্ছে এটা ইউরোপের সঙ্গে মিল আছে। আমরা কোনো নতুন স্ট্রেইন আবিষ্কার করিনি বা পাইনি। আমরা জানতে পেরেছি আপনারা সব স্ট্রেইন একই জিনোম সিকোয়েন্স করবেন। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সেটা সম্পন্ন হলে আপনারা বুঝতে পারবেন এর সব ভাইরাস দুর্বল নয়, সবল। অনেক স্ট্রেইন নেই এই ভাইরাসে। যতদূর জানি চেঞ্জ হচ্ছে, অনেক ধরনের হতে পারে। আমরা অবশ্যই আগামী দুই সপ্তহের মধ্যে সবকিছু সিকোয়েন্স করতে পারব না। কয়েক মাসের মধ্যে চেষ্টা করব। আর শ’খানেক ভাইরাসকে সিকোয়েন্স করে দেখব বাংলাদেশে কত কত রকমের ভাইরাস আছে।
দেশ রূপান্তর : আপনারা বলছেন, টিকার ব্যবহারে এটা কাজে লাগবে। আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও নিশ্চয়ই কাজে লাগবে? ড্রাগ ডেভেলপমেন্টেও তো কাজে লাগতে পারে?
ড. সেঁজুতি সাহা : হ্যাঁ, যে টিকাগুলো এখন তৈরি হচ্ছে এবং ট্রায়ালে আছে যেমন আরএনএ ভ্যাকসিন, ওই টিকাগুলো আমাদের দেশে এসে কাজ করবে কি না তা অবশ্যই আমাদের জানার দরকার। যে জিনোম সিকোয়েন্সিংগুলোর ওপর কাজ করছি ওটার ওপরই নির্ভর করবে। অবশ্যই যখন আমরা নতুন নতুন ড্রাগ ডেভেলপ করব এটার জন্য ভাইরাসের সিকোয়েন্সটা জানা দরকার লংটার্মের জন্য।
দেশ রূপান্তর : সিকোয়েন্সিং দ্বারাই কি আপনারা বুঝতে পারেন যে এটা শক্তিশালী না দুর্বল? নাকি এর শক্তিমত্তা পরীক্ষার জন্য আরও গবেষণার দরকার?
ড. সেঁজুতি সাহা : আমরা মাত্র একটা সিকোয়েন্স করেছি কিন্তু সিকোয়েন্স করেই খুব সহজে বলে দেওয়া যায় না এটা খুব শক্তিশালী না দুর্বল। আমরা কিছু হাইপোথিসিস করতে পারি কিন্তু এ দুর্বলতা বা সিকোয়েন্সিং করার জন্য যেটা বলেছেন আরও অনেক পরীক্ষা দরকার, অনেক গবেষণার দরকার। আমরা আশা রাখছি শুধু আমরাই নই, আমাদের দেশে আরও যত গবেষণার দল আছে, যত ল্যাবরেটরি আছে তারাও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হবেন। আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করব। যত সিকোয়েন্স করতে পারব তত প্রশ্নের উত্তর ভালোভাবে দিতে পারব। আমরা মাত্র একটি ক্রিকেট খেলার প্রথম ওভারে আছি। আমরা মাত্র ভাইরাসটিকে সিকোয়েন্স করেছি কয়েক ঘণ্টা আগে। এখনো আমাদের অনেক অ্যানালাইসিস করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে আমরা কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি।
দেশ রূপান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. সেঁজুতি সাহা : আপনাকেও ধন্যবাদ।,
