চেনারূপে ফিরছে দেশের সবকটি বিমানবন্দর

আপডেট : ১৪ মে ২০২০, ০৪:১৮ এএম

শিগগিরই চেনারূপে ফিরছে দেশের সবকটি বিমানবন্দর। ইতিমধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সরগরম হয়ে উঠেছে। শাহজালালে প্রতিদিনই বাড়ছে ফ্লাইটের সংখ্যা। কর্মব্যস্ততার মধ্যে আছেন কর্মরত কর্মচারীরা। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ফ্লাইট ওঠানামা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরকেও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচলের জন্য সবকটি বিমানবন্দরকে উপযোগী করে তোলা হয়েছে। ঈদের ছুটিতে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচলের ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। চারদিন আগে আনুষ্ঠানিকভাবে বেবিচক একটি সার্কুলার জারি করেছে। ওই সার্কুলারে ফ্লাইট চলাচলের আগে ও পরে কী করতে হবে সেই নির্দেশনা আছে।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফ্লাইট চলাচলের ব্যাপারে আমাদের প্রস্তুতি আছে। করোনাভাইরাসের প্রভাব কমে যাওয়ার আশায় আছি। আগামী ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সব ধরনের ফ্লাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচলের ব্যাপারে সবকটি এয়ারলাইন্সকে বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা কীভাবে যাত্রীদের হ্যান্ডেল করবে, বুকিং নেবে ইত্যাদি বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফ্লাইট চলাচল শুরু হলেই বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হবে। করোনা পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবসান হওয়ার পরও ফ্লাইট চলাচলে কিছু নতুনত্ব থাকবেই।

 বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঈদকে সামনে রেখে ১৬ এপ্রিলের পর অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচল শুরু করতে সবধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। দেশের সবকটি বিমানবন্দরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। ওইসব বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষও প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দর আগের রূপেই ফেরা শুরু করেছে। সিলেট বিমানবন্দরেও কিছু ফ্লাইট ওঠানামা করছে। শাহ আমানত বিমানন্দরে যেকোনো সময় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল শুরু হবে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সবকটি দেশেই করোনাভাইরাস আঘাত হেনেছে। এই কারণে প্রায় মাসখানেক বিশ্বের সব ফ্লাইট বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু এভিয়েশন খাতে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার কারণে বিভিন্ন দেশ ফ্লাইট চলাচল শুরু করে দেয়। চলতি মাসের প্রথম দিকে বিশ্বের আটটি শহরে সীমিত আকারে ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দেয় এমিরেটস এয়ারলাইনস। এই সংস্থাটি কয়েকদিন ধরে ফ্রাঙ্কফুর্ট, জাকার্তা,  জোহানেসবার্গ, লাগোস, লন্ডন, ম্যানিলা ও তিউনিসে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তারা সামাজিক দূরত্ব ও যাত্রীদের সবধরনের সুরক্ষা দিয়েই ফ্লাইট চালাচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার কারণে এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলো মারাত্মক লসের দিকে আছে। বেবিচক কর্তৃপক্ষ চলতি মাসের ৮ তারিখ থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চলাচল করার অনুমতি দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সরকার ছুটি বাড়ানোর কারণে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখে। তবে চারদিন আগে বেবিচক একটি সার্কুলার জারি করে আমাদের জানিয়েছে-১৬ এপ্রিলের পর সীমিত আকারে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেই হিসেবে সবকটি এয়ারলাইনস প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। ফ্লাইট চালু হলেও কঠোর বিধিবিধান মানতে হবে যাত্রী, বিমান সংস্থাসহ সবাইকে। ফ্লাইটে ওঠার আগে কোনো যাত্রীর গায়ের তাপমাত্রা ৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা এর বেশি থাকলে তার যাত্রা বাতিল হয়ে যাবে। বেবিচক থেকে ৩৫টি দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 বেবিচকের সার্কুলারে বলা হয়েছে বিমানবন্দরের টার্মিনালে একাধিক ফ্লাইটের যাত্রীরা একসঙ্গে থাকতে পারবেন না। প্রতিটি ফ্লাইটে ওঠার আগে যাত্রীদের বোর্ডিং পাস নেওয়ার পর নির্ধারিত এলাকার মধ্যেই থাকতে হবে। সবাইকে মাস্ক ও গ্লাভস পরতে হবে। বিমানবন্দরে আসার আগে ও পরে মাস্ক ও গ্লাভস পরতে হবে। টার্মিনালে প্রবেশের পর যাত্রীরা যে বিমানে করে যাবেন, তারাই নতুন গ্লাভস ও মাস্ক দেবে। এসব পরে ফ্লাইটে ওঠার সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে। বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করা হবে। প্রত্যেক যাত্রীকে স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ফরম পূরণ করতে দেওয়া হবে। ফরমে যাত্রীর নাম, বয়স, লিঙ্গ, জন্মতারিখ, বর্তমান ঠিকানা, এয়ারলাইনসের নাম, ফ্লাইট নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, শরীরের তাপমাত্রা, মোবাইল ও ই-মেইল নম্বর পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে ফরমে তিনটি প্রশ্নে হ্যাঁ অথবা না টিক দিয়ে উত্তর দিতে হবে। এক নম্বর প্রশ্নে থাকবে, আপনার (যাত্রী) কি জ্বর বা কফ হচ্ছে? দ্বিতীয় প্রশ্নে থাকবে, আপনার কি জ্বর এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে? এবং তৃতীয় প্রশ্নে থাকবে, গত ১৪ দিনে কভিড-১৯ বা এই রোগের  কোনো উপসর্গ থাকার কারণে আপনাকে কোনো বিমানবন্দরে বোর্ডিং থেকে  ফেরত পাঠানো হয়েছে কি না। তিনটি প্রশ্নের উত্তর মিললেই যাত্রীকে নির্দিষ্ট স্থানে যেতে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে- দেড় ঘণ্টার নিচে কোনো ফ্লাইটে পানি ছাড়া খাবার দেওয়া যাবে না। তবে ডায়াবেটিসের রোগীদের সীমিত আকারে পানি ও জুস দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বড় উড়োজাহাজের ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ এবং ছোট উড়োজাহাজের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ যাত্রীর প্রতিটি ফ্লাইট থাকবে। এর বেশি যাত্রী নেওয়া যাবে না। সার্জিক্যাল মাস্ক অথবা মানসম্মত মাস্ক, ক্যাপ প্রতিটি ফ্লাইটের ক্রুদের পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেবিন ক্রুদের এন-৯৫ মাস্ক, চশমা, রাবারের হ্যান্ড গ্লাভস ও ফেসিয়াল মাস্ক পরতে হবে। হ্যান্ড গ্লাভস ও মাস্ক প্রতি ৪ ঘণ্টা পর পর বদলাতে হবে। তাদের ককপিটে প্রবেশ যতটা সম্ভব কমিয়ে ইন্টারকমে যোগাযোগ করতে হবে। যাত্রাবিরতিতে কেবিন ক্রুরা  কোনো হোটেলে অবস্থান করলে ওই হোটেলের রুমেই খাবার খেতে হবে। প্রয়োজনে ওই হোটেলের ভেতরের রেস্টুরেন্টে খাবার খাবেন। হোটেলের বাইরে যেতে পারবেন না।

শাহজালালের এক কর্মকর্তা বলেন, লকডাউনের মাঝেও গতকাল বুধবার  বেশ কটি ফ্লাইট ওঠানামা করেছে শাহজালালে। স্পেশাল ফ্লাইট ছাড়াও কার্গো ফ্লাইট চালু করেছে এমিরেটস এয়ারলাইনস। আগামী সপ্তাহে আরও একটি এয়ারলাইনস কার্গো চালু করতে যাচ্ছে। বেবিচক জনসংযোগ কর্মকর্তা  সোহেল কামরুজ্জামান জানিয়েছেন বুধবার কুয়েত, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে প্রায় নয়শ যাত্রী আসা-যাওয়া করেছেন। বিলম্বিত ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন কুয়েতের বন্দি শিবিরে আটকেপড়া তিন শতাধিক যাত্রী।  বেলা ১১টায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি স্পেশাল ফ্লাইটে ঢাকায় বসবাসরত ভারতের ১৬৯ নাগরিক শ্রীনগরের উদ্দেশে বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। তারা সবাই কাশ্মীরি। এদের মাঝে রয়েছেন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবী।  বেলা ১২টায় মালিন্দো এয়ারের ফ্লাইটে ৭০ জন মালয়েশিয়ান নাগরিক ঢাকা ত্যাগ করেন। তাদের বেশিরভাগই ব্যবসায়ী। বিকালে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ১৫ জন সিঙ্গাপুরের নাগরিক দেশে ফিরে গেছেন। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন ঢাকায় বসবাসরত ব্যবসায়ী। মালয়েশিয়া থেকে ফিরেছেন ১৭৮ জন বাংলাদেশি। তারা আসেন মালিন্দোর স্পেশাল ফ্লাইটে। এরপরই আসেন সিঙ্গাপুর থেকে আরও ২২০ জন বাংলাদেশি। ওই ফ্লাইটেই দেশে ফেরেন খ্যাতনামা গায়ক এন্ড্রু কিশোর। বাংলাদেশিরা করোনার ভয়ে সিঙ্গাপুর ছেড়ে ঘরে ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন কজন যাত্রী। বিকালে আসেন চেন্নাইয়ে আটকেপড়া ১৬৪ জন যাত্রী। ইউএস বাংলার একটি স্পেশাল ফ্লাইটে তাদের আনা হয়। তারা সেখানে চিকিৎসা করতে গিয়ে আটকা পড়েন।

এছাড়া মঙ্গলবার রাতে দেশে ফিরে আসেন কুয়েতের বন্দি শিবিরে আটক তিন শতাধিক বাংলাদেশি। জাজিরা ও কুয়েত এয়ারের দুটো পৃথক ফ্লাইটে তারা দেশে ফেরেন। প্রায় দেড় মাস সেখানকার ক্যাম্পে আটকেপড়া অবস্থায় তারা দেশে ফেরার জন্য সেখানে বিক্ষোভ করেন। এছাড়া অনাহারে অর্ধাহারে মারা গেছেন দুজন বাংলাদেশি। বাংলাদেশ সরকােেরর বিশেষ উদ্যোগে তাদের ফিরিয়ে আনা হয়। এ বিষয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে- বিদেশ থেকে আগত যাত্রীরা সবাই ছিলেন সুস্থ। তারা সবাই স্বাস্থ্য সনদ নিয়েই ফ্লাইটে ওঠেন এবং দেহের তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিক। সেজন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের পরিবর্তে তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, করোনা তা-বের দরুন টানা একমাস বিরতির পর আবারও কার্গো ফ্লাইট চালু করেছে এমিরেটস। গত মঙ্গলবার রাত থেকে পুনরায় ঢাকায় নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে এমিরেটস এয়ারলাইনসের পণ্য পরিবহন শাখা-এমিরেটস স্কাইকার্গো। ফ্লাইটগুলো সপ্তাহে দু’দিন মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার চলাচল করবে এবং দেশীয় শিল্পপণ্য রপ্তানিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যাত্রীবাহী  বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর মডেলের উড়োজাহাজের বেলিহোল্ড এবং যাত্রী আসনে পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে। এ সম্পর্কে বাংলাদেশে এমিরেটসের কার্গো ম্যানেজার শেখ ইদ্রিস আলী বলেন, বাংলাদেশের বাণিজ্য উন্নয়নে এমিরেটস সর্বদাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য সহযোগী  দেশগুলোর সঙ্গে সাপ্লাই চেইন পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছি আমরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত