ক্রিকেট বিজ্ঞানীর জন্মদিনে মৃত্যুকথা

আপডেট : ১৪ মে ২০২০, ০৭:৩৭ এএম

কী দুর্ভাগ্য বলুন তোযাকে ক্রিকেট বিজ্ঞানী বলা হয়, সেই বব উলমারের জন্মদিনের লেখা শুরু করতে হচ্ছে মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে?

দিনটা ১৮ মার্চ ২০০৭। আগের দিন পোর্ট অব স্পেনে অবিস্মরণীয় জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। গ্রেগ চ্যাপেলের তারাভরা ভারতীয় দলকে হারিয়ে তখন মিডিয়া আকর্ষণের কেন্দ্রে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজারা। এমন একটা খবরের জন্য প্রস্তুত ছিল না ক্রিকেট বিশ্ব অথচ শুনতে হয়েছিল সেই রহস্যময় মৃত্যুর খবরটা।

জ্যামাইকার পেগাসাস হোটেলের রুম নম্বর ৩৭৪। বার্নিস রবিনসনের ঘটনাগুলো স্পষ্ট মনে আছে। সকালের রুম পরিষ্কারের জন্য তাকেই ১২ তলায় পাঠানো হয়েছিল। সকাল ৯.৩০। বার্নিস দরজায় নক করলেন। প্রথমবার সাড়া নেই। দ্বিতীয়বারও না। তৃতীয় বার সাড়া না পেয়ে কি-কার্ড দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে গেলেন। তখনো উলমার ঘুমাচ্ছিলেন। নাক ডাকার শব্দও পেলেন বার্নিস। বিরক্ত না করে চুপিসারে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

১২ তলার আরও তিনটা রুম পরিষ্কার করে ১০.৫০-এ আবার ৩৭৪ নম্বরের সামনে এলেন বার্নিস। এবারও দরজা নাড়া দিয়ে সাড়া পেলেন না। ভেতরে ঢুকে হালকা সূর্যালোকে দেখলেন বিছানায় কেউ নেই। বালিশের কাছে রক্তের দাগ। চেয়ার উল্টানো। আর রুদ্ধ ঘরের বাতাস বমির কটু গন্ধে ভরা। কিছু একটা ভেবে বাথরুমে খুঁজতে গেলেন বার্নিস। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পেলেন। আসলে বন্ধ ছিল না। ভেতরে পড়ে ছিল উলমারের নিথর দেহ। বাথরুমের দরজার মুখে এমনভাবে পড়ে ছিল যে, মনে হচ্ছিল ভেতর থেকে বন্ধ। একটু জোরে ধাক্কার দেওয়ার পরে বার্নিস যা দেখলেন তা দুঃস্বপ্নের অতীত। চিৎকার করে বললেন, ‘স্যার, আপনি ঠিক আছেন তো?’ বাথরুমেও রক্ত ছিল। আর বমিতে ছিল অ্যালকোহলের গন্ধ। সন্ত্রস্ত বার্নিস হোটেলের বিপদ ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। পরের ঘটনা সবার জানা। আইসিসি বিশ্বকাপের দায়িত্বে থাকা ডা. অ্যাশার কুপার ও নভেলেট রবিনসন উলমারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। দ্রুত তাকে কিংস্টন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে নেওয়া হলো। দুপুর ১২.১৪ মিনিটে অনুষ্ঠানিকভাবে সেই সময়ের পাকিস্তান দলের কোচ বব উলমারকে মৃত ঘোষণা করলেন ডা. কপার এবং ডা. সিমন ফ্রেন্স।

পরে থানা-পুলিশ-তদন্ত অনেক হয়েছিল। উলমারের মৃত্যু রহস্য আর উদঘাটিত হয়নি। ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে আছে আজও। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডও যে রহস্য ভেদ করতে পারেনি। জ্যামাইকা পুলিশের তৎকালীন সহকারী কমিশনার মার্ক শিল্ডস বলেছিলেন, ‘বলপ্রয়োগ কিংবা খাদ্যে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বব উলমারের।’ নাকে রক্ত আর ঘাড়ে আঘাতের চিহ্ন দেখে মার্ক শিল্ডস প্রাথমিকভাবে এমন অনুমান করেছিলেন। পাকিস্তান দলের এক কোচিং স্টাফের মুখে আঁচড়ের দাগ ছিল। ম্যানেজার তালাত আলী নাম ভারিয়ে হোটেল রিজার্ভেশন নিয়েছিলেন। এসব নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হলেও জ্যামাইকার ময়নাতদন্তকারী দল পরে জানিয়েছিল, উলমারের ঘাড়ে আঘাতের কোনো চিহ্ন ছিল না। অ্যাজমার রোগী ছিলেন তিনি। মৃত্যু হয়েছে প্রবল কাশিতে দমবন্ধ হয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার নামি ক্রীড়া সাংবাদিক নিল ম্যানথ্রপের বন্ধু ছিলেন উলমার। তিনিও পরে বলেছিলেন, থাই ফুড খাওয়ার কারণে অ্যাজমা বেড়ে শ^াসকষ্টে সম্ভবত তার মৃত্যু হয়েছিল।

উইন্ডিজে এমন পরিণতি না হলে ‘ল্যাপটপ’ কোচ উলমার কি এখনো বেঁচে থাকতেন? ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ভারতের কানপুরে জন্ম উলমারের। আজ তার ৭২তম জন্মদিন। বেঁচে থাকলেও হয়তো থাকতে পারতেন। না থাকলেও ৫৯ বছরে জ্যামাইকাতে উলমারের রহস্য মৃত্যু কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। কোচ হিসেবে তখন তিনি লব্ধ প্রতিষ্ঠিত। হান্সি ক্রোনিয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে দক্ষিণ আফ্রিকাকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। তার আগে ওয়ারউইকশায়ার কাউন্টির কোচ হিসেবে নাম করেছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কোনো ম্যাচ হেরে গেলে ড্রেসিংরুমেই কাউন্টির ছেলেদের সান্ত্বনা দিতে উলমার বলতেন, ‘মনে রেখো তোমরা শুধু ম্যাচই হেরেছ। তোমাদের কেউ মারা যায়নি।’ উলমারের বাকচাতুর্যের প্রশংসা করেছেন অ্যালান ডোনাল্ডও, ‘আমরা তাকে বিজ্ঞানী বলতাম। সে আসলে একজন ক্রিকেট বিজ্ঞানীই। ইনোভেটরও বলতে পারেন।’

উলমার প্রায় একার পরিকল্পনায় নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে নাম্বার ওয়ান টেস্ট এবং ওয়ানডে দলে পরিণত করেছিলেন। সেই দলের ক্রিকেটারদের ওপর উলমারের অতুলনীয় প্রভাব ছিল। পরিকল্পনা থেকে অনুশীলনে নব-নব উদ্ভাবনা সব একা হাতে করেছেন। নিজের কোচিংয়ের প্রতি অগাধ আস্থাও ছিল। ক্রিকেটারদের ভুল করার সুযোগ দিতেন। ডোনাল্ড একবার বলেছিলেন, ‘আমাদের ভুল করায় মানা ছিল না। তিনি বলতেন, জেতার জন্য অনুশীলন করছ, তবে ভুল করতে করতে পরাজয় থেকে না শিখলে ক্রিকেটকে বুঝবে কী করে?’

আধুনিক ক্রিকেটের সেরা মস্তিষ্ক চাইলে কি বড় ক্রিকেটারও হতে পারতেন? ইংল্যান্ডের হয়ে ১৯টি টেস্ট আর ৬টি ওয়ানডে খেলেছেন। টেস্টে তিনটি সেঞ্চুরি আছে। তিনটিই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অ্যাশেজে। হয়তো বড় কিছু নয়। বড় ক্রিকেটার হওয়া তার ভাগ্যে ছিল না। হতে চেয়েছিলেন ক্রিকেট গুরু। তাত্ত্বিক। গবেষক। কোচ বব উলমার সবকিছু হয়ে দেখিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত