আত্মশুদ্ধি বিষয়ক একটি হাদিসের মর্মার্থ হলো, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, দুর্ভাগ্যের চিহ্ন চারটি। শুষ্ক চোখ তথা যে চোখ আল্লাহর ভয়ে ও মুমিনদের কষ্ট দেখে কাঁদে না, কঠিন অন্তর, উচ্চাভিলাষ, আর দুর্দশাগ্রস্ত হয়েও দুনিয়াকে ভালোবাসা। এ ছাড়া হাদিসের বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে, মানুষের ভেতরে এসব স্বভাবের জন্ম নেয় একগুঁয়েমিপনা ও অহংকারের জন্য। আর এগুলোর পেছনে সব সময় সক্রিয় থাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা। সে বলতে থাকে, তোমার তো আছে এতসব যোগ্যতা, এই এই শক্তি আর এত এত সম্পদ। তাই অন্যের কথা শুনে তুমি নিজেকে ছোট করতে যাবে কেন ইত্যাদি ইত্যাদি।
মানুষকে শয়তানের এসব কুমন্ত্রণার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য যেসব ইবাদত-বন্দেগির বিধান দেওয়া হয়েছে, এর অন্যতম হলো- ইতিকাফ। রমজানের শেষ ১০ দিন পার্থিব সব কাজকর্ম থেকে মুক্ত থেকে মসজিদে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে অতিবাহিত করা। এটা দুনিয়ার প্রতি আসক্তি কমাতে ও আখেরাতের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে অত্যন্ত সহায়ক। এই ইতিকাফ সুন্নতে মোয়াক্কাদায়ে কিফায়া।
শুধু মসজিদে অবস্থান এবং ফরজ নামাজগুলো যা প্রতিদিনের স্বাভাবিক আমল তা করলেও ইতিকাফের হুকুম পালন হয়ে যায়। কিন্তু উত্তম হলো ন্যূনতম সময় বিশ্রাম ও নিদ্রায় কাটিয়ে বাকি পুরো সময় নফল নামাজ, কোরআনে কারিম তেলাওয়াত ও জিকির-তাসবিহ পাঠে কাটানোর চেষ্টা করা।
সাময়িক বৈরাগ্যের অনুশীলন ইতিকাফের প্রথম তাৎপর্য। দ্বিতীয়ত, রমজানের প্রথম দিন থেকে রোজা পালন করতে করতে যখন ২০টি দিন হয়ে যায়, তখন রোজা রাখা অনেকটা অভ্যাসে পরিণত হয়। আর কোনো আমল যখন অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার প্রভাব কমতে থাকে, সেদিকে লক্ষ থাকে কম। তাই রমজানের সিয়াম সাধনা যেন অভ্যাসগত কাজের অন্তর্ভুক্ত না হয়; বরং বিশেষ গুরুত্ব ও মনোযোগের বিষয় থাকে, সে জন্য সিয়াম সাধনার মাসের শেষ দিনগুলো একান্তভাবে সিয়াম ও সালাতের জন্য বরাদ্দ রাখার একটি নিয়ম এই ইতিকাফ।
ইতিকাফের তাৎপর্য আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। তা এই যে, পানাহার, কামাচার ও পাপাচার থেকে নিজেকে বিরত রাখার ধারাবাহিকতা বান্দার মধ্যে সৃষ্টি করে আল্লাহ প্রেমের বিশেষ প্রেরণা। আল্লাহতায়ালার নির্দেশ মোতাবেক নিজের দৈহিক চাহিদা ও আচরণ সংযত রাখার ফলে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনে বান্দা অনেক উন্নতি লাভ করে। নশ্বর পৃথিবীর আকর্ষণ দুর্বল হতে থাকে, পরজগতের চিন্তা প্রবল হতে থাকে, আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের জন্য তার মধ্যে ব্যাকুলতা বাড়তে থাকে। তারই অভিব্যক্তি ঘটানো হয় সংসার ও বৈষয়িক জীবন থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর ঘরে নিরবচ্ছিন্ন অবস্থানের মধ্য দিয়ে।
ইতিকাফরত অবস্থায় বান্দা নিজেকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য দুনিয়ার অন্য সব বিষয় থেকে আলাদা করে নেয়। ঐকান্তিকভাবে মশগুল হয়ে পড়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিরন্তর সাধনায়। হাদিসে ইতিকাফ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা এসেছে। আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘ইন্তেকাল পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন, এরপর তার স্ত্রীরা ইতিকাফ করেছেন।’ -সহিহ বোখারি: ১৮৬৮
হজরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, ‘রাসুল (সা.) প্রতি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি পরলোকগত হন, সে বছর ২০ দিন ইতিকাফে কাটান।’ -সহিহ বোখারি: ১৯০৩
ইতিকাফের রুকন হলো- মসজিদে অবস্থান করা। ইতিকাফের জন্য রোজা শর্ত। মুসলমান হওয়া শর্ত। ইতিকাফকারীকে বোধশক্তিসম্পন্ন হতে হবে, কেননা নির্বোধ ব্যক্তির কাজের কোনো উদ্দেশ্য থাকে না, আর উদ্দেশ্য ছাড়া কাজ শুদ্ধ হতে পারে না। ভালোমন্দ পার্থক্য করার জ্ঞান থাকতে হবে, কেননা কম বয়সী, যে ভালোমন্দের পার্থক্য করতে পারে না, তার নিয়তও শুদ্ধ হয় না। ইতিকাফের নিয়ত করতে হবে, কেননা মসজিদে অবস্থান হয়তো ইতিকাফের নিয়তে হবে অথবা অন্য কোনো নিয়তে। আর এ দু’টির মধ্যে পার্থক্য করার জন্য নিয়ত প্রয়োজন। বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী সবচেয়ে কম সময়ের ওয়াজিব ইতিকাফ হলো এক দিন-এক রাত কিংবা এর বেশিরভাগ সময়। তবে নফল ইতিকাফ অল্প সময়ের জন্য, এমনকি এক মুহূর্তের জন্যও হতে পারে বলে ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) মত দিয়েছেন। সর্বোচ্চ কত দিনের জন্য ইতিকাফ করা যায় এ ব্যাপারে আলেমদের মতামত হলো, এর নির্ধারিত কোনো সীমারেখা নেই।
ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো- বায়তুল্লাহ শরিফ। বায়তুল্লাহ শরিফের পর মসজিদে নববী। এরপর বায়তুল মোকাদ্দাস। তারপর জুমা আদায় করা হয় এমন মসজিদ। এরপর মহল্লার যে মসজিদে নামাজির সংখ্যা বেশি হয়। এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইতিকাফকারী গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে এবং তার জন্য আমল করা ছাড়াই অন্য নেককারদের মতো নেকি বরাদ্দ করা হয়।’ অন্য এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করবে, তাকে দুটি হজ ও দুটি ওমরা পালন করার সওয়াব দান করা হবে।’
কাজেই এটি সওয়াব হাসিলের মহা সুযোগ। পুরুষের মতো নারীরাও ইতিকাফ করতে পারবেন। এ জন্য উল্লিখিত শর্তাবলির সঙ্গে স্বামীর অনুমতির বিষয়টি যোগ করতে হবে। আর নারীরা ঘরের কোণে আলাদা কোনো বিশেষ স্থানে ইতিকাফ করবেন।
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক
