করোনাভাইরাসের সংক্রমণের প্রভাবে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থসংকটে পড়েছে দেশের সিমেন্টশিল্প খাত। এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলোতে তারল্য প্রবাহ বাড়াতে অগ্রিম আয়কর বাবদ কেটে রাখা অর্থ ফেরত চেয়েছে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)। গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে এক চিঠিতে অগ্রিম আয়কর বাবদ কেটে রাখা পুঞ্জীভূত অর্থ ফেরতের অনুরোধ জানিয়েছে বিসিএমএর সভাপতি ও এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরির (ক্রাউন সিমেন্ট) ভাইস চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবির।
সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল আমদানি, সিমেন্ট বিক্রি ও রপ্তানির সময় উৎসে কর হিসেবে অগ্রিম কর কেটে রাখা হয়, যার পরিমাণ প্রায় ৯ শতাংশ। আইন অনুসারে কেটে রাখা এই কর কোম্পানির মোট প্রযোজ্য করের সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য। কোনো অর্থবছরে একটি কোম্পানির পরিশোধিত অগ্রিম আয়করের পরিমাণ কোম্পানির প্রযোজ্য আয়করের চেয়ে বেশি হলে বাড়তি টাকা ফেরত দেওয়ার কথা। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও ওই অর্থের বড় অংশই ফেরত দেওয়া হয় না। অগ্রিম আয়কর সমন্বয়ের পর এনবিআরের কাছে কোম্পানিগুলোর পুঞ্জীভূত পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। করোনাভাইরাস মহামারীতে সিমেন্টশিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়ায় বিশেষ বিবেচনায় অতি দ্রুত এই টাকা ফেরত দেওয়া বা ছাড় করার অনুরোধ জানিয়েছে বিসিএমএ।
গতকাল বিসিএমএ এনবিআরের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নির্মাণশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আর নির্মাণশিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হলো সিমেন্ট। দেশে জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং অবকাঠামো খাতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করে সিমেন্ট খাতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়ে আসছিল। কিন্তু চাহিদার তুলনায় অতি উৎপাদনের কারণে শিল্পটি বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে।
দেশে সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা হচ্ছে ৭ কোটি ৮০ লাখ টন। বিপরীতে চাহিদা মাত্র ৩ কোটি ৩০ লাখ টন। ফলে কঠিন প্রতিযোগিতায় কয়েক বছর ধরে সিমেন্টের দাম ক্রমাগত কমেছে। অন্যদিকে, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নে কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। এ ছাড়া গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল, শ্রম ব্যয় ও পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে আদায়যোগ্য অর্থের পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় তার বিপরীতে চলতি মূলধনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। তাতে কোম্পানিগুলোর ঋণের পরিমাণ ও সুদজনিত চাপও বেড়ে গেছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সিমেন্টের শতভাগ কাঁচামালই আমদানিনির্ভর। বর্তমানে আমদানিতে অগ্রিম আয়কর হিসেবে ৩ শতাংশ উৎসে কর আদায় হচ্ছে। আমদানি পর্যায়ে কাঁচামালের মূল্যায়িত দাম সাধারণত ২৫ শতাংশ বেশি হয়ে থাকে। তাই কার্যকর অগ্রিম আয়কর হয় প্রায় ৪ শতাংশ। অন্যদিকে সব পণ্য ও সেবার বিপরীতে ৫ শতাংশের বেশি হারে উৎসে কর আদায় করা হচ্ছে। সিমেন্ট বিক্রি ও রপ্তানির সময় উৎসে কর বিবেচনায় নিলে অগ্রিম আয়করের কার্যকর হার দাঁড়ায় প্রায় ৯ শতাংশ। অধিকন্তু বর্তমান অর্থবছর থেকে আমদানি পর্যায়ে ৩ শতাংশ অগ্রিম আয়কর ন্যূনতম কর দায় হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এমন অবস্থায় প্রায় ৯ শতাংশ অগ্রিম আয়কর মুনাফার সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে না। এই অগ্রিম আয়কর সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক হওয়ায় এবং কোম্পানিগুলো কর পূর্ববর্তী স্বল্প মুনাফার কারণে এ বছর সিমেন্ট কোম্পানিকে লোকসান দিতে হবে। আগামী বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
চিঠিতে বিসিএমএ সভাপতি লিখেছেন, সর্বশেষ করোনাভাইরাস সিমেন্টশিল্পে বড় আঘাত হেনেছে। ২০১৯ সালের এপ্রিলের তুলনায় চলতি এপ্রিলে দেশে সিমেন্ট বিক্রি ৪৬ শতাংশ কমে গেছে। আবার উৎপাদন প্রায় বন্ধ থাকলেও শ্রমঘন সিমেন্টশিল্প শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত দিয়ে যাচ্ছে। এতে মাসে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, যার পুরোটাই লোকসানের হিসাবে চলে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক সক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
বিসিএমএর সভাপতি জানান, সম্মিলিতভাবে সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর ৭৫০ কোটি টাকার বেশি অসমন্বিত অগ্রিম আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা রয়েছে। যদি ১০ শতাংশ হারে সুদ বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে জমা থাকা ওই টাকার বিপরীতে সিমেন্ট খাত শুধু সুদ হিসেবে বছরে ৭৫ কোটি টাকা হারাচ্ছে। আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ১৪৬ ধারা অনুযায়ী, করদাতার পরিশোধিত টাকা পরিশোধযোগ্য করের চেয়ে বেশি হলে তা ফেরত পাওয়ার যোগ্য। ওই টাকা ফেরত দিতে দেরি হলে সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত না তা ফেরত দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে সুদ প্রদান করবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, ফেরতযোগ্য এই টাকা বছরের পর বছর পড়ে থাকে এবং বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও তা নগদে ফেরত পাওয়া যায় না।
এ বাস্তবতায় পুঞ্জীভূত অগ্রিম আয়করের টাকা দ্রুত ফেরত বা ছাড় করার অনুরোধ জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, এর ফলে অর্থসংকটে থাকা কোম্পানিগুলো কিছু নগদ অর্থের সরবরাহ পাবে এবং এই কঠিন পরিস্থিতিতে অর্থায়নের খরচ কিছুটা কমিয়ে আনতে পারবে। তাতে সিমেন্ট কোম্পানিগুলোতে কিছুটা হলেও প্রাণসঞ্চার হবে।
