আমাদের কাঁদিয়ে নীরবে চলে গেলেন

আপডেট : ১৬ মে ২০২০, ০১:২৫ এএম

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ভুবনে শূন্যতা তৈরি হয়েছে যা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। আমরা অনেকেই তাকে বলি জাতির বিবেক, আমাদের বাতিঘর। স্কুলছাত্র থাকাকালীন তিনি ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। পরবর্তীকালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনে সংস্কৃতিকর্মীদের অন্যতম অভিভাবক ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রের যেকোনো সংকটে আমরা তাকে সামনে রেখে এগিয়েছি। আনিসুজ্জামান, কবির চৌধুরীর মতো মানুষদের দেখে আমরা সাহসী হয়েছি। আনিসুজ্জামান স্যারের মতো এমন বিচক্ষণ, ধীসম্পন্ন মানুষ আমরা কমই দেখেছি। সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে তার যে অবদান সেটা তো দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি লাভ করেছে। তার গবেষণাকর্ম অনেক মানুষকে নতুন করে পথ দেখিয়েছে। এ দেশের সুস্থ সামাজিক বিকাশে তার অবদান আমরা কোনোদিন ভুলতে পারব না। যখন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুবিরোধী চক্রান্ত চলেছে, তখন সাহসের সঙ্গে তিনি তার মোকাবিলা করেছেন। এর আগে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রবিরোধিতার সময়ে সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে গণমানুষের কাছে তুলে ধরেছিলেন আনিসুজ্জামান।

আমাদের দেশ যখন সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদী চিন্তার মধ্যে ক্রমেই নিমজ্জিত হচ্ছে তখন তিনি অসাম্প্রদায়িকতার পতাকা তুলে ধরেছেন। আমরা সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদবিরোধী যত কর্মসূচি করেছি, সব আয়োজনের শীর্ষে ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি থাকলে আমরা নিরাপদ বোধ করি যে আমাদের মাথার ওপর একটা ছাতা আছে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যখন ’৭১-এর ঘাতকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন, গণআদালত করলেন সেখানেও অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় তিনি আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। যার জন্য তাকে অনেক সাহসের পরিচয় দিতে হয়েছে। অনেক হুমকি পেয়েছেন, কিন্তু পিছপা হননি। আদর্শে অবিচল থেকেছেন।

আমি প্রায়ই স্যারকে বলতাম, আপনি এত অনুষ্ঠানে কেন যান? তিনি বলতেন, ‘কী করব? আমি তো লোকজনকে না করতে পারি না, মানা করতে পারি না। অনেকবার মানা করেছি। তখন তারা বলে, স্যার আপনি কোনদিন থাকবেন সেদিনই অনুষ্ঠান করব।’

তবে আমার কাছে খারাপ লাগে এজন্য যে, আমরা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের অনেক সময় নষ্ট করেছি। তাকে অনেক অনুষ্ঠানে যুক্ত করেছি, তিনি আমাদের ভালোবেসে সেগুলোতে এসেছেন। স্যার সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে পছন্দ করতেন বা আমাদের ভালোবেসে এসব নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন। কিন্তু আমার মনে হয়, এসব অনুষ্ঠানে যদি তিনি না আসতেন তবে আনিসুজ্জামানের কাছ থেকে আমরা আরও অনেক গবেষণা, নতুন চিন্তা, নতুন সাহিত্য পেতাম। অনেক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ পেতাম। যেমনটা আমরা দেখি পশ্চিমবঙ্গের শঙ্খ ঘোষকে। অনেকটা আত্মগোপন করে থাকেন শঙ্খ ঘোষ, নিভৃতচারী হওয়াতে তিনি অনেক ভাবনার সময় পান এবং সাহিত্য রচনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। আনিসুজ্জামান স্যারের অনেক সময় আমরা নষ্ট করেছি নানা অনুষ্ঠানে তাকে যুক্ত করে। স্যারও যদি সবার ডাকে এত সাড়া না দিয়ে নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তবে আমরা আরও সমৃদ্ধ কিছু পেতাম। স্যারের মধ্যে সংযমটা ছিল অসাধারণ। স্যারের লেখাতে কোনো মেদ নেই। তিনি অল্পতেই মূল কথাটা বলতে পারেন। স্যার বক্তৃতার মধ্যেও অনেক সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করতেন, কিন্তু অল্প কথাতেই তিনি মূল কথাটা বলে দিতে পারতেন।

স্যারের মধ্যে রসবোধও ছিল প্রবল। আমার মনে আছে, ফেরদৌসী মজুমদারের একটা বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে স্যার বলেছিলেন তার কাছে এ বইয়ের সবচেয়ে ভালো লাগার বাক্যটি হচ্ছে, ‘ফেরদৌসী তার বইয়ের ৮৯ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন, আনিস স্যার আমাদের রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন পড়াতেন। কী ভালোয় না পড়াতেন তিনি। ফেরদৌসীর মতো নামি অভিনেত্রী যখন শিক্ষক হিসেবে আমার সম্পর্কে বলেন, তখন আপনাদের বুঝতে হবে যে আমি মনে হয় শিক্ষক হিসেবে ভালোই পড়াতাম। অতএব শিক্ষক হিসেবে আমি খারাপ ছিলাম না। সুতরাং রাস্তাঘাটে আপনারা আমাকে দেখলেই সালাম দেবেন। আপাতত আপনাদের সালাম দিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি।’ এমন চমৎকার রসবোধ ছিল স্যারের বক্তব্যের মধ্যে।

কেউ মারা গেলে আমরা একটা গতানুগতিক কথা বলে থাকি, তার শূন্যস্থান পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু আনিস স্যারের শূন্যস্থান আসলেই পূরণ হওয়ার নয়। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, গবেষণা এবং সমাজ সংস্কারক হিসেবে আনিস স্যারের শূন্যস্থান আসলেই পূরণ হওয়ার নয়। স্যারের যে উচ্চতা, পান্ডিত্য সবদিক বিবেচনায় নিয়েই তিনি অনন্য।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিবনগর সরকারে কাজ করেছেন। স্বাধীনতার পর সংবিধানের বাংলা ভাষ্য তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দুজন সহযোগীকে নিয়ে তিনি সংবিধানের বাংলা ভাষ্য তৈরি করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে গেছেন।

আমার মনে পড়ে, বেতার-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসনের একটা কমিটি হলো, সেই কমিটিতে স্যারও সদস্য ছিলেন, আমিও ছিলাম। শেষ পর্যায়ে যখন রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে, সেই রিপোর্টের খসড়া তৈরি করেছিলেন একজন গুণী মানুষ, যিনি পরবর্তী সময়ে সিনিয়র সচিব হয়েছিলেন, বিশ্বব্যাংকেও কাজ করেছেন। খসড়া রিপোর্টটা চূড়ান্ত করার জন্য সবশেষে স্যারের ওপর দায়িত্ব পড়ল। প্রেস থেকে সেই প্রুফ আসার পর দেখেছি, স্যার কত নিখুঁতভাবে প্রুফ দেখতে পারেন। আমি অনেককেই প্রুফ সংশোধন করার কাজে দেখেছি। কিন্তু আনিস স্যারের চেয়ে ভালো, দক্ষ কেউ ছিলেন না। তিনি প্রতিটি শব্দ মন দিয়ে দেখতেন। স্যারের কাছ থেকে আমি শিখেছি কীভাবে, ভুল-ত্রুটিগুলো সংশোধন করতে হয়।

স্যারের এমন প্রয়াণ আমাদের ভীষণভাবে বেদনার সাগরে ভাসিয়েছে। আমাদের দুঃখ শুধু এই, স্যারের মৃতদেহটি দেখবার সুযোগ পেলাম না। যদি শহীদ মিনারে নেওয়া যেত, তবে সেখানে হাজার হাজার মানুষ তাকে দেখার জন্য ভিড় করতেন। এমন একটা  দুরবস্থার মধ্যে আমরা আবদ্ধ হয়ে আছি। স্যারকে শেষবার দেখতে যেতে পারলাম না। এটা ভীষণ রকম মন খারাপের। স্যার নীরবেই মানুষকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন।

লেখক
সাম্মানিক সভাপতি, ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত