করোনাভাইরাস মহামারী সামাল দিতে সারা পৃথিবী যখন নাকাল এবং পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সামর্থ্য ও সক্ষমতা অনুসারে সকলেই এগিয়ে আসছে তখন চিকিৎসা না দিয়ে হাত গুটিয়ে রাখা কিংবা সেবার চেয়ে মুনাফাকেই বড় করে দেখার মানসিকতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কিন্তু দেশে করোনা পরীক্ষা থেকে শুরু করে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ উঠেছে। মার্চ মাসে করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই অভিযোগ আসতে শুরু করে যে, বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো করোনার ভয়ে রোগীদের জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ সাধারণ চিকিৎসকরাও সেসময় চেম্বারগুলোতে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে দেন। ফলে, করোনা ছাড়াও অন্যান্য জটিল রোগের জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। সরকার করোনা সংক্রমিতদের জন্য হাসপাতাল নির্দিষ্ট করে দিলে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু এরপরও সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য একের পর এক বেসরকারি হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি হতে না পেরে ফিরে গেছেন রোগীরা। অনেক মুমূর্ষু রোগী এভাবে মারা গেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। মূলত এসব কারণেই বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মানসিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোর এমন সেবাবিমুখতা নিয়ে দেশব্যাপী তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমে নানা প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিকরা। তাতে অবস্থা খুব একটা পাল্টায়নি। এখন সরকার আরও কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালকে করোনার চিকিৎসায় যুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালগুলো এজন্য অস্বাভাবিক রকমের বেশি টাকা দাবি করছে। রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘অস্বাভাবিক টাকা চাইছে বেসরকারি হাসপাতাল’ শিরোনামের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য উঠে আসে। শনিবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, মহামারীর মধ্যে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা দিতে বেসরকারি হাসপাতালগুলো সরকারের কাছে অস্বাভাবিক টাকা দাবি করছে। এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে, ‘হাসপাতালের উদ্দেশ্য যদি বাণিজ্য হয়, তাহলে সেটিকে হাসপাতাল বলা কঠিন’ বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী। ২০০ বেডের একটি বেসরকারি হাসপাতাল করোনা চিকিৎসার জন্য সরকারের কাছে মাসে ১৭ কোটি টাকা দাবি করেছে এবং সঙ্গে ডাক্তার ও নার্সদের থাকা-খাওয়ার টাকা দাবি করেছে বলেও জানান তথ্যমন্ত্রী।
দেশে করোনা রোগীর মারাত্মক চাপ সামাল দিতে সরকার এর মধ্যেই বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালকে যুক্ত করেছে। এর মধ্যে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ধানমণ্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এই তিন হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য মোট শয্যা আছে ৮৫০। এসব হাসপাতালে বেশ কিছু আইসিইউ শয্যাও রয়েছে। সর্বশেষ বেসরকারি হাসপাতাল হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপের উদ্যোগে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা-‘আইসিসিবি’ যুক্ত হয়েছে করোনার চিকিৎসার ২ হাজার ১৩ শয্যার একটি অস্থায়ী হাসপাতাল। রবিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক হাসপাতালটির কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এই হাসপাতালে আইসোলেশন সেন্টারের পাশাপাশি ৭১ শয্যার আইসিইউ ইউনিটও থাকবে। করোনা চিকিৎসায় এসব বেসরকারি হাসপাতাল পেশাদারিত্বের সঙ্গে সেবা দিলে বর্তমান পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়। তবে, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, দেশে যে হারে করোনার বিস্তার বেড়ে চলেছে, তার তুলনায় এখন পর্যন্ত করোনার জন্য নির্ধারিত সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সম্মিলিত সামর্থ্যও অপ্রতুল। তাই সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ মহাদুর্যোগ সামলানো সম্ভব নয়।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে অব্যাহত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এর আগে সেবা দেওয়া না হলে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মালিকরা বলছেন, লাইসেন্স বাতিলের হুঁশিয়ারি কোনো সমাধান হতে পারে না। তাদের দাবি সরকার শুরু থেকেই নির্দিষ্ট গাইডলাইন নিয়ে এগিয়ে এলে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। কিন্তু এটা সবারই মনে রাখা দরকার যে, এই মহাদুর্যোগে পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সংকটের সমাধান হবে না। সমস্যা থাকলে সেটা সমাধান করাই এখন দায়িত্ব। বাংলাদেশ এমনিতেই চিকিৎসক ঘাটতির দেশ। তার ওপর দেশের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষই চিকিৎসাসেবার জন্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, দেশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ৬৯টি হাসপাতাল রয়েছে। এছাড়া সারা দেশে বেসরকারি খাতে শুধু হাসপাতাল ও ক্লিনিক আছে ১০ হাজারের বেশি। এ অবস্থায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো যাতে জাতীয় গাইডলাইন মেনে করোনা রোগীদের সেবায় এগিয়ে আসে সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন সরকারের। তাই প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ব্যবস্থাও সরকারকেই করতে হবে। আর বেসরকারি হাসপাতালের মালিক ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপকদেরও অতিরিক্ত মুনাফার লোভ ত্যাগ করে জাতির এই মহাদুর্যোগে সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
