করোনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষয়ক্ষতি

মূলধন সংকট কাটাতে অর্থ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের কমিটি

আপডেট : ১৮ মে ২০২০, ০৫:০৭ এএম

করোনাভাইরাসের কারণে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া অর্থনীতির প্রভাব পড়েছে ব্যাংকিং খাতেও। এর ফলে এ পর্যন্ত ১১ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠারের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। এজন্য মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। এমন পরিস্থিতিতে বন্ড ছেড়ে টাকা তুলতে হবে অথবা গত দুই বছর থেকে বাজেটে স্থগিত থাকা মূলধন ঘাটতি মেটাতে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল স্কিম চালু করতে হবে। এখন মূলধন ঘাটতি মেটাতে কোন পন্থা অবলম্বন করা হবে, তা নির্ধারণে গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

গতকাল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম নেতৃত্বে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি করা হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজের যথাযথ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডিদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। সেই বৈঠকে তারা করোনায় ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবগত করে। এবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে সভা হয়। সভায় ব্যাংকের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় কীভাবে তাদের মূলধন ঘাটতি মেটানো যায়, সেই বিষয়টি প্রাধান্য পায়।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজের স্বচ্ছ বাস্তবায়নের জন্য এর আগেও সভা হয়েছিল। আজকের (রবিবার) সভাটি ছিল এর ফলোআপ। এ সভায় একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। বিভাগের এক অতিরিক্ত সচিব এর নেতৃত্ব দেবেন। তিনি বলেন, কমিটির কাজ হবে প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাংকের অর্থ জোগানে সর্বোত্তম পন্থা খুঁজে বের করা। এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একটি হলো বন্ড ছেড়ে বাজার থেকে টাকা তোলা, অন্যটি বাজেটে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল স্কিম চালু করা, যা চলতি ও আগের অর্থবছর থেকে বন্ধ রয়েছে।

এর আগে ‘করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য ক্ষতি নিরূপণ ও প্যাকেজ বাস্তবায়নে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা নিরসনে সুপারিশমালা প্রণয়ন’ শীর্ষক এক ভিডিও কনফারেন্স হয়। ওই সভায় করোনার প্রভাবে সরকারি ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি ৭ হাজার কোটি টাকা বলে জানানো হয়।

সূত্র মতে, ভিডিও কনফারেন্সে করোনাভাইরাসের প্রভাবে সরকারি সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়। ব্যাংকের এমডিরা জানান, করোনাভাইরাসের প্রভাবে তাদের ব্যবসায় ধস নেমেছে। গত দুই মাসে ছয় ব্যাংকের ক্ষতি হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংক জানিয়েছে, তাদের ক্ষতির পরিমাণ ৮৩২ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের ক্ষতি হয়েছে ৮০০ কোটি টাকার বেশি, অগ্রণী ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকা। করোনাভাইরাসের প্রভাবে আলোচিত বেসিক ব্যাংকের ক্ষতি হয়েছে ৩২০ কোটি টাকা আর বিডিবিএলের ক্ষতি ১৫০ কোটি টাকা।

তবে কয়েকটি ব্যাংক সরকারঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের কারণে তারল্য সংকট হওয়ার আশঙ্কা করে। জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ২৫ হাজার কোটি টাকা পাচ্ছে। তাছাড়া প্রণোদনার সুদের অর্ধেক সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। তাই তারল্য সংকট হবে না। আর হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা দেখবে।

এছাড়া সরকারি ছয় ব্যাংক বলেছে, সরকারের নির্দেশমতে, ব্যাংকের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপ। তাই ব্যাংকগুলোর অবস্থা ভালো নয়। উদ্বৃত্ত অর্থ দেওয়া হলে ব্যাংকগুলো আরও চাপে পড়বে। তাছাড়া করোনার জন্য ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। এসব ব্যাপারে ভিডিও কনফারেন্সে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব সরকারঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে সোনালী ব্যাংককে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত