ঈদের ২০ হাজার, জমানো ১৫ হাজার টাকা দান করে দিল ২ শিশু

আপডেট : ১৮ মে ২০২০, ০৭:৫৭ পিএম

'হ্যালো, তুমি কি গোপালগঞ্জের ইউএনও আঙ্কেল বলছ? আমি আমার ঈদের পোশাক কেনার জন্য বাবার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়েছি, আমি ঈদের পোশাক কিনব না, তোমাকে ২০ হাজার টাকা দেব, তুমি গরীব ছেলেমেয়েদের ঈদের জামা কিনে দিবা'।

ঢাকা থেকে তৃতীয় শ্রেণির এক শিশু ফোন করে গোপালগঞ্জ সদর ইউএনওকে এভাবেই বলছিল। 

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নানা প্রশ্নের উত্তরে ওই কোমলমতি শিশুটি জানায়, 'তুমি জন না তোমার নাম্বার গুগলে পাওয়া যায়? আমি শরীফ তুরসীন কামাল, বারিধারা স্কলার্স ইন্সটিটিউটে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। আমার বাবাকে তুমি বলবা না, তাহলে বাবা এই টাকা পাঠাতে দেবে না। আমি টিভিতে দেখলাম গ্রামে অনেক বাড়িতে লোকজন খেতেই পারছে না, তারা তাদের ছেলেমেয়েদের ঈদের পোশাক দেবে কীভাবে, তাই আমি ঈদে পোশাক কিনব না। আামার ঈদ খরচের টাকা দিয়ে আমার গ্রামের বাড়ির ছেলেমেয়েদের ঈদের পোশাক দিতে চাই, তাই তোমাকে ফোন করছি'। 

ছোট্ট শিশুটি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সাদিকুর রহমান খানকে ফোন করে তার ভাষায় এভাবেই বলছিল।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিশুটিকে অভয় দিয়ে তার বাবার মোবাইল নম্বর নিয়ে ফোন করেন। ওই শিশুর বাবার নাম শরীফ কামাল হোসেন। তার বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের শরীফ পাড়ায়। তিনি ঢাকায় ব্যবসা করেন, থাকেন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। 

তিনি তার মেয়ের এই ফোনালাপ শুনে প্রথমে হতবাক হন, পরে তার মেয়ের ইচ্ছা পূরণের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে টাকা পাঠিয়ে দরিদ্র পরিবারের বাচ্চাদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। 

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সাদিকুর রহমান খান বলেন, স্কুল-কলেজ বন্ধ, সবাই ঘরবন্দী, এ অবস্থা থেকে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও মোবাইলে দেখছে করোনা মহামারীতে কোথায় কী হচ্ছে। আর তাই দেখেই হয়ত বারিধারা স্কলার্স ইন্সটিটিউটের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী শরীফ তুরসীন কামালের মনে সমবেতনা জেগেছে। আর তাই সে আমার নম্বর জোগাড় করে ফোন করেছে। আমি তার বাবার সঙ্গে কথা বলেছি, তিনিও তার মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য আমার কাছে টাকা পাঠাতে চাইছেন। তার টাকা দিয়ে আমি নতুন পোশাক কিনে হত-দরিদ্র বাচ্চাদের দিয়ে ছোট্ট তুরসীনের ইচ্ছা পূরণ করব। 

এর আগে রোববার বিকেলে গোপালগঞ্জ শহরের রংধনু স্কুলের ৩য় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসতিয়াক তার টিফিনের খরচ থেকে বাঁচানো এবং প্রতি রোজার ঈদ ও কোরবানীর ঈদে আত্মীয়-স্বজনের দেওয়া সালামির ১৫ হাজার টাকা করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানার হাতে তুলে দেয়।

তৃতীয় শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী ইসতিয়াক জানায়, বাসা থেকে দেওয়া টিফিন এবং প্রত্যেক ঈদে পাওয়া টাকা আমি সব খরচ করি না, জমিয়ে রাখি। এটা আমার অভ্যাস। প্রতিদিন টিভিতে করোনার খবর দেখি, গরিব মানুষদের সাহায্য করার খবর দেখি, তাই আমি আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলে আমার জমানো টাকাগুলো ডিসি স্যারের কাছে জমা দিলাম। স্যার এই টাকা দিয়ে গরীব মানুষদের খাবার কিনে দেবেন।

জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা বলেছেন, নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ, ৩য় শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী অপরকে সহযোগিতা করার এই মানসিকতা পোষণ করে, ভাবতেই ভালোলাগে। 

তিনি বলেন, শরীফ তুরসীন কামাল, ইসতিয়াকের মতো শিক্ষার্থীদের মাঝে অপরকে উপকার বা সহযোগিতা করার মানসিকতা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মোটিভেশন দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরী, এতে একজন  শিক্ষার্থী শুধু ভালো রেজাল্ট কেন্দ্রিকই হয় না, অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং মানবিকগুণের অধিকারী হয়ে ওঠে, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত