সোমবার রাতে বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবালের ফেইসবুক লাইভ শো আলোকিত করলেন ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি। ২৬ মিনিটের লাইভে তামিম মূলত তার ও জাতীয় দলের সতীর্থদের ক্রিকেট সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব আদায় করে নিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে।
প্রশ্ন ও জবাবগুলো দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়া হলো
তামিম ইকবাল : বিরাট ভাই, আপনাকে আমি প্রথম খেলতে দেখি ২০০৯ সালে। পরের ২/৩ বছরে আপনি একেবারে অন্যরকম এক ব্যাটসম্যান হয়ে গেলেন। এমন কী করেছিলেন যে পুরোপুরি বদলে গেলেন?
বিরাট কোহলি : আমি একটা সিরিজ খেলার পরই কিছুদিনের জন্য দল থেকে ছিটকে পড়েছিলাম। ২০০৯ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কামব্যাক করে ২/৩ ম্যাচে ভালো খেললাম। একটাতে ম্যাচ সেরা ছিলাম। ওখান থেকে আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠতে শুরু করে। তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি (ডিসেম্বর ২০০৯, কলকাতা, ১১৪ বলে ১০৭, ক্যারিয়ারের ১৪তম ওয়ানডে) করার পর আমার মনে হয় যে ভারত দলের জন্য আমি লম্বা সময় পর্যন্ত খেলতে পারি। কেননা চাপের ম্যাচে রান তাড়া করার পরিস্থিতিতে ৩ নম্বরের মতো পজিশনে তরুণ হিসেবে যখন পারফর্ম করেন, তখন এভাবেই কেবল মাইন্ডসেট বদলাতে পারে। মানে পারফর্ম করতেও একটা প্রস্তুতি বা মাইন্ডসেটের দরকার পড়ে। আমাদের দলের তরুণদেরও আমি বলি, ব্যাপার না সামনের খেলোয়াড় দেড়শ না দুশো ম্যাচ খেলেছে। ওই দিনে আপনার মাইন্ডসেট ঠিক থাকলে আপনি জেতাতে পারেন। আমি সবসময় এভাবে ভাবতাম। সবচেয়ে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আউট হয়ে গেলে ভাবতাম না আমি কীভাবে করব। ওটাকে সুযোগ হিসেবে নিতাম। সে না পারলেও আমার আত্মবিশ্বাস দিয়ে আমি তা করতে পারি। আমার মতে নিজের সামর্থ্যরে ওপর বিশ্বাস রাখা জরুরি। অন্য কেউ যা দেখতে পাচ্ছে না পজিটিভ থাকলে আপনি তা দেখতে পারবেন। ম্যাচ জেতাতে পারবেন। খেলা নিয়ে আপনার মানসিকতা পজিটিভ থাকলে খেলা আপনাকে ফল এনে দেবে।
তামিম : আপনাকে যখন প্রথম দেখি আপনার স্ট্যান্স এমন ছিল যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে শট খেলতেন। এখন তা অন্যরকম। এখন সামনে-পেছনে করে খেলেন। অনেক কোচের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা হয়েছে। কেউ কেউ ব্যাক অ্যান্ড অ্যাক্রস খেলার পরামর্শ দিলেও তাতে আমি স্বস্তি পাইনি। জানতে চাই, কেন জায়গায় দাঁড়িয়ে খেলা বদলে সামনে-পেছনে করে খেলা শুরু করলেন?
কোহলি : আমার মনে হয়েছিল আমাকে মাঠের চারপাশে খেলতে হবে। স্থির অবস্থায় দাঁড়িয়ে খেলাটা আমার খেলার ব্যাপ্তি সীমিত করে দিচ্ছিল। একভাবেই খেলতে পারছিলাম তখন। যখন আপনার নিতম্ব মুভ করার জন্য আদর্শ অবস্থানে থাকে তখন আপনি যে কোনো অবস্থানে গিয়ে শট খেলতে পারবেন। মনে হয়েছিল আমার খেলার স্টাইলের সঙ্গে স্ট্যাটিক পজিশন কাজে দিচ্ছিল না। তবে অনেকের কাজে দেয়। শচিন টেন্ডুলকার সম্পূর্ণ স্ট্যাটিক হয়ে খেলতেন। হাত ও চোখের সমন্বয় আর টেকনিক অসাধারণ ছিল। নিজের ব্যাটিংয়ে এজন্য একটু একটু পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট বিষয় চেষ্টা করতে হয়েছিল। না করলে বুঝতাম না। তাই এটা অবশ্যই বলব কারও যদি মনে হয় তার খেলায় কিছু চেষ্টা করা দরকার তো তা যেন করেন। প্র্যাকটিসে করা হোক। সবচেয়ে জরুরি হলো এমনটা করলে ম্যাচে গিয়ে যেন অবশ্যই তা করেন। আমার মতে অনুশীলন আপনাকে এই নিশ্চয়তা দেয় যে আপনি তৈরি। কিন্তু আত্মবিশ্বাস বাড়ে ম্যাচ পরিস্থিতিতে পারফর্ম করে।
তামিম : আপনি কি অনেক প্র্যাকটিস করতে ভালোবাসেন?
কোহলি : নির্ভর করে। প্রস্তুতির আমার কোনো সেট প্যাটার্ন নেই। কেবল ফিটনেস আর ডায়েট নিয়েই সেট প্যাটার্ন আছে। আমি মনে করি, ট্রেনিং আর ডায়েট একইরকম ধারাবাহিক হওয়া উচিত। তবে যখন ঠিক মতো ব্যাটে বলে হয় না, আত্মবিশ্বাস আসে না তখন আরও বেশি ব্যাট করতে ইচ্ছে করে। যদি মনে হয় তো পারফেক্ট একটা সেশন হলো তখন আমি নেটে ৭/৮ মিনিট বা বড়জোর ১০ মিনিট থাকি। কারণ, যখন ভালো ব্যাট করছেন তখন সেটা বেশি করে ফেললে বাজে অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়। সব শট ঠিক হচ্ছে দেখে যে কোনো শট খেলতে শুরু করবেন তখন। এতে বডি শেপের সমস্যা হয়। কিছু শট খারাপ হয়। আপনি আরও খেলতে থাকেন। আরও খারাপ হয়। যা আপনি তৈরি করেছিলেন তা হুড়মুড়িয়ে তলানিতে নেমে যেতে পারে। ব্যাটসম্যান হিসেবে এই সচেতনতাটা খুব জরুরি।
তামিম : আমি ১০/১৫ মিনিট ব্যাট করলেও খুব তীব্রতার সঙ্গে করি। মুশফিক (মুশফিকুর রহিম) ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাট করতে থাকে। এটা হয়তো ওই ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে যে কার কতটা নেট লাগবে।
কোহলি : একমত। (চেতেশ্বর) পূজারা তিন ঘণ্টা ধরে ব্যাট করবে। আসলে আত্মবিশ্বাস অর্জনের সবার নিজস্ব পদ্ধতি থাকে। তবে আমার মনে হয়, কারও যদি মানসিক অবস্থা ভালো থাকে, অফ দ্য ফিল্ডেও সফরের সময় যদি একটু কফির জন্য বা হাঁটতে বাইরে যেতে হয় তখন সেটাও জরুরি। আপনি সবসময় তীব্র অবস্থাতে থাকতে পারেন না। ক্রিকেট আমরা সবাই খেলতে জানি। কখনো কখনো এটাকে জটিল করে ফেললে চাপ আরও বাড়ে।
তামিম : বিরাট ভাই, আমার আরেক কলিগের প্রশ্ন, যখন আপনি রান তাড়া করেন মাথায় কী কাজ করে?
কোহলি : খুব সাধারণ। কখনো কখনো তো মুশফিক কিংবা কেউ স্ট্যাম্পের পেছন থেকে কিছু বলে আরও বেশি উজ্জীবিত করে দেয় (হাসি)। তরুণদের বলি, এই আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে তুমি করতে পার। ছোট থাকতে টিভিতে খেলা দেখার সময় ইন্ডিয়া কোনো ম্যাচ চেজ করে হেরে গেলে ভাবতাম, আমি থাকলে এই ম্যাচ জিতিয়ে আসতাম। এখন যখনই এমন পরিস্থিতিতে পড়ি তখন ভেতর থেকে ওই তীব্র বাসনাটা বের হয়ে আসে। চেজিংয়ে আপনার জানা থাকে ঠিক কত রান করতে হবে এবং এজন্য কী কী করতে হবে। আমি মনে করি, এর চেয়ে স্বচ্ছ পরিস্থিতি আর কিছু হতে পারে না। আমি এটাকে প্রেশার না ভেবে সুযোগ হিসেবে দেখি।
তামিম : আমার শেষ প্রশ্ন। কখনো বড় ম্যাচ খেলতে গিয়ে নিজেকে নিয়ে সংশয় জেগেছে যে, আমি হয়তো অত ভালো নই বা এমন কিছু?
কোহলি : সত্যি বলতে খেলায় আমার কখনোই সংশয় থাকে না। মানুষ হিসেবে সবারই তো কমবেশি সংশয়, দুর্বলতা, নেতিবাচক ব্যাপার থাকে। কখনো ট্যুর গেলে হয়তো ভালো ব্যাট করছেন না, স্বতঃস্ফূর্ততা আসছে না তখন মনের মাঝে আসতেই পারে যে ‘আমি কি তাহলে যথেষ্ট ভালো নই বা...?’ কিন্তু জরুরি হলো নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নেওয়া যে এই ভাবনা ঠিক না, এটা আমাকে পেছনে নিয়ে যেতে চাইছে। আমি যথেষ্ট ভালো তা বিশ্বাস করলেই আমি যথেষ্ট ভালো। খেলায় ভালো ব্যাপার হলো এসব ভাবার কোনো সুযোগই মেলে না। পরিস্থিতি দেখে আপনাকে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়। দলের কী চাওয়া এবং সে জন্য আমার কী করণীয় তা ঠিক করে নিতে হয়। তখন এনার্জি ভরপুর থাকে। নেগেটিভ ভয়েসগুলো আসে অফ দ্য ফিল্ডে যখন আপনি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নেই। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, এমন পরিস্থিতিতে সবসময় নিজেকে বলতে হবে- ‘না, আমি যথেষ্ট ভালো। নেটে যাব। প্রয়োজনে আরও পরিশ্রম করব, স্বতঃস্ফূর্ততা ফিরে পাব।’ তারপর দেখবেন কী হয়। আমরা একটা ইনিংস খেলে ফেলার পর ভাবি না- হায়, কেন এত নেগেটিভ ভাবছিলাম! ওটা কেবল একটা বাধা। শুধু বিশ্বাস রাখতে হবে যে এটা পার হয়ে যাবেন। আর পজিটিভ থাকতে হবে।
