বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশের উপকূলসহ বিস্তীর্ণ এলাকায়। গতকাল বুধবার চার ঘণ্টার ব্যবধানে দ্বিতীয়বার আঘাত হেনে সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, খুলনা, নোয়াখালীর হাতিয়াসহ উপকূলীয় দশটি উপজেলায় তান্ডব চালায় আম্পান। এই সময় অসংখ্য ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে, উড়ে গেছে ঘরের চালা ও উপড়ে গেছে বড় বড় গাছ। তলিয়ে গেছে এসব জেলার নিম্নাঞ্চল। গত রাত দেড়টার দিকে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আম্পানের আঘাতে অন্তত ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে ভারতে অন্তত ১০ জনের প্রাণহানির খবর দিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। দুই দেশেই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দীন আহমেদ জানান, বুধবার রাত ৮টার পরে আম্পান উপকূল অতিক্রম করেছে। উত্তর-পূর্ব দিকে সরে আজ বৃহস্পতিবার সকালের আগে আবার পাবনা অঞ্চল দিয়ে উত্তর দিকে চলে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মঙ্গলবার থেকেই আম্পানের ব্যাপারে সর্বক্ষণ খোঁজখবর রাখছেন। জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে যোগাযোগ রাখছেন উপকূলীয় জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে।
আম্পানের প্রভাবে গতকাল দুপুর থেকেই উপকূলের প্রায় প্রতিটি এলাকায় প্রবল ঝড়োবাতাস বইতে শুরু করে। বিকেল ৪টার মধ্যে নেমে আসে সন্ধ্যার অন্ধকার। এরপর সন্ধ্যা নামার আগেই সাতক্ষীরার শ্যামনগরসহ বিভিন্ন উপজেলা, নোয়াখালীর হাতিয়া, পটুয়াখালীর গলাচিপা, খুলনার কয়রা, বরগুনার তালতলী, কুয়াকাটাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলে ধেয়ে আসতে থাকে পশ্চিমবঙ্গ লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে আসা প্রবল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্পান। যতটা শক্তি নিয়ে এবং গতিতে আঘাত করার কথা ছিল, তার চেয়ে কম গতিতে আঘাত হানলেও বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধ ও এলাকা প্লাবিত করেছে। বিচ্ছিন্ন হয়েছে কয়েক লাখ গ্রাহকের বিদ্যুৎসংযোগ।
বিকেল সাড়ে ৪টায় বাংলাদেশের উপকূলে প্রবেশ করে ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রভাগ। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রথম আঘাত হানে। সেই সময় ঝড়ের গতি ৭৫ থেকে ১১০ কিলোমিটার ছিল। এরপর এটি অবস্থান করতে থাকে একই গতিতে। সে সময় ধারণা করা হচ্ছিল হয়তো ঘূর্ণিঝড় পশ্চিমবঙ্গে তা-ব চালানোর পর অনেক বেশি দুর্বল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ২ ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১০টা থেকে এর গতি বাড়ে এবং তখনই তাণ্ডব চালায়।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এ ধরনের শক্তিশালী ঝড় সাধারণত উপকূলে প্রথম আঘাত করার পর ২৩ ঘণ্টা স্থির থেকে দ্বিতীয়বার আঘাত করে। আর দ্বিতীয়বারের আঘাতটি ভয়ানক হয়। আম্পানের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। সেই আশঙ্কা থেকেই, বিকেল ৪টার পরেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষজনকে সরিয়ে আনা হয়েছে। তারা বলেন, দ্বিতীয়বারের আঘাতে ঝড়ের গতিবেগ সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী খুলনায় ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছিল। প্রচণ্ড ঝড়ে এবার তীব্রতা বেশি। ফলে বাড়িঘর, গাছপালা এবং বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। সাড়ে ১০টা থেকে ঝড়ের গতি বাড়তে থাকে এবং এটি সাড়ে ১২টা পর্যন্ত একই গতিতে তা-ব চালায়। এ সময় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনই নিরূপণ করা সম্ভব নয়।
গতকাল রাতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃতি সাধারণত এরকম। উপকূলে প্রথমবার উঠে আসার পর কিছুটা নীরব থাকে। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তারপরের দিন এগোতে থাকে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় দফায় আঘাত হানার সম্ভাবনা থাকে বেশি। সেজন্যই এটা ২৪ ঘণ্টা সময় আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সতর্ক থাকে। তিনি জানান, রাত ১২টার পর ঝড়ের গতি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনাসহ সব এলাকায় বড় ধরনের তা-ব চালিয়ে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত সময় অনেক শক্তি কমে যায় আম্পানের।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক মাজেদুল হক জানান, রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ১৫০ কিলোমিটার বাতাস বইছিল। এরপর আস্তে আস্তে কমতে থাকে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, একটা ঘূর্ণিঝড় যখন সাগর থেকে উপকূল অতিক্রম করে স্থলভাগে প্রবেশ করে, তখন কিছু সময় তাণ্ডব চালানোর পর সবকিছু নীরব হয়ে যায়। এর কয়েক ঘণ্টা পর আবারও তাণ্ডব শুরু হয়ে যায়। দ্বিতীয়বারের ধাক্কায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।
গতকাল রাত সাড়ে ১১টায় খুলনার কয়রা উপজেলার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জানান, এই ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে। জোয়ারের তোড়ে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। প্রচণ্ড ঝড়ে পড়ে গেছে কয়েকশ ঘরবাড়ি। গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
আমাদের পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার দশমিনা, গলাচিপা, রাঙাবালী ও কলাপাড়া এলাকার ৫০টি চর প্লাবিত হয়েছে। দুমকী উপজেলার পাংগাশিয়া ইউনিয়নের রাজগঞ্জ এলাকার ওয়াপদা বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে পায়রা নদীর পানি প্রবল বেগে প্রবেশ করে উত্তর পাংগাশিয়া, দক্ষিণ পাংগাশিয়া, রাজাগঞ্জসহ অন্তত পাঁচ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
অপরদিকে, লেবুখালী ফেরিঘাট এলাকা তলিয়ে গেছে। নির্মাণাধীন লেবুখালী সেতুর দক্ষিণপাড়ের সড়ক প্রায় মৌকরণ ব্রিজ পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে দুমকি উপজেলার পাংগাশিয়া কলেজ ভবনের চাল উড়িয়ে নিয়ে গেছে।
ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তাৎক্ষণিক না পাওয়া গেলেও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাহাবুবুর রহমান জানান, রাঙাবালী, গলাচিপা ও কলাপাড়ার অবস্থা খুবই ভয়ানক। বিপৎসীমার ওপরে পানি চলে এসেছে, প্লাবিত হয়েছে প্রচুর ঘরবাড়ি।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আম্পানে জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি মনিটরিং শুরু করেন। তিনি নিজে উপকূলীয় জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে কথা বলেন। যেকোনোভাবে হোক লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা এবং করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে রাখার ব্যবস্থার বিষয়টি নিশ্চিতে সবাইকে তৎপর থাকার নির্দেশ দেন।
আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপকূল পেরিয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে আম্পান স্থলভাগের দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে। তবে একই সঙ্গে বৃষ্টি ঝরিয়ে এর শক্তি ক্ষয় হয়ে যাবে। আম্পানের একটি অংশ বাংলাদেশের সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চল দিয়ে ঢুকে যশোর ও নড়াইল জেলার দিকে রাতেই চলে যাবে। এ পর্যন্ত এর বাতাসের গতিবেগ হবে ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটারের মতো। সেখান থেকে মাগুরা, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, সিরাজগঞ্জ থেকে জামালপুরের দিকে এগিয়ে যাবে আজ (গতকাল) রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে।
আমাদের ঢাকা অফিস ও জেলা প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য মতে, গতকাল দুপুর পর্যন্ত প্রশাসন ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সহযোগিতায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জনগণকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেছেন, ২৪ লাখ লোককে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। ফলে ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানলেও জানমালের ক্ষতি হয়েছে কম।
এদিকে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, তিন দিন ধরে সুপার সাইক্লোন ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান যেভাবে ছিল এবং ১৪ মে থেকে সৃষ্টি হয়ে যে শক্তি গতকাল সকাল পর্যন্ত আম্পান অর্জন করেছিল, তাতে বাংলাদেশের উপকূলে আরও প্রবল গতিতে আঘাত হানার কথা। কিন্তু মঙ্গলবার ভোর থেকেই এটি কিছুটা গতিপথ পরিবর্তন করে এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রচণ্ড তাণ্ডব চালিয়ে দুর্বল হয়।
তাদের অভিমত, ঘূর্ণিঝড় আম্পান বাংলাদেশ উপকূলে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ না চালালেও অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৭ ফুট বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে। অনেক এলাকায় ভেঙে গেছে বেড়িবাঁধ ও কাঁচা সড়ক। এখনই ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা না গেলেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তারা বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যা-ই হোক না কেন, এখন সরকারকে দ্রুত বাঁধগুলো ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ এবং তাদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করতে হবে।
আবহাওয়া অফিস থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে সুন্দরবন ঘেঁষে ‘আম্পান’ স্থলভাগে উঠে এসেছে। আবহাওয়া অফিস থেকে জানানো হয়, শেষমেশ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আছড়ে পড়েছে সুপার সাইক্লোন থেকে সাইক্লোনে রূপ নেওয়া আম্পান। গতকাল দুপুর আড়াইটায় প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে এবং পরে বিকেল ৪টায় বাংলাদেশের সাতক্ষীরা এলাকা দিয়ে শুরু হয় আম্পানের স্থলপথ গমন। রাতভর ঝড়ের তাণ্ডব আর বৃষ্টি ঝরিয়ে শেষ পরিণতির দিকে যেতে যেতে ক্রমশ দুর্বল হয় আম্পান। তবে বাংলাদেশের উপকূলে যে মাত্রায় আঘাত হানার শঙ্কা করা হয়েছিল, সেভাবে আঘাত হানেনি আম্পান। বরাবরের মতো এবারও তার ধ্বংসযজ্ঞের মূল কেন্দ্র ছিল চব্বিশ পরগনার সুন্দরবন এলাকা। এবারও সুন্দরবন বাঁচিয়ে দিল অসংখ্য প্রাণ। আম্পানের তাণ্ডবে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশে আম্পানের একটি অংশের ঝাপটা লেগেছে। তাতেই সারা দেশে ঝরেছে তুমুল বৃষ্টি এবং বইছে ঝড়ের ঝাপটা। ভারী বৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাসে বিভিন্ন এলাকার নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন গত রাত ১২টার দিকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি উপকূল অতিক্রম করে ফেলেছে। এই মুহূর্তে এটি সাতক্ষীরা থেকে যশোরের দিকে যাচ্ছে। ওই সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ রেকর্ড হয়েছে ১৫১ কিলোমিটার। পরবর্তী সময়ে এটি ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া অতিক্রম করবে। বৃষ্টির মাধ্যমে এটি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে বাতাসের গতি আরও কমবে। আরও দুর্বল হয়ে এটি গভীর নি¤œচাপে রূপ নেবে। তবে কখন নাগাদ গভীর নি¤œচাপে রূপ নেবে এখনো নিশ্চিত নয়। এর গত রাত ৯টার দিকে অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটি বিকেল ৪টার দিকে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সাতক্ষীরা উপকূল দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করে। তবে ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র ছিল পশ্চিমবঙ্গে, এর একটি অংশ বাংলাদেশের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ওই সময় বাংলাদেশ উপকূলে বাতাসের গতিবেগ ছিল ১১৫ কিলোমিটার। তিনি বলেন, স্থলভাগে উঠে যাওয়ার পর যেকোনো ঘূর্ণিঝড়ই ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। আম্পানের ক্ষেত্রেও তেমনটাই হচ্ছে। আজ সকাল নাগাদ এটি একটি স্থল নি¤œচাপে রূপ নিতে পারে।
গত রাত ১১টার দিকে অধিদপ্তরের ৩৬ নম্বর বুলেটিনে বলা হয়, উপকূল অতিক্রমরত ঘূর্ণিঝড় আম্পান আরও উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে উপকূল অতিক্রম সম্পন্ন করে ওই সময় সাতক্ষীরা জেলা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ঘূর্ণিঝড় হিসেবে অবস্থান করছিল। এটি আরও উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বৃষ্টি ঝরিয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার, যা দমকা হাওয়ার আকারে ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আম্পানের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে এবং সাগর উত্তাল রয়েছে।
গত রাত ১২টার পর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ১০ নম্বর এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত বহাল রাখে আবহাওয়া অধিদপ্তর। উপকূলীয় জেলাসমূহেও ৯ ও ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের পাশাপাশি ১০-১৫ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস ও ১৪০-১৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা বহাল রাখা হয়।
পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট, বুয়েটের সিনিয়র গবেষক ড. মোহন কুমার দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুপার সাইক্লোনটি যে গতিতে আসার কথা শেষ পর্যন্ত কিছুটা দুর্বল হওয়ায় আমরা রক্ষা পেয়েছি। কিন্তু অনেকগুলা এলাকার মূল বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। তাই বর্তমানে যে করোনা মহামারী চলছে, তাতে দ্রুত পরবর্তী কাজগুলোতে হাত দিতে হবে। এখন থেকেই বেড়িবাঁধের কাজ শুরু করতে হবে। আর সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি মহামারীর মধ্যে এই ঝড়ে মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। আর আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে যেন সংক্রমণ ছড়াতে না পারে সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
দেশ রূপান্তরের উপকূলীয় জেলাগুলোর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন তাদের এলাকার সর্বশেষ পরিস্থিতি।
সাতক্ষীরায় দুপুরের পর থেকে টানা বৃষ্টি হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আঘাত হানে আম্পানের অগ্রভাগ। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ঝড়ের গতি। উপকূলঘেঁষা নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৭ ফুট বেশি জলোচ্ছ্বাসে। জেলার প্রায় দুই লাখ মানুষকে নেওয়া হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। জেলার বেশিরবাগ এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।
একই অবস্থা বাগেরহাটেরও। সেখানেও দুপুরের পর থেকে ভারী বর্যণ শুরু হয়। সেই সঙ্গে দমকা বাতাস। সন্ধ্যার পর থেকে বাড়তে শুরু করে বাতাসের বেগ। জেলায় কয়েক লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।
আম্পানের অগ্রভাগ খুলনা উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করে সন্ধ্যায়। গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার। খুলনা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিরুল আজাদ জানান, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের অগ্রভাগ সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা, মোংলা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরে আঘাত হেনেছে।
নোয়াখালীর হাতিয়ায় বিকেলের পরই ভয়ংকর হতে শুরু করে ঝড়। প্লাবিত হয় উপজেলার অনেক এলাকা। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে বন্ধ করা হয় সব ধরনের যোগাযোগ। এ ছাড়া পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ভোলা ও বরিশালেও আঘাত হেনেছে আম্পান।
আম্পানের প্রভাবে পটুয়াখালীর দক্ষিণ উপকূল সংলগ্ন সাগরে উচ্চ ঢেউ ও নদীতে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাতাসের তীব্রতা বেড়েই চলছে। উচ্চ জোয়ারে নদী-নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৪-৫ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্ধশত চরসহ নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম শিপন জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষ যেন সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান করে সে ব্যাপারে সচেতন করতে কাজ করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
ঝালকাঠিতে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জেলার নদী তীরবর্তী এলাকায় বেড়েছে পানিও। এরই মধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত পাঁচ ফুট পানি বেড়েছে নদীতীরে।
ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ডেপুটি কালেক্টর (নেজারত) আহমেদ হাসান জানান, জেলায় ২৭৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাকা ভবনে আশ্রয় নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ১০ হাজারেরও বেশি লোক আশ্রয় নিয়েছেন।
লক্ষ্মীপুরেও সন্ধ্যার দিকে আগাত হেনেছে আম্পাম। জেলায় ঝড়ের তীব্রতা প্রকট না হলেও সতর্ক ছিল প্রশাসন। করোনার বিষয় মাথায় রেখে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ৬৬টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এরসঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স ও ওষুধ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়েও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রস্তুত রয়েছে। যেকোনো সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ সবসময় সতর্ক অবস্থায় আছে।
কক্সবাজার, চট্টগ্রামেও আম্পোনের প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টির খবর জানিয়েছেন প্রতিনিধিরা। তবে এই এলাকায় ঝড়ের তীব্রতা তেমন প্রকট ছিল না।
