বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ব্যবসায়ীদের ১০০ কোটি টাকার গুদাম ভাড়া মওকুফ করেছে। করোনাভাইরাসের কারণে সময়মতো গুদাম থেকে পণ্য খালাস করতে না পারায় ব্যবসায়ীদের এ ছাড় দিয়েছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক সংস্থা বিমান।
২৬ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত ১৬ দিনে উড়োজাহাজের মাধ্যমে এসব পণ্য এনে বিমানের গুদামে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এসব পণ্যের গুদাম ভাড়া ছিল ১০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে আগে থেকে গুদামে থাকা কিছু পণ্য যেগুলো ওই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খালাস করে নেওয়ার কথা ছিল সেগুলোর গুদাম ভাড়াও মওকুফ করা হয়েছে।
এই মওকুফের পরও কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠন এবং কয়েকজন ব্যবসায়ী আরও বেশি সময়ের জন্য গুদাম ভাড়া মওকুফ করার দাবি করেছেন। কিন্তু বিমান তাতে সাড়া দিচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ীরা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দেন-দরবার করছেন।
এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে বিমান একটা বাণিজ্যিক সংস্থা। অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বিমানকে টিকতে হয়। বিমানের খরচ আছে। বিমানকে চলতে হবে, আবার মুনাফাও করতে হবে। সব ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফ করে দিলে বিমান চলবে কীভাবে? সংস্থাটির চলার পথ খোলা রাখতে হবে। এমন হতে পারে করোনাভাইরাসের আগে যে সার্ভিস চার্জ ছিল এখন তার চেয়ে কম চার্জ নেওয়া হবে। কিন্তু সম্পূর্ণ মওকুফ করা ঠিক নয়। নতুন করে এ দাবি তোলাও অযৌক্তিক।’ তিনি বলেন, ‘বিমান দাতব্য সংস্থা নয়। বিমানের গুদাম যদি ১০০ শতাংশ ফ্রি করে দেওয়া হয় তাহলে ওখান থেকে কেউ মাল ডেলিভারি নেবে না। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছা করে গুদাম শূন্য করছে না। কারণ তারা জানে মার্কেটে তাদের মালের চাহিদা নেই। চাহিদা থাকলে কেউ গুদামে ফেলে রাখে না। আসলে ব্যবসায়ীরা বিমানের কাঁধে তাদের লোকসান চাপাতে চাচ্ছে। দিনের পর দিন এটা হতে পারে না। তারা দিনের পর দিন যদি ওখানে মালামাল ফেলে রাখে তাহলে অন্য আমদানিকারকরা তাদের পণ্য গুদামে রাখতে পারবে না। এখন যারা পণ্য আমদানি করছে তাদের পণ্য গুদামে জায়গা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই খোলা আকাশের নিচে পণ্য ফেলে রাখা হয়েছে। এতে অনেকেরই পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু নিজেকে নিয়ে চিন্তা করলেই হবে না, অন্যকে নিয়েও চিন্তা করতে হবে।’
বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পণ্য আসার প্রথম দিন থেকে তৃতীয় দিন পর্যন্ত গুদাম ভাড়ার জন্য আমদানিকারকদের বিমানকে কোনো ভাড়া দিতে হয় না। চতুর্থ দিন থেকে ১৩তম দিন পর্যন্ত প্রতি ইউনিট পণ্যের ভাড়া দিতে হয় ২৫ টাকা। এক ইউনিটে ৫০ কেজি পণ্য থাকে। ১৪তম দিন থেকে ২১তম দিন পর্যন্ত প্রতি ইউনিটের ভাড়া ১০০ টাকা। ২২তম দিন থেকে ডেলিভারি দিন পর্যন্ত পণ্য রাখার ভাড়া প্রতি ইউনিট ৬০০ টাকা। প্রতি কেজি পণ্যের এন্ট্রি ফি ৭ টাকা। ন্যূনতম এন্ট্রি ফি ৫০০ টাকা।
২০১৯ সালের ১৬ মার্চ থেকে এ নিয়ম কার্যকর করা হয়। নিয়ম কার্যকর করতেও বিমানকে অনেক ঝামেলা মোকাবিলা করতে হয়। এ নিয়ম করার আগে বিমানের গুদামে কোনো জায়গা ছিল না। বিমানবন্দরের কার্গো সেকশনের সব জায়গা ছিল আমদানি করা পণ্যে সয়লাব। বিমানবন্দরের বিশৃঙ্খলা দূর করার জন্য প্রধানমন্ত্রী বিমান মন্ত্রণালয়কে ‘আলটিমেটাম’ দিয়েছিলেন। কাজ না হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী এ অ্যাসাইনমেন্ট দেন তার মুখ্য সচিবকে। তিনি একাধিক সভা করে মালামাল বিশৃঙ্খল অবস্থায় পড়ে থাকার জন্য দায়ীদের শাস্তি দিয়ে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনেন। এসব ঘটনার আগে পণ্য আনার পাঁচ দিন পর্যন্ত কোনো ভাড়া দিতে হতো না। পরে মুখ্য সচিব তা তিন দিন করে দেন।
দেশে করোনাভাইরাস ধরা পড়ার পর গত ২৬ মার্চ থেকে সরকার সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ রাখে। সারা দেশের গণপরিবহনও বন্ধ করে রাখা হয়। এ কারণে ব্যবসায়ীরা যেন তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেন সেজন্য সরকার ‘লকডাউন চলাকালীন’ পর্যন্ত বিমানের গুদাম ভাড়া মওকুফ করে। ‘লকডাউন চলাকালীন’ পর্যন্ত স্টোরেজ চার্জ মওকুফ করার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে বিমানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুই দফা নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিমান ১০ মে পর্যন্ত স্টোরেজ চার্জ মওকুফ করলেও পরে সময়সীমা আর বাড়ায়নি।
গত ২৯ এপ্রিল গুদাম ভাড়া মওকুফে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয় থেকে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২৬ মার্চ থেকে সরকারি সিদ্ধান্ত মতে ‘লকডাউন’ চলমান। এ কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সীমিত রয়েছে। সরকার ২৬ মার্চ থেকে ‘লকডাউন চলাকালীন পর্যন্ত’ আমদানি করা এবং বিমানের ওয়্যারহাউজে রক্ষিত সব পণ্যের গুদাম ভাড়া মওকুফের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এরপরই বিমান কর্র্তৃপক্ষ ৩০ এপ্রিল এক আদেশ জারির মাধ্যমে ১০ মে পর্যন্ত চার্জ মওকুফ করে। এ সুবিধা দেওয়া হয় শুধু ‘লকডাউনকালীন’ আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে।
আমদানিকারকরা বিমানকে জানিয়েছেন, সরকার ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বা ‘লকডাউনের’ মেয়াদ বাড়িয়েছে। কিন্তু বিমান কর্র্তৃপক্ষ ১০ মে পর্যন্ত ডেমারেজ মওকুফ করে, তাতেও নানা শর্ত জুড়ে দেয়। এক্ষেত্রে বিমান স্পষ্টত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অমান্য করেছে বলে তাদের যুক্তি। তারা বলছেন, মন্ত্রণালয় থেকে বিমানকে নির্দেশ দেওয়া হয় ‘লকডাউন চলাকালীন পর্যন্ত’ ডেমারেজ মওকুফ করতে। বিমান নতুন করে অর্ডার না করায় আমদানিকারকরা বিপাকে পড়েছেন। তারা বলেন, ‘লকডাউন চলাকালীন’ জরুরি সেবার আওতায় বিমানবন্দর ও কাস্টমস খোলা থাকলেও অন্য সেবা খাতের অনেকাংশই বন্ধ বা সীমিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করায় পণ্য খালাসে অনিচ্ছাকৃত দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপের অভাবে চাইলেও আমদানিকারকরা পণ্য খালাস নিতে পারেননি। এখন পুরো দায়ভার ব্যবসায়ীদের বহন করতে হচ্ছে। এতে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়াসহ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে, যা শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতাকে হ্রাস করবে।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোকাব্বির হোসেন সাড়া দেননি। তবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গুদাম ভাড়া মওকুফের সময়সীমা নতুন করে বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই। কারণ, যখন গুদাম ভাড়া মওকুফ করা হয়েছিল তখন গাড়ি চলাচল, বন্দর, কাস্টমস সবকিছুই বন্ধ ছিল। ১০ মে’র পর সরকার এসব ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে।
