ম্যারাডোনা গুড পেলে বেটার জর্জ বেস্ট

আপডেট : ২২ মে ২০২০, ০৬:১৪ এএম

উত্তর আয়ারল্যান্ডের বৃষ্টিভেজা মাঠে ফুটবল খেলছিলেন কিশোর জর্জ বেস্ট। খেলা না বলে ‘রিক্রিয়েশনাল ফুটবল’ বলাই ভালো, যা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বব বিশপ। লোকটা তখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের স্কাউট। দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে ক্ষুদে ফুটবলার আবিষ্কার করা ছিল তার কাজ। বেস্টকে দেখার পর লন্ডনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সদর দপ্তরে টেলিগ্রাম পাঠান বিশপ। লেখা ছিল, ‘আই থিংক আই হ্যাভ ফাউন্ড আ জিনিয়াস।’

১৫ বছর বয়সে ম্যানচেস্টারে এসেছিলেন বেস্ট। ম্যানেজার ম্যাট বাসবি দু’বছর বসিয়ে রেখেছিলেন। আসলে তৈরি করছিলেন। ১৭ বছর বয়সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে অভিষেক হয় বেস্টের। টানা ১১ বছর খেলেছেন। রেড ডেভিলকে প্রথম ইউরোপিয়ান কাপ এনে দিয়েছেন। ১৯৬৮ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সময় ক্লাবের হয়ে ৫৩ ম্যাচে করেছিলেন ৩২ গোল। এই পারফরম্যান্স কিন্তু কোনো স্ট্রাইকারের নয়, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের। আদতে জর্জ বেস্ট তো তাই ছিলেন। পরের চার মৌসুমে করেন ৯৪ গোল।

স্বাভাবিকভাবেই জর্জ বেস্ট সম্পর্কে ইংরেজ প্রচারমাধ্যমের অতিকথন শুরু হয়। কেউ বলেন ‘পেলের চেয়ে অনেক বড়’ ফুটবলার। কেউ বলেন ‘ও বিশ্বকাপ খেলতে পারেনি এটা বিশ্বকাপের দুর্ভাগ্য।’ আসলেই কি তাই? বাস্তবতা হলো নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে বিশ্বকাপে নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বেস্ট। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাছাইপর্বের বাধা টপকাতে পারেননি। খেলেছিলেন ৩৭ ম্যাচ। গোল মাত্র ৯টি।

বেস্টের তুলনায় নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের আরেক তারকা নরম্যান হোয়াইটসাইডের কৃতিত্ব বেশি। তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলেছেন। আবার কম বয়সে বিশ্বকাপ খেলে পেলের রেকর্ডও ভেঙেছেন। জেরি আর্মস্ট্রংয়ের কথাও বলা যায়। ইংরেজ মনোভাবাপন্ন সমালোচকরা যাকে ‘সেকেন্ড ডিভিশন রিজার্ভ সেন্টার ফরোয়ার্ড’ বলতেন। বিশ্বকাপে তার তিনটি গোল আছে। আরও হতাশার, বেস্ট খেলা ছাড়ার পরের বিশ্বকাপেই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে চমকে দিয়েছিল নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড। তাহলে যে বলা হয় বেস্ট বিশ্বকাপে না খেলা অন্যতম সেরা ফুটবলার! কেউ আবার স্লোগানের মতো করে বলেন ‘ম্যারাডোনা গুড, পেলে বেটার, জর্জ বেস্ট।’ এসব আসলে ইংলিশ মিডিয়ার আদিখ্যেতা। ওরা ডেভিড বেকহ্যামকেও সর্বকালের সেরা মিডফিল্ডার বানিয়ে ফেলেছিল।

বেস্ট ছিলেন ইংলিশ ক্লাব ফুটবলের গ্ল্যামার বয়। পায়ে স্কিল ছিল। পারফর্মও করেছেন। সেই সঙ্গে মদ, মেয়েমানুষ আর জুয়ার নেশায় এতসব গল্পের উৎস হয়েছেন যে, তাকে মিডিয়া লুফে নিয়েছিল। বেস্ট নিজেও দারুণ গুছিয়ে কথা বলতে পারতেন। জনপ্রিয়তার এটাও একটা কারণ। তার কিছু উক্তি তো লোকের মুখে মুখে ফিরত। একবার বলেছিলেন ‘মদ, মেয়েমানুষ এবং দামি গাড়ির পেছনে আমি উপার্জনের ৮০ শতাংশ টাকা খরচ করেছি। এ ছাড়া আমার জীবনের বাকি সব কিছুই বাজে খরচ।’ মদের নেশা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘মদ খাওয়া একবার বাদ দিয়েছিলাম, অবশ্য তখন আমি ছিলাম ঘুমের মধ্যে।’ বেস্টের এমন মন্তব্য আরও আছে যেগুলো প্রবাদের মতো ঠাঁই পেয়েছে ইতিহাসে। নেশা ছাড়ার জন্য পীড়াপীড়ির কারণে বেস্ট তার সতীর্থকে একবার বলেছিলেন, ‘১৯৬৯ সালে আমি একবার নারী ও অ্যালকোহল ছেড়ে দিয়েছিলাম। সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বাজে ২০ মিনিট।’

আক্ষরিক অর্থেই নেশা তাকে গিলে খেয়েছিল। কেন এমনটা হয়েছিল? বেস্টের খেয়ালি প্রতিভার কারণে?

প্রথমবার ম্যাট বাসবির সামনে ‘ট্রায়াল’ দিতে রাজি ছিলেন না। বাবা অনেক বুঝিয়ে রাজি করান। ১৯৬৩-তে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে তার চুক্তি হয়। পেতেন মাত্র ৩৫ পাউন্ড। তখন বেস্টের বাড়িতে কোনো টেলিফোন ছিল না। পপ স্টারের মতো চেহারা আর ফুটবল স্কিল নিয়ে যখন তার উত্থান ঘটছে, তখন ইংলিশ ফুটবলে ঢুকছিল অঢেল অর্থ। ইংলিশ ক্লাব ফুটবলের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল। বেস্ট ছিলেন সেই ফুটবল মার্কেটের প্রথম সুপারস্টার। যার অর্থ খ্যাতি আর নেশার চোরাবালি থেকে বাঁচার কৌশল জানা ছিল না।

১৯৪৬ সালের ২২ মে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে জন্ম বেস্টের। মাত্র ১৭ বছর বয়সে খেলা শুরু। থামেন আটাশেই। মাত্র ১১ বছরের উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টেনে বিক্ষিপ্তভাবে আরও প্রায় ১০ বছর খেলেছেন কখনো স্কটল্যান্ডে, দক্ষিণ আফ্রিকায়, অস্ট্রেলিয়ায় কিংবা আমেরিকার ছোটখাটো ক্লাবে। কিন্তু সেই খেলায় বেস্টকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ততদিনে তিনি ফুরিয়ে গেছেন।

আশির দশকে মাল্টার বারে বসে কোনো এক সুন্দরীকে নিজের কল্পিত মৃত্যুর গল্প বলেছিলেন বেস্ট ‘আমি কাউকে কিছু না বলে স্পেনের ছোট্ট একটা শহরে যাব। ওখানে নির্জন এক বারে বসে লুইস থার্টিন ব্র্যান্ডের অর্ডার দেব। পুরো বোতল শেষ করব। তারপর যা হয় হবে।’ না, এমন স্বপ্নে মৃত্যু হয়নি তার। ২০০৫ সালে লন্ডনের এক হাসপাতালে বেস্টের মৃত্যু হয়েছিল। যখন তার বয়স মাত্র ৫৯।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত