আম্পানের পর কৃষি ও পরিবেশে জোর দিন

আপডেট : ২২ মে ২০২০, ০৭:২৮ এএম

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট স্মরণকালের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার সাইক্লোন আম্পানে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি ও পরিবেশ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে, আম্পানের গতিপথ মূলত সুন্দরবনের ওপর দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্ত এলাকার ওপর দিয়ে যাওয়ায় দেশে এর ধ্বংসযজ্ঞ তুলনামূলকভাবে কম। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা গত আড়াইশ বছরেও কখনো এমন প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েনি বলে জানিয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো। আম্পানের তাণ্ডবে কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং হাওড়া জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ল-ভ- হয়ে গেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা।  রাজ্যটিতে এরই মধ্যে প্রায় শ’খানেক মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।  বাংলাদেশেও আম্পানের তাণ্ডবে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। বুধবার দুপুরের মধ্যেই উপকূলের প্রায় ২৪ লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে পারায় এবার প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এজন্য এবার আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বাড়িয়ে ১৪ হাজার ৬৩৬টি করা হয়েছিল।  সময়োচিত এই তৎপরতার জন্য জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা কমিটি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা অবশ্যই কৃতিত্বের দাবিদার।

প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ ও বনাঞ্চলের।  স্থানীয় সংবাদদাতা ও বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এত বিপুলসংখ্যক গাছপালা উপড়ে যেতে, ফসলের এমন ক্ষতি হতে তারা কেউই আগে দেখেননি। কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বৃহস্পতিবার বিকেলে অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ১ লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ইতিমধ্যে অধিকাংশ ধান কেটে ফেলায় বোরোর ক্ষতি কম হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমের, বিশেষ করে সাতক্ষীরায়। এ ছাড়া লিচু, ভুট্টা, পাট, পান, সবজি, চীনাবাদাম, তিল, কলা, পেঁপে, মরিচসহ অন্যান্য ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপকূলীয় এলাকাসহ ৯ থেকে ১৭টি জেলায় এলাকাভেদে কৃষির ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে হয়তো আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে। এ ছাড়া কাঁচা বাড়িঘরসহ রাস্তাঘাট, বাজার, দালানকোঠার ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও করতে হবে। স্থানীয় জনসাধারণ, বিশেষত

কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। করোনা মহামারীর বিপদে থাকা প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের আম্পানের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনে ঈদের আগেই নগদ অর্থ সহায়তা করা যেতে পারে।

সুপার সাইক্লোন আম্পানে এবার উপকূলীয় এলাকায় ১০-১২ ফুট উঁচু যে জলোচ্ছ্বাস স্থলভাগকে প্লাবিত করেছে তা সত্যিই ভীতিকর। প্রবল জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে এবং ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে।  প্রাথমিক হিসাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সেখানকার বিভিন্ন বেড়িবাঁধের প্রায় দেড়শ কিলোমিটারের কোথাও পুরোপুরি আবার কোথাও আংশিক বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।  ফলে এখনো উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন অঞ্চলে জোয়ারের পানি বইছে এবং নানা স্থানে সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এসব বেড়িবাঁধ যে উপকূলীয় এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা ও ঘরবাড়ির জন্য খুবই জরুরি সেটা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। বছরের পর বছর ধরে জোড়াতালি মেরামতের মধ্য দিয়ে সাময়িক সমাধান করা হলেও উপকূলীয় মানুষেরা দীর্ঘদিন ধরেই এই সংকটে রয়েছেন। প্রাথমিকভাবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ স্থানীয় জনসাধারণকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে নিজেদের বসতবাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া। সেক্ষেত্রে অবশ্যই এলাকাভেদে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুর্গতদের মধ্যে যথোচিত ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

আম্পানের তাণ্ডবে এবার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ এবং টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরবরাহ লাইন ভেঙে পড়ায় ওই অঞ্চলের প্রায় ২ কোটি ২০ লাখের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, যা দেশের মোট গ্রাহকের প্রায় ৬০ শতাংশ।  এর মধ্যে গ্রিড সাব স্টেশনে আগুন লাগায় কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলা দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। এ কারণে সেখানকার ১৩ হাজার মোবাইল ফোন টাওয়ার জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দ্রুতগতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ মেরামত করতে না পারলে সেসব এলাকায় টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থেকে যাবে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাত থেকে রক্ষায় এবারও সুন্দরবনের

প্রাকৃতিক প্রাচীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। এবার সুন্দরবনের গাছপালা, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ-প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানা গেছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে চারটি কমিটিও করেছে সরকার। তবে, বারংবার প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করা সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার কথা চিন্তা না করলে কেবল সাময়িক ক্ষতি নিরূপণ আর পদক্ষেপে প্রকৃতির এই আশীর্বাদকে যে রক্ষা করা যাবে না সেটা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করা জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত