কভিড-১৯ বা করোনা মহামারী গ্রাস করেছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অঞ্চল ও দেশ। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। যে কোনো বস্তু বা ঘটনার দুটো দিকই থাকে। একদিকে আশঙ্কা অন্যদিকে আশা এই নিয়েই তো মানুষের জীবন চলছে অবিরাম। সমাজেও তাই। করোনার আতঙ্ক আবার আশা জাগিয়েছে একদল মানুষের মনে। এ আশা লাভের এবং লোভের। অর্থনীতির ভাষায় বললে বলতে হয়, মুনাফা বাড়ানোর আশা। এর সঙ্গে যুক্ত তারাই, মানুষের অসহায়ত্ব যাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি। চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়াও, ধানসহ কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দাম কমাও, ওষুধ ও চিকিৎসার খরচ বাড়াও, শ্রমিকের মজুরি ও বোনাস কমাও, খরচ কমানোর জন্য শ্রমিক ছাঁটাই করো এবং যাদের ছাঁটাই করা হবে না তাদের ওপর কাজের বোঝা বাড়াও। অর্থাৎ মহামারীর সমস্ত দায় চাপুক সাধারণ মানুষের ওপর। তাদের একমাত্র অপরাধ তারা সাধারণ মানুষ এবং তাদের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা যে তারা সবকিছু মেনে নেয় বা সহ্য করে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় রাষ্ট্রের কোষাগার পূর্ণ হয়, কোষাগার পূর্ণ করতে কিছুটা কম পড়লে তখন রাষ্ট্র ঋণ নেয় এবং সে ঋণ ও সুদ আবার পরিশোধ করা হয় জনগণের ট্যাক্সের টাকাতেই। সেই কোষাগারে জনগণের অধিকার কতটুকু? ব্যবসা-বাণিজ্যে ভেরি ইম্পরট্যান্ট পারসন বা ভিআইপিদের জন্য বরাদ্দ করতে করতে জনগণ যে কখন অন্য ধরনের ‘ভিআইপি’ বা ‘ভেরি ইগনোরড পারসন’ হয়ে যায় তা বুঝতেও পারে না। বুক ভাঙা হতাশায় সাধারণ মানুষ বলে, বাঁচার রাস্তা তো দেখি না!
অন্ধকার যত গভীর হয় আলোর প্রত্যাশাও তত তীব্র হয়ে ওঠে। ঘন অন্ধকারে অসহায়ের মতো বসে থাকলে বা অন্ধকারকে ভয় পেয়ে কুঁকড়ে গেলে অথবা অন্ধকারের ভয়াবহতা নিয়ে ব্যাপক বিষোদগার করলে অন্ধকার দূর হয় না। বরং নিজেদের ক্ষমতা ও সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটে। তখন কাউকে না কাউকে আলো জ্বালতে হয়। সে আলো যত ক্ষুদ্র শিখাই হোক না কেন তা অনেক মানুষকে সাহসী করে, নতুন করে পথ দেখতে বা পথ রচনা করতে শেখায়। প্রকৃতি ও প্রাণীর বিবর্তনের ইতিহাস যতটুকু আমাদের জানা, তাতে এই কথাটাই যুক্তিগ্রাহ্য যে মানুষ ক্রমাগত উন্নততর মানুষ হয়ে উঠেছে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই। অতীতের মানুষের চেয়ে বর্তমানের মানুষ দক্ষতায় যোগ্যতায় এবং ক্ষমতায় যে এতটা এগিয়েছে তার পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল সমস্যার কার্যকারণ বুঝতে চাওয়া আর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানোর প্রবল চেষ্টা। এক্ষেত্রে একদল মানুষের সাধনা গোটা মানবজাতিকে শুধু প্রতিকূলতার হাত থেকে রক্ষা করেছে তা নয় মানবজাতির বিকাশকে ধাপে ধাপে এগিয়ে দিয়েছে। সম্পদের দখল নেওয়ার জন্য মানুষ মানুষকে যেমন শত্রু ভেবেছে, পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়েছে, লুণ্ঠন, খুন, ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছে তেমনি কত শত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, সামাজিক দায়বোধের পরিচয় যে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়িয়েছে এবং মানুষের বাড়ানো হাত ধরেই মানুষ এগিয়েছে সম্ভাবনার পথে। পেছনে ফেলে গেছে দুঃসহ অতীতের স্মৃতি। অতীতের এই সব বিপর্যয়ের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েছে বলেই মানুষ যে কোনো জটিল পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে হতচকিত হলেও সে ঘুরে দাঁড়ায় এবং পরিস্থিতির মোকাবিলা করে।
এবার করোনাভাইরাসে কভিড-১৯ রোগের সংক্রমণেও বিশ্ব হতভম্ব হয়ে গেছে। যতটা হতভম্ব হয়ে পড়েছে ভাইরাসের সংক্রমণের তীব্রতায় তার চেয়ে বেশি হয়েছে জনগণের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হতদরিদ্র দশা দেখে। ডিসেম্বর ২০১৯-এ প্রথম চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়ার সংবাদ প্রচারের পর ৫ মাসে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় প্রতিটি দেশে। আমেরিকা আর চীনের দোষ চাপানো আর দোষ অস্বীকারের মধ্যে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠল আমেরিকাসহ সমস্ত পুঁজিবাদী দেশগুলোর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল চিত্র আর কিউবার মতো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উজ্জ্বল দিক। দেশের বিজ্ঞান গবেষণায় সহযোগিতার ক্ষেত্রে অবহেলার ফল দেখা গেল এবার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার বরাদ্দ কত করা হয় বের করার জন্যও যেন গবেষণা প্রয়োজন। কৃষিতে বরাদ্দ ৩ দশমিক ৫ শতাংশের ওপরে না উঠলেও এই করোনাকালে কৃষির ওপরই নির্ভর করতে হবে সবচেয়ে বেশি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানুষের বিশেষত যুব সমাজের মানসিকতার। ‘নিজেকে নিয়ে ভাবো’, ‘নিজের জন্য বাঁচো’, ‘সমাজের কথা ভেবে নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট কোরো না’ এসব আপ্তবাক্যই তারুণ্যের সামনে আছে। যেন ‘কতটা আকর্ষণীয় হতে পার তুমি’, ‘গায়ের রঙের উজ্জ্বলতায় আর পোশাকের বর্ণের ছটায় সে-সবই হবে এখনকার তরুণ-তরুণী আর যুবকদের ধ্যানজ্ঞান। ইন্টারনেটে যুক্ত করো দূরের মানুষকে, কিন্তু উপেক্ষিত থাকুক কাছের স্বজন। একটা স্বচ্ছ কাচের দেয়াল ঘেরা কৃত্রিম সভ্যতা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে সবাইকে দেখা যাবে কিন্তু স্পর্শ করা যাবে না। করোনা এই দেয়াল ভাঙার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে দিল বিশ্ববাসীকে।
এই দেয়াল ভাঙতে এগিয়ে এলো সেই তরুণ যুবকরা যারা শুধু বয়সে তরুণ নন চেতনাতেও তারুণ্যের প্রতিধ্বনি করেন। এগিয়ে এলো বিদ্যানন্দ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়নসহ অনেক সংগঠন। বরিশালে মনীষা, রুমন’রা মাত্র ৩০ হাজার টাকা আর দায়িত্ববোধকে সম্বল করে এগিয়ে এসেছিল। প্রথমে এক মুঠো চাল সংগ্রহ ও তা কর্মহীন দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ, তারপর রোগী পরিবহনের জন্য সস্তা ও সহজলভ্য অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ, তারপর মানবতার বাজার এরপর কৃষক ও কৃষি সহায়তামূলক কর্মসূচি নিয়ে ৫০ দিন অতিবাহিত করেছে তারা। দেশের এবং প্রবাসের অনেক মানুষ নাম প্রকাশ না করে এই কর্মসূচিগুলোতে অর্থ সহায়তা করেছে। এই দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে পড়েছে ভেড়ামারাসহ অনেক জায়গায়। নারায়ণগঞ্জে প্রায় শূন্য হাতে কম্যুনিটি কিচেন-এর নামে হতদরিদ্রদের একবেলা খাওয়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে নিখিল, বিপ্লব, সেলিম। প্রতিদিন প্রায় ৫ শতাধিক মানুষকে রান্না করে খাওয়ানোর দুরূহ দায়িত্ব পালন করছে সুলতানা, মুন্নির মতো স্বেচ্ছাসেবীরা। সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে অনেকেই, ফলে ১৫ দিন ধরে চলছে কম্যুনিটি কিচেন এবং এই ধরনের উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ছে অনেক স্থানে। দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, সিলেট, খুলনা, চট্টগ্রামসহ প্রতিটি বিভাগে ও জেলা উপজেলায় তরুণ-যুবকরা এগিয়ে এসেছে এবং সাধারণ মানুষের সাড়া পেয়েছে। ঘরে থাকো এবং নিরাপদে থাকো এর বিপরীতে সাধারণ মানুষকে ঘরে রাখো ও দরিদ্র মানুষকে বাঁচিয়ে রাখো এই মনোভাব নিয়ে, করোনার ঝুঁকিকে মাথায় নিয়ে, যথাসম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করে যে তরুণরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের হাত ধরে বাংলাদেশ ভবিষ্যতের পথে এগুবে।
আমরা মুক্তিযুদ্ধের উদাহরণ দিতে ভালোবাসি কিন্তু শিক্ষাটাকে সযতেœ আড়াল করে রাখি। কারণ মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছিল তরুণ-যুবক এবং শ্রমিক-কৃষকসহ সাধারণ মানুষ। স্বাধীন দেশে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়েছে তারাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি শোষকদের প্রতি ঘৃণার অপর পিঠে জনগণের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ছিল যোদ্ধাদের মনে। আজও করোনা দুর্যোগকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে যারা শ্রমিক-
কৃষক সাধারণ মানুষের ওপর দুর্ভোগ চাপিয়ে দিচ্ছে তাদের প্রতি শুধু ঘৃণা নয় তাদের প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে তরুণ-যুবকদের এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
