বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও গবেষক জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগ্রামে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশেও বাঙালিকে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে। ভাষা আন্দোলন প্রজন্মের এক প্রাগ্রসর প্রতিনিধি হয়ে জাতিগঠনের এই সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী হিসেবে যেমন তিনি সক্রিয় ছিলেন, তেমনি নিজের মেধা ও মননের অনন্যস্বাক্ষর রেখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমাদের জাতীয় জীবনের এক অনন্যদিশারি। সর্বজনশ্রদ্ধেয় ড. আনিসুজ্জামানকে বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালে জাতীয় অধ্যাপক ঘোষণা করে। সেই ঘোষণার পর একই বছরের আগস্ট মাসে সাংবাদিক নবনীতা চৌধুরী ড. আনিসুজ্জামানের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য সদ্য প্রয়াত ড. আনিসুজ্জামানের সাক্ষাৎকারটির দ্বিতীয় ও শেষ কিস্তি আজ প্রকাশিত হলো
নবনীতা চৌধুরী : এই যে আপনি বললেন আমরা যে শান্তিপ্রিয় জাতি সেই অভিধা এখন বাতিল করতে হবে, তাতে মনে হলো ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’! কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে কী ভয়াবহ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, আমরা কী করে বলি যে আগে আমরা সহনশীল শান্তিপ্রিয় জাতি ছিলাম? এরপরে আরেকজন রাষ্ট্রপ্রধানকেও তো হত্যা করা হয়েছে?
আনিসুজ্জামান : এ কারণেই আমি বলছি যে আমাদের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হচ্ছে কি না। যেমন ধরো, দাম্পত্য বিপর্যয়ের কথা। ঝগড়াঝাঁটির পর্যায়ে তো শুধু সীমাবদ্ধ থাকছে না, হত্যা করে ফেলা হচ্ছে। একটা ছোট জিনিসের জন্য এক সভাপতি আরেক সভাপতিকে মেরে ফেলছে। কিশোর বয়স্ক একজন আরেকজনকে হত্যা করছে। অথচ বাংলাদেশ হওয়ার আগে দেখতে পাওয়া যাবে না যে, স্কুলের ছেলেরা একজন আরেকজনকে হত্যা করেছে। আগে ডাকাতি হতো। কিন্তু এই যে পরিকল্পিতভাবে একজনকে বা সাতজনকে কিংবা দশজনকে হত্যা করার বিষয়টি বাংলাদেশ হওয়ার পরই ঘটছে।
নবনীতা চৌধুরী : আপনি এ ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী যে, আমরা এমনটা ছিলাম না?
আনিসুজ্জামান : এটা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, এমনটা ছিলাম না। এই যে তুমি বললে, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ সে জন্য না। তুমি যদি ১৯৬০-এর দশকের একটা বছরের দিকে তাকাও, তাহলে দেখবে যে চুরি, ডাকাতি, অপহরণ হয়েছে, কিন্তু একজন আশ্রিত আত্মীয় তার আশ্রয়দাতাকেই খুন করে ফেলছে, এমন ঘটনা ঘটেনি।
নবনীতা চৌধুরী : বিষয়টির সঙ্গে কী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা জড়িত? আমাদের টাকা-পয়সা বেড়েছে, একজনের মাথায় বাড়ি মারলেই, আরও ভালো কিছু পাওয়া যাচ্ছে, সে জন্য?
আনিসুজ্জামান : তাহলে তো বলতে হবে, লোভটা বেড়েছে। অর্থাৎ চারিত্রিক বদল ঘটেছে। আগে কী হতো? বিয়েতে ছেলে বা মেয়ে পছন্দ না হলে, বাবা-মা বলত যে, তোর মুখ দেখব না। আর এখন কাগজে দেখছি, ১ কোটি টাকা খরচ করে জামাইকে অপহরণ করা হচ্ছে। এটা আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না। আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যে বদল হচ্ছে, এটা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু কেন বদল হচ্ছে, এটা আমি বুঝতে পারি না। এর সঙ্গে উন্নয়নকে যুক্ত করা কঠিন। কেননা, নানা দেশেই তো উন্নয়ন ঘটেছে। উন্নয়নের সঙ্গে আর্থিক বৈষম্যের বিষয়টি জড়িত থাকে। উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু উন্নয়নের লাভটা সমভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। কিন্তু উন্নয়নের সঙ্গে যে অপরাধের সংযোগ, আমাদের এ বিষয়টি মনে হয় নতুন। এটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
নবনীতা চৌধুরী : আপনি যে বলছেন আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নেতিবাচক বদল ঘটছে, তাহলে এ ব্যর্থতাটা কার? রাজনীতিকদের না সবার?
আনিসুজ্জামান : এটা সবার। বাবা-মা যেভাবে ছেলেমেয়েদের মানুষ করছে, তার মধ্যেও গলদ আছে। এখন দেখা যায়, ছেলেমেয়েদের জন্য বাবা-মায়ের সময় থাকে না। সময় থাকলে দেখা যাচ্ছে যে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছে, তারপর কোচিং সেন্টার এবং সবশেষে বাসায় পড়াশোনা। অর্থাৎ তার যে একটা জীবন আছে, খেলাধুলা বা সংস্কৃতিচর্চার জন্য তার যে আলাদা সময় দরকার, সেটা তারা অনুভব করছে না। স্কুলের ছেলেমেয়েরা মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো করছে। অর্থাৎ জ্ঞানটা চর্চিত হচ্ছে না। তাদের মূল্যবোধ যে ঠিক পথে যাচ্ছে, এটা না-ও হতে পারে।
নবনীতা চৌধুরী : আপনি বলছেন, আমাদের সমাজে যেমন সহিষ্ণুতা কমেছে, রাজনীতিতেও আরেকজনের মত বা সমালোচনা শোনার চর্চা কমে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা বিভাগে সরাসরি আপনার ছাত্রী। আপনি রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে, মঞ্চে তার পাশে বসেন। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা নেই, বিরোধী মত দমন করা হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন কি না? মানে সরাসরি যদি জিজ্ঞেস করি, আপনার ছাত্রী যথেষ্ট পরমতসহিষ্ণু বলে আপনি মনে করেন কি না?
আনিসুজ্জামান : একটা সংশোধন করি, আমি কিন্তু রাজনৈতিক সমাবেশে যাই না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাকে যতবার দেখেছ, হয়তো সেগুলো শিক্ষার কোনো ব্যাপার কিংবা বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের কোনো বিষয়। রাজনৈতিক সমাবেশ আমি বরাবর এড়িয়ে চলেছি। আমি আলাদা করে শেখ হাসিনা সম্পর্কে বলতে কুণ্ঠাবোধ করি। তবে এটা ঠিক, হাসিনা যেভাবে তার পরিবারের সবাইকে হারিয়েছে, তার ফলে তার মনে একটা গভীর ক্ষত আছে এবং তার থেকে অনেক সময় একটা তিক্ততা বেরিয়ে আসে। কিন্তু সাধারণভাবে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা যদি বলি, আগে যেটা বলেছিলাম সহিষ্ণুতার অভাব, তার সঙ্গে যোগ করি সৌজন্যের অভাব। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতা আমার বাড়িতে আসছেন, আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম মুখের ওপর। কিংবা আমার বিরোধী রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে এমন কিছু বললাম, যার ভিত্তি আমি স্পষ্ট করলাম না। এটা তো গণতন্ত্রে সমর্থনযোগ্য নয়। এখন যে তথ্যপ্রযুক্তি আইন হয়েছে, ‘৫৭ ধারা’, অনেককে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, এটা আমাদের কাছে সব সময় খটকা লাগায় যে আমরা আইনের প্রয়োগ করছি না অপপ্রয়োগ করছি। রাষ্ট্রের কাছে যে তথ্য আছে, আমার কাছে নেই। কাজেই আমার দৃষ্টিতে মনে হয়েছে, অনেক সময় অল্প অপরাধে গুরুদ- হয়ে যাচ্ছে কিংবা রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন এবং সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সীমারেখাটা থাকছে না ঠিকমতো। এই সমস্যা যেকোনো একটা দলের নয়। এখানেই আমাদের দুর্বলতা। আমরা ভালো জিনিসটা যত না অনুকরণ করেছি, তার চেয়ে বেশি মন্দ জিনিসটা অনুসরণ করেছি। স্বৈরাচারী সরকার যা করতে পারে, গণতান্ত্রিক সরকার তা করতে পারে না। এটা আমাদের বুঝতে হবে। গণতন্ত্রের জন্য নতুন উদাহরণ স্থাপন করতে হবে।
নবনীতা চৌধুরী : দেশভাগের পর থেকে আপনি এই ভূখণ্ডের সব উত্থান-পতন দেখেছেন। কীভাবে পরিমাপ করেন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে?
আনিসুজ্জামান : পাকিস্তান আমলের অগ্রযাত্রার মাইলফলক যদি বলো, তাহলে সেগুলো হলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন, ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলন, ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন এবং সর্বশেষ মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর এই দীর্ঘ সময়ে আমরা উন্নয়নমূলক কাজ অনেক করেছি। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, তরিতরকারিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে এবং জনসাধারণের মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা ছিল, সুপ্ত শক্তি ছিল, তাকে জাগানো গেছে। চাষি যে তিন-চার গুণ ফসল ফলাচ্ছে, তার এই ক্ষমতা ছিল, কিন্তু আগে সুযোগটা পায়নি। এরপরও দুটি সমস্যা রয়ে গেছে। একটা হচ্ছে আমরা দারিদ্র্য সম্পূর্ণ ঘোচাতে পারিনি। দারিদ্র্যের সংখ্যা কমেছে, কিন্তু পুরোটা ঘোচাতে পারিনি। এটি আমাদের ঘোচাতে হবে। আরেকটি হলো, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হবে। এই দুটো কাজ করতে হবে। উন্নয়নের জন্য আমরা রাজনীতিবিদদের, বিশেষ করে এই সরকারকে ধন্যবাদ জানাব। পদ্মা সেতুর মতো একটা ব্যাপার আমরা নিজেদের পয়সায় করে ফেলতে পারছি, এটা সাধারণ কথা নয়। তারপরও আমাদের দারিদ্র্য ঘোচাতে হবে সম্পূর্ণভাবে, দেশের মানুষকে ১০০ ভাগ স্বাক্ষর করতে হবে এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হবে।
নবনীতা চৌধুরী : দারিদ্র্যের চেয়ে বৈষম্যটা কি বেশি চোখে পড়ে? নাকি বৈষম্যও কমে এসেছে?
আনিসুজ্জামান : বৈষম্যটা তুমি কাগজ-কলমে স্পষ্ট দেখতে পাও। সমাজের একটা পর্যায়ের আয়ের সঙ্গে নিচের পর্যায়ের আয়ের পার্থক্যটা অনেক বেড়েছে। কিন্তু এটা ঠিক, এখন কেউ না খেয়ে নেই, এখন কেউ না পরেও নেই। স্কুলেও যাচ্ছে অনেক। কিন্তু ব্যবধানটা রয়ে গেছে। আমার ধারণা, ব্যবধানটা কমবেও। সব দেশের অভিজ্ঞতা কিন্তু এ রকমই। উন্নয়ন যখন হয়েছে, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানটাও আনুপাতিকভাবে বেড়েছে। এটা কমাতে হবে, সাক্ষরতা শতভাগ করতে হবে এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হবে।
নবনীতা চৌধুরী : একটা বিরাট সংখ্যক নারী তো গত কয়েক দশকে বেরিয়ে এসেছেন। নারীরা কর্মশক্তিতে যোগ দিয়েছেন। নারী শিক্ষার হার বেড়েছে। আমার খুব জানার ইচ্ছা, যে দেশে এত বিপুলসংখ্যক নারী বেরিয়ে এসেছেন, সে দেশটাকে কি চাইলেই যাকে আমরা বলি উল্টোপথে হাঁটানো, সেটা কী সম্ভব?
আনিসুজ্জামান : না, সহজ নয়। বাংলাদেশে নারীদের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। নারীর গড় আয়ু পুরুষের চেয়েও বেড়েছে। নারীর কর্মক্ষমতা বেড়েছে। এই যে আমাদের পোশাকশিল্প, যেটা থেকে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছি, সেটা তো মূলত মেয়েরাই চালাচ্ছে। ফসলের ক্ষেত থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত নারীর অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সুতরাং এই নারীকে অন্তঃপুরে ঠেলে দিয়ে কিছু করা অসম্ভবপর হবে।
নবনীতা চৌধুরী : এই যে আমরা নতুন প্রজন্মের অনেককে জামায়াত-শিবির আখ্যা দিচ্ছি। বাবা-দাদার রাজনৈতিক পরিচয়ে সেই যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করছি। কথায় কথায় ‘পাকিস্তানের প্রেতাত্মা’ ফিরে আসার আশঙ্কা করছি, এটা কী বাস্তব ভয় নাকি জুজুর ভয়?
আনিসুজ্জামান : এটা আসলে জুজুর ভয়। জামায়াত-শিবিরের যারা অনুসারী, তারা সংখ্যায় খুব সামান্য। তুমি যদি সাধারণ নির্বাচনের দিকে লক্ষ করো, তাহলে সেটা শতকরা ৮ ভাগের বেশি নয়। কাজেই আমাদের ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু ভয়ের অন্য ক্ষেত্র আছে। এই যে ইসলামি সন্ত্রাসবাদ আরম্ভ হলো। জঙ্গি সন্ত্রাসবাদ। এটা এমন একটা জিনিস যা আগে বাংলাদেশে ছিল না। এটা আমাদের দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলছে। এদেরই আমি প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রের শত্রু মনে করি। এরা বাংলাদেশের মূলে আঘাত করছে। তাদের প্রত্যাঘাত করতে হবে। আইনে তাদের যে প্রাপ্য শাস্তি, সেটা তাদের দিতে হবে। জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে তাই আমি যতটা ভয় না পাই, তার চেয়ে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি ছেড়ে এসে যারা জঙ্গি হচ্ছে, তাদের কাজকর্মে অনেক বেশি ভয় পাই।
নবনীতা চৌধুরী : আপনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজ করেছেন। আবার ১৯৫০-এর দশক থেকে আপনি তাজউদ্দীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আপনার কাছে কি মনে হয় বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ সঠিক পথে এগোচ্ছে? এই সোনার বাংলার চেহারাটা আপনার কাছে কেমন?
আনিসুজ্জামান : বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা নিশ্চয়ই সমৃদ্ধির বাংলা। সেই সমৃদ্ধির পথে আমরা এগিয়েছি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আরও মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশের বাংলা। সেখানে আমরা পৌঁছাতে পারিনি।
নবনীতা চৌধুরী : কেমন মুক্ত পরিবেশ?
আনিসুজ্জামান : এই যে বললাম সহনশীলতা।
নবনীতা চৌধুরী : বঙ্গবন্ধুর জীবনে কী আপনি এর চর্চা দেখেছেন?
আনিসুজ্জামান : বঙ্গবন্ধুর জীবনে দেখেছি। বঙ্গবন্ধু যখন ক্ষমতায় এলেন, তখন যেসব মানুষ একাত্তর সালে রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন, খুনোখুনি না, তারা জেলে ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তাদের খবর নিয়েছেন। তারা জেল থেকে বেরোনোর পর তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছেন। এখানে তার অসম্ভব উদারতা ছিল।
নবনীতা চৌধুরী : কিন্তু লাভটা কী হলো? তারপরে তো ষড়যন্ত্রের রাজনীতিও হলো, তাকে মরতেও হলো।
আনিসুজ্জামান : কিন্তু তিনি তো রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে গেলেন। তিনি মৃত্যুঝুঁকি সত্ত্বেও, এমন ব্যবস্থা নেননি, যাতে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হন। আর তাজউদ্দীন ছিলেন কর্মবীর। তিনি গঠন করতে পারতেন। যে জন্য বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু মানুষকে সঙ্গে নেওয়ার মতো ক্ষমতা তার ছিল না। বঙ্গবন্ধু জনসভায় দাঁড়িয়ে কথা বললে সমস্ত মানুষ যেমন সাড়া দিত, তাজউদ্দীনের মধ্যে সেটা ছিল না। তিনি গোলটেবিল বৈঠকে বা মুখোমুখি কথাবার্তায় অনেক ভালো ছিলেন। কিন্তু এই দুজনই দেশকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। সেটা যদি পরবর্তী প্রজন্ম পারে, তাহলে আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করব।
নবনীতা চৌধুরী : সে ধরনের রাজনৈতিক সামাজিক অঙ্গীকার দেখেন কি?
আনিসুজ্জামান : আমরা এগোচ্ছি এবং পেছাচ্ছি। আমরা সমৃদ্ধির দিকে যাচ্ছি কিন্তু আদর্শের ক্ষেত্রে পেছাচ্ছি। আমরা বেশ কিছু আপস করেছি দক্ষিণপন্থি রাজনীতি যারা করেন তাদের সঙ্গে। শিক্ষার ক্ষেত্রে এটা আমরা দেখি। এই রাজনীতি আমাদের সামনের দিকে নিয়ে যাবে না।
সাক্ষাৎকারের প্রথম কিস্তি: বাঙালি যে শান্তিপ্রিয় ও সংস্কৃতিপ্রিয় জাতি তা আর দেখা যাচ্ছে না
