কভিড-১৯ মানুষকে গৃহবন্দি করে ফেলেছে। চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া এই মহামারী গোটা বিশ্বকে নাকাল করে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মুসলমানরা এক মাস রমজান পালন করেছেন ও ঈদ উদযাপন করেছেন।
মুসলমানদের রমজানের রোজাপালন ও ঈদ উদযাপন অনুষ্ঠান সর্বস্ব কোনো আচার-অনুষ্ঠান নয়। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও বটে। রমজানের শিক্ষা ও ঈদের বৈশিষ্ট্য শাশ্বত, এর আদর্শ চিরন্তন এবং এর আবেদন অনাবিল। এসবের তাৎপর্য অনুধাবন করে মৌলিক আদর্শ মূল্যায়ন করে জীবন পরিচালনায় সক্ষম যারা, তারাই সফল মানুষ। তাইতো বারবার বলা হয়েছে, এসবের শিক্ষা অনুসরণ করে নিজেদের জীবনকে সার্থক এবং সাফল্যম-িত করতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান বাস্তবতায় রমজান ও ঈদের যথার্থ আদর্শ কতটুকু গ্রহণ করা হয়েছে?
আমরা জানি, ঈদের সুদূরপ্রসারী আবেদন হচ্ছে- ভ্রাতৃত্ববোধ ও ব্যাপক ঐক্য স্থাপন। সে হিসেবে করোনাভাইরাস মহামারীর মাঝে পালিত এবারের ঈদ হওয়ার কথা ছিল- আরও ভ্রাতৃত্ববোধ, সাম্য, মুসলিম ঐক্য-সংহতি এবং মানবতাবাদ তথা মানব কল্যাণের এক অপূর্ব নিদর্শনস্বরূপ। কিন্তু বাস্তবে কি তা হয়েছে? এই হওয়া না হওয়ার হিসাবটা অত্যন্ত জরুরি।
কারণ রমজান মাসকে বলা হয় প্রশিক্ষণের মাস। রমজানের প্রশিক্ষণকে কাজে লাগাতে হয় সারা বছর। ইসলাম মনে করে, রমজান মুসলমানদের জীবনে পরিবর্তন আনার মোক্ষম সুযোগ। তাই রমজানের পর পরিবর্তিত জীবনে ফিরে যাওয়া রমজানের দাবি। কেননা রোজা নিছক উপবাস থাকা, পানাহার ও কামাচার বর্জনের নাম নয়। এর বিশেষ তাৎপর্য ও দর্শন রয়েছে। রয়েছে এর দৈহিক, আত্মিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপকারিতা। এসব কিছুকে নিজের ভেতরে ধারণ করতে হবে।
হজরত আশরাফ আলী থানভি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও আবেগের ওপর বিবেকের সর্বদা প্রভাব বিস্তার করা উচিত। কিন্তু মানবীয় দুর্বলতার কারণে অনেক সময় বিবেকের ওপর মানুষের আবেগ প্রাধান্য লাভ করে। তাই আত্মশুদ্ধি ও আত্মজাগৃতির জন্য ইসলাম রোজাকে মৌলিক ইবাদতগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছে। রোজা রাখার দ্বারা মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও আবেগের ওপর বিবেক পরিপূর্ণভাবে বিজয়ী হয়। এতে তাকওয়ার গুণাবলি অর্জিত হয়। রোজার মাধ্যমে মানুষের নিজের অক্ষমতা ও অপারগতা এবং আল্লাহতায়ালার বড়ত্ব ও কুদরতের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। রোজার মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়, দূরদর্শনের ধারণা প্রবল হয়। আসবাব ও উপকরণের হাকিকত খুলে যায়। পাশবিকতা ও পশুত্ব অবদমিত হয়। ফেরেশতাদের নৈকট্য লাভ হয়। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়ের সুযোগ হয়। অন্তরে মানবিকতা ও সহমর্মিতার বন্যা বয়ে যায়। রোজা দেহ-আত্মার সুস্থতার কারণ। রোজা মানুষের জন্য এক রুহানি খাদ্য, যা পরকালে মানুষের জন্য খাদ্যের কাজ দেবে। সর্বোপরি রোজা আল্লাহর ভালোবাসার অন্যতম নিদর্শন।’ -আহকামে ইসলাম আকল কি নজর মে : ১৪৩-১৪৫
রমজানের রোজা মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে চলার শিক্ষা দেয়। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি ও অহংবোধ ভুলে গিয়ে সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধিশালী সমাজ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। মানুষকে পার্থিব লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের লোভ-লালসা থেকে দূরে সরিয়ে রেখে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। রোজা মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ, মিতাচার, মিতব্যয়িতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার শিক্ষা দেয়। এ শিক্ষাগুলোকে ধারণ করার পাশাপাশি রমজানে আদায়কৃত অন্য ইবাদতগুলোরও ধারবাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে সারা বছর।
রমজান ইবাদতের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। কোরআনে কারিমের সঙ্গে ভালোবাসা স্থাপন করে। হালাল উপার্জনের প্রেরণা দেয় এবং পরিশ্রমের মানসিকতা তৈরি করে। রমজানের এ সর্বব্যাপী শিক্ষার আলোকে সারা বছর নিজের জীবন পরিচালিত করতে না পারলে নিছক উপবাস থাকা ছাড়া রমজানে আমাদের আর কোনো অর্জন নেই। আমরা যদি রমজান ও রোজার পুরো হক আদায় না করে থাকি, তাহলে তাকওয়ার সেই বিশেষ স্তর আমাদের অর্জিত হয়নি। এই ঘাটতি পূরণে ইবাদত-বন্দেগির পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, গোনাহ যখনই করা হোক- তা গোনাহ। তাই রমজান মাস চলে গেলে গোনাহর কাজে লিপ্ত হওয়া যায়- এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। সব ধরনের মন্দ পথ পরিহার করতে হবে। নিয়মিত নামাজ আদায় করতে হবে। নামাজ রোজার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ফরজ। এটি প্রতিদিনের আমল। ইমান ও ইসলামের নিদর্শন। হালাল রুটি-রুজির সন্ধানের মশগুল হতে হবে। দোয়া কবুলের পূর্বশর্ত হালাল রুজি। সর্বাবস্থায় হারাম পথে অর্জিত উপার্জনের রুজি পরিহার করতে হবে। অথচ আমরা তা কতটুকু করছি? উপার্জনের যেন কোনো বালাই নেই। নেই বিচার-বিবেচনা। দুনিয়ার সমৃদ্ধির জন্য হারাম পথে উপার্জন করা হচ্ছে। এই অবৈধ উপার্জন নিয়ে অহঙ্কারের শেষ নেই। মনে রাখবেন, সম্পদের জন্য লাগামহীন প্রচেষ্টা সামাজিক অনেক অনাচারের কারণ। এমন মনোভাব অবশ্যই পরিত্যাজ্য। এই বিষয়গুলো হৃদয়ে ধারণ করতে পারলে রমজানের রোজা পালন ও ঈদ উদযাপন সার্থক বলে ধরে নেওয়া হবে।
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক
