‘লকডাউন’ আর দীর্ঘায়িত না করে সরকার এখন স্বাস্থ্য সচেতনতার ওপর ভর করে করোনা মোকাবিলায় গুরুত্বারোপ করছে। এর অংশ হিসেবে শর্তসাপেক্ষে সীমিত আকারে সব অফিস খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ৩১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সীমিত আকারে চলবে গণপরিবহনও। এ অবস্থায় সরকারের একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে স্বীকার করলেও অর্থনীতি বাঁচানোর যুক্তি তুলে ধরে ‘লকডাউন’ তুলে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদেরকে স্বাস্থ্য সচেতনতার দিকে নজর দিতে হবে। মেনে চলতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। মুখে জনসচেতনতায় আস্থাই এখন সরকারের ভরসা
মাস্ক পরা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। ভ্যাকসিন যেহেতু আবিষ্কার হয়নি, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অনেকটা নিরুপায় হয়ে সরকার লকডাউনের বিকল্প এসব উপায় খুঁজে বের করেছে।’
এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনির্দিষ্টকাল ধরে লকডাউন পদ্ধতি অনুসরণ করা যাবে না। তাহলে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। মানুষের জীবন যেমন বাঁচাতে হবে, জীবিকার ব্যবস্থাও সরকারকে করতে হবে। দুটি বিষয় মাথায় রেখেই সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি, সরকার সফল হবে।’ নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের অর্থনীতির কথাও ভাবতে হবে। অনির্দিষ্ট সময় ধরে লকডাউন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখলে ধ্বংস হয়ে যাবে দেশের অর্থনীতি। ঝুঁকি থাকলেও অর্থনীতির কথা, জীবিকার কথা চিন্তা করে সীমিত আকারে সবকিছু খুলে দেওয়ার চিন্তা করতে হচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে একাধিক মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানুষকেও বাঁচাতে হবে, অর্থনীতির চাকাও সচল রাখতে হবে। এ ধারণা থেকে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় লকডাউন পরিহার করার পথে যেতে চায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। লকডাউন অবস্থায় দেশের অর্থনীতি দারুণভাবে ভেঙে পড়বে এই আশঙ্কা থেকে সবকিছু থামিয়ে দিয়ে আর থাকতে চাচ্ছে না সরকার। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, লকডাউন বা সাধারণ ছুটি দিয়ে করোনাভাইরাসের লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। সম্ভব হচ্ছে না মানুষকেও আটকে রাখা। তিনি বলেন, বিশ্বের অন্য দেশগুলোও এখন লকডাউনের বিকল্প ভাবতে শুরু করেছে। উন্নত দেশগুলোও অর্থনীতির হুমকির কথা ভাবতে শুরু করেছে। ওই মন্ত্রী আরও বলেন, ‘করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এখনো কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার সম্ভব হয়নি। ফলে এই দুর্যোগ শিগগিরই কাটছে না। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে করোনা মোকাবিলায় নতুন কিছু ভাবতে হচ্ছে।’ আরেক মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত এর ভয়াবহতা কম-বেশি থাকবে। ততদিন মানুষকে ঘরে বসিয়ে রাখা যাবে না। ফলে সরকারকে ভাবতে হচ্ছে বিকল্প উপায়। তিনি বলেন, আপাতত স্বাস্থ্যবিধি মানা, সতর্কতা অবলম্বন করে মানুষকে চলতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে সঙ্গরোধ করে রাখা অব্যাহত থাকবে। পুষ্টিমান নিশ্চিত করে খাবার গ্রহণের বিষয়ও প্রচার করা হবে সরকারের পক্ষ থেকে।
এ প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, চলতি মে মাসে করোনায় সর্বোচ্চ আক্রান্ত হবে। এরপর পরিস্থিতি নিম্নমুখী হবে। তাই বিকল্প উপায়ে গেলেও পরিস্থিতি একেবারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এমন ধারণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো ও মানুষ যাতে আতঙ্কগ্রস্ত না থাকে এজন্যও প্রধানমন্ত্রী শিথিল পরিস্থিতির পক্ষে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারপ্রধান করোনা মোকাবিলায় কী করা যায় তা নিয়ে প্রতিনিয়ত ভাবছেন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কী করছে, কী ভাবছে এসবও পর্যালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন, সাময়িকী, গবেষকদের গবেষণার অগ্রগতি সবকিছু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন প্রধানমন্ত্রী। ওই কর্মকর্তা বলেন, সাধারণ ছুটি অব্যাহত রেখে মানুষকে ঘরে আটকে রেখে আসলে সে অর্থে সমাধান সম্ভব হচ্ছে না। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সচেতনতা, সতর্কতা অবলম্বন করে মানুষকে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক অবস্থায়, স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী। তিনি মনে করেন, অর্থনীতিও বাঁচাতে হবে, বাঁচাতে হবে মানুষকেও। এ দুটি বিষয় বিবেচনা করেই করোনা মোকাবিলার পথ ভাবছে সরকার।
এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অভ্যস্ত হতে হবে। সচেতন, সতর্কভাবে স্বাভাবিক কাজে নিশ্চয়ই ফিরতে হবে।
ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩১ মে থেকে ১৫ জুন সীমিত আকারে সবকিছু চালু করে স্বাস্থ্যবিধি কতটা নিশ্চিত করা যায় সেটাও দেখা হচ্ছে। এরপর প্রয়োজনে তা নিয়ে আরও কঠোর মনোভাব দেখানো হবে। আর সব ঠিকঠাক থাকলে স্বাস্থ্যবিধিই একমাত্র অবলম্বন হবে। এ প্রসঙ্গে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশ লকডাউন শিথিল করেছে। কোথাও কোথাও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও অর্থনীতির স্বার্থে লকডাউন শিথিল করেছে। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে জীবন-জীবিকার মাঝে সাযুজ্য বিধানের যে প্রয়াস চলছে তার থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। জনস্বার্থে সরকারের দেওয়া এ ছাড় ফ্রি-স্টাইলে অপপ্রয়োগ করলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
