চীনের কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও জাপানে কভিড-১৯ সংক্রমণের মাত্রা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ইউরোপ বা আমেরিকার অনেক দেশের মতো জাপানে দীর্ঘ সময়ের জন্য লকডাউনও আরোপ হয়নি। প্রাদুর্ভাব কমাতে কী ধরনের প্রস্তুতি ছিল জাপানের? লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
সংক্রমণের শুরু
চীনের উহানে যখন করোনা মহামারী শুরু হয়ে গিয়েছে তখনো জাপানে এর হাওয়া খুব একটা লাগেনি। জীবনের স্বাভাবিক চলাফেরাতেও কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। এমনিতেই জাপান বেশ সুশৃঙ্খল, পরিচ্ছন্ন আর কঠিনভাবে নিয়ম মানা একটি দেশ। তাদের রাস্তাঘাট নোংরা নয়, অন্য দেশের মতো হ্যান্ডশেক বা কোলাকুলি করে সম্বোধনের রীতিও তাদের নেই। ফ্লুয়ের আভাস বুঝলেই তারা মাস্ক ব্যবহার করেন। অনেক সাবধানী হওয়া সত্ত্বেও জাপান করোনার প্রভাব থেকে বাঁচতে পারেনি। ১৬ জানুয়ারি চীনের উহান শহর থেকে ফিরে আসা একজন জাপানি নাগরিকের প্রথম করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। তখন থেকেই সচেতন হয়ে ওঠে জাপান। কী করলে সংক্রমণের প্রভাব থেকে দূরে থাকা যাবে তাই নিয়ে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন মহলে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়। পদক্ষেপের কার্যকারিতা শুরু হতে না হতেই ফেব্রুয়ারিতে টোকিওর পাশের ইয়োকোহামা বন্দরে নোঙর করা প্রমোদতরী ডায়মন্ড প্রিন্সেস জাপানের পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। প্রমোদতরীতে ৩ হাজার ৭১১ জন যাত্রী ছিলেন। যাত্রীদের মধ্যে ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৬৯৬ জনই করোনায় আক্রান্ত। সবাইকে জাহাজে রেখেই সেবা দেওয়া হলেও ব্যাপকভাবে ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল তখনই। তবে যাত্রীদের সেবার ত্রুটি হয়নি। সেবা-শুশ্রƒষার জন্য ২ হাজার ৭০০ জন সেলফ ডিফেন্স ফোর্স নিয়োগ করা হয়েছিল। তাদের কেউই আক্রান্ত হননি। রোগী থেকে ডাক্তারদের সংক্রমণের হার ছিল শূন্য শতাংশ। সংক্রমণের কথা মাথায় রেখে দ্রুত চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে আগত পর্যটকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাপান। উহান ও এর আশপাশের বিভিন্ন শহরে অবস্থানরত জাপানি নাগরিকদের বিশেষ বিমানে করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থাও নিয়মানুযায়ী করা হয়। প্রথম দিকে নেওয়া এসব সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। তবে বিভ্রান্তির শুরু হয় ডায়মন্ড প্রিন্সেসের ঘটনায়। এতগুলো মানুষের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত কী হতে পারে সেটি নিয়ে অগোছালো কাজ চলছিল। ফলে মাত্র অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। জাপান সচেতন হয় ঠিক এ সময়ে এসে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টায় স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়, কর্মস্থলে লাগাম টানা শুরু হয়। তবু বৈশ্বিক মহামারী থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারেনি জাপান।
করোনা মোকাবিলায় জাপান
দেশটির সংবিধান অনুসারে লকডাউন আরোপের ক্ষমতা সরকারের নেই। করোনা পরিস্থিতিতে কোনো আদেশ মানার জন্য সরকার দেশের জনগণকে বাধ্য করতে পারে না। তারা শুধু অনুরোধ করতে পারে। তাই গত এপ্রিলে জাপানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। চলাফেরা করার জন্য কিছু নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়। যদিও এ নিয়মগুলো বিশ্বের সব জায়গায় মানার কথা বলা হয়েছিল শুরু থেকেই। সবার জন্য এগুলো নতুন হলেও জাপানের কিছু পুরনো অভ্যাসের কারণে নিয়ম মেনে নিতে খুব একটা বেগ তাদের পেতে হয়নি। এসব নিয়মের মধ্যে ছিল :
হ্যান্ডশেক বা কোলাকুলি করা যাবে না। জাপানিদের সংস্কৃতিতে বিদেশিদের মতো কোলাকুলি বা হ্যান্ডশেক করার বিষয়টি নেই। তারা দূর থেকে বাউ করে। এতে তাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব সব সময়ই কিছুটা হলেও বজায় থাকে। তাই এ পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে তাদের বেগ পেতে হয়নি।
হাত ধোয়া। জাপানের রেস্টুরেন্টগুলোতে প্রবেশের সময় প্রথমেই বাধ্যতামূলকভাবে একটি ভেজা টাওয়েল দিয়ে হাত মুছে নিতে হয়। কিছু শপিং মল, রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেটে হ্যান্ড স্যানিটাইজার আগে থেকেই রাখা থাকে। টয়লেটের বেসিনগুলোর ট্যাপ অধিকাংশই স্পর্শহীন সেন্সরে চলে। কাজেই সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনায় অনেক আগে থেকেই তারা সুরক্ষিত।
মাস্ক পরা। শীতকালে জাপানে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রভাব বেড়ে যায়। শিশু এবং বয়স্করা ঝুঁকিতে থাকেন। সে সময় পোলেন (পরাগরেণু) অ্যালার্জিজনিত কারণে এমনিতেই শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ প্রায় সবাইকেই মাস্ক পরতে হয়।
এসব বিষয়ে আগে থেকেই অভ্যস্ত থাকায় জাপানের জন্য করোনা মোকাবিলা করা সহজ হয়েছে। এছাড়া জনগণ জরুরি অবস্থাকে মেনে চলেছে সঠিকভাবে। এতকিছুর পরেও জাপানে প্রায় ১৭ হাজার মানুষ সংক্রমিত এবং ৮৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাই জাপানের সতর্কতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে অনেকের মনেই।
টিটিটি মডেল
১৬ জানুয়ারি জাপানে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর দুই সপ্তাহের মধ্যেই করোনা প্রতিরোধে ১২ সদস্যের একটি প্যানেল গঠিত হয়। সংক্রামক রোগের বিশেষজ্ঞ, গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, মানসিক বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী ও সমাজ বিজ্ঞানীসহ সবাই এ প্যানেলে ছিলেন। সবার পরামর্শে তৈরি হয় ন্যাশনাল স্ট্রাটেজি-টিটিটি (টেস্ট, ট্রেস, ট্রিট) মডেল। পিসিআর টেস্টের নীতি ঠিক করা হয়। কেবল যাদের ভাইরাসের উপসর্গ আছে ও ইন্টারনাল মেডিসিনের রেকমেন্ডেশন আছে অথবা যারা কোনো করোনা রোগীর ক্লোজ কন্টাক্টে ছিলেন, তারাই পিসিআর টেস্ট করাতে পারেন। বলা যায়, এই প্যানেলের নানা রকম সুপারিশ ইতিবাচক ফল নিয়ে আসে। প্যানেল থেকে নানা সুপারিশ দেওয়ার আগে দেশের ভেতর করোনা সংক্রমণ কীভাবে হচ্ছে তার উৎস খুঁজে দেখা হয়েছে। দেখা যায়, দেশের ভেতরে শুরুতে পশ্চিম জাপানের ওসাকায় ব্যাপকভাবে করোনা সংক্রমণ হয়েছে। মূলত ওসাকা ও আশপাশের এলাকায় সংক্রমণের কারণ হিসেবে জানা যায়, যেসব কনসার্ট হলে গায়ক এবং দর্শকরা কাছাকাছি অবস্থান করে গান-বাজনার তালে নাচে অংশ নিচ্ছেন, সেখান থেকে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এ তথ্য সামনে আসার পর দ্রুত এ ধরনের সব কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিনোদনের জনবহুল জায়গাগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয় নাগরিকদের। যারা এমন জনবহুল স্থানে কিছুদিন আগে গিয়েছেন তাদের সবাইকে স্থানীয় হাসপাতালে টেস্ট করতে অনুরোধ করা হয়।
কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং
কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর একটি পদ্ধতি। এতে রোগীদের বলা হয় তারা যেসব মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। করোনাভাইরাস মহামারীর ক্ষেত্রে, যেসব মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন তাদের স্বেচ্ছায় আইসোলেশনে যেতে বলা হয়। এটা সাধারণত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যদের ফোনের মাধ্যমে জানানো হয়। সঙ্গে একটা স্বয়ংক্রিয় লোকেশন ট্র্যাকিং মোবাইল অ্যাপও সংযুক্ত করা হয়। মহামারীর বিস্তার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই জাপানে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের ভূমিকাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। শুরুতে জাপান এতে খুব একটা জোর দেয়নি। তবে সংক্রমণ শনাক্তে এই কাজেই তারা নিযুক্ত করেছিল ৫০ হাজার প্রশিক্ষিত নার্সকে, এ নজির অন্য কোনো দেশে নেই। অন্য সময় ইনফ্লুয়েঞ্জা ও যক্ষ্মার সংক্রমণ শনাক্ত করাই ছিল তাদের কাজ। এপ্রিলে ভাইরাস দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়লে এবং মৃত্যুর সংখ্যা কোনোভাবেই নাগালে আনতে না পারায় এই পদ্ধতিকেই সহজ ভাবে জাপান। তখনই এ প্রশিক্ষিত নার্সদের কাজে লাগানো হয়।
হোক্কাইডো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কাজুতো সুজুকি বলেন, সিঙ্গাপুরের মতো এটি অ্যাপনির্ভর না হলেও দারুণ কাজে দিয়েছে এ পদ্ধতি। জাপানের এ সফলতার পর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সবে কন্ট্যাক্ট ট্রেসার নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে। অনুকরণীয় হলেও তারা এ কাজে বেশ দেরি করে ফেলেছে। সেদিক থেকে এগিয়ে ছিল জাপান। প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরেই জাপান তাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে লাগিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট একটি এলাকায় বা ক্লাব, হাসপাতাল থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে কি না সেগুলোর দিকে লক্ষ রাখার জন্যও জনবল আছে জাপানে। সরাসরি সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা না থাকলেও প্রাথমিকভাবে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ায় জাপান কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে।
‘থ্রি সি’ মন্ত্র
শুরুতে কিছুটা অগোছালো থাকলেও ভাইরাসের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়া প্রমোদতরী ডায়মন্ড প্রিন্সেসের ঘটনাকে হালকাভাবে নেয়নি জাপান। ঘটনার পর থেকেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের জন্য ঘটনাটি ঘরের ঠিক বাইরে রাখা গাড়িটির আগুনে পুড়ে যাওয়ার মতো ছিল। তবে জাপান বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি এমন অবস্থায়। বলতে হবে মাথা ঠাণ্ডা রেখেই কাজ করেছে তারা। সবাইকে ঘরবন্দি না করে বা চলাচলে হস্তক্ষেপ না করে থ্রি সি মন্ত্র অর্থাৎ ক্লোজড স্পেস, ক্রাউডেড স্পেস এবং ক্লোজড কন্ট্যাক্ট থেকে দূরে থাকা– এই তিন বিষয়কে মেনে চলতে বলা হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে সামাজিক দূরত্ব অনুসরণের মধ্যেই জাপানের এই মন্ত্রকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক সুজুকি।
করোনাভাইরাসের ভিন্ন স্ট্রেইন
মে মাসের শুরুর দিকে একটি গবেষণার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের বিভিন্ন ধরন পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ইউরোপজুড়ে ভাইরাসের যে স্ট্রেইন ছড়িয়েছে তা এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের স্ট্রেইন থেকে কিছুটা আলাদা। তবে এই গবেষণায় এখনো আরও পরীক্ষা বাকি। গত এপ্রিলে টোকিও শহরের এক হাসপাতালে কভিড-১৯ আক্রান্ত নয় এমন কয়েকজন রোগীকে পরীক্ষায় দেখা যায়, তাদের মধ্যে ৭ শতাংশ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। এর অর্থ যাদের কোনো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে না বা মৃদু অসুস্থতা রয়েছে তারাও মহামারীর মাত্রাকে বাড়িয়ে দিতে পারেন। এর মধ্যে ৫০০ লোকের অ্যান্টিবডি পরীক্ষা ফলাফল থেকে অনুমান করা হচ্ছে, সংক্রমণের বর্তমান যে পরিসংখ্যান দেখানো হচ্ছে প্রকৃত সংখ্যা এর থেকে ২০ গুণ বেশি হবে। আর আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে জাপানের ম্যানুয়াল কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং পদ্ধতি কাজে নাও দিতে পারে।
চিকিৎসা সুবিধা
জাপানের প্রত্যেক নাগরিককে বছরে একবার হেলথ চেকআপ করতে হয়। যা বাধ্যতামূলক। এই কাজটি করা হয় স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, হেলথ ক্লিনিকে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে জাপান অনেক আগে থেকেই সচেতন। দেশটিতে মেডিকেল সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী, ডাক্তার সবই পর্যাপ্ত। দেশটির সার্স ভাইরাস মোকাবিলার অভিজ্ঞতা থেকে সংক্রামক রোগের জন্যও প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা আছে। সব নাগরিক হেলথ ইনস্যুরেন্সের অন্তর্ভুক্ত। কম খরচে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব। পপুলেশন ম্যানেজমেন্টে পৃথিবীর সেরাদের দলে তারা। পপুলেশন ম্যানেজমেন্টে কার কী পরীক্ষা করা দরকার, কখন আর কতবার দরকার সবকিছুই আগে থেকে তৈরি আছে। তবে, করোনার ক্ষেত্রে পিসিআর টেস্ট কিট, আইসোলেটেড আইসিইউ, পিপিই জাতীয় বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন। জাপানে করোনা রোগী শনাক্ত হলে হাসপাতালে বাধ্যতামূলকভাবে ভর্তি হতেই হবে। চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বের হওয়ার নিয়ম নেই। জাপানে শুধু করোনার জন্য বেডের সংখ্যা ৩১ হাজার ২৮৯টি। ৪৭টি জেলার মধ্যে শুধু তিনটি জেলা (ইওয়াতে, ওয়াকায়ামা আর নাগাসাকি) ছাড়া সবগুলো জেলাতে করোনার জন্য ডেডিকেটেড বেড ক্যাপাসিটি (আইসিইউ) ৭ হাজার ৯৩৪টি। সবচেয়ে বেশি আছে টোকিওতে (২ হাজার ৮৬৫টি)। আর সবচেয়ে কম আছে আকিতা আর কোচি জেলায় (১৬টি)। এছাড়া আটটি স্পেশাল জায়গায় তৈরি হয়েছে ১০ হাজার ৩২০টি বেড।
জরুরি অবস্থা
গত ১৪ মে জাপানের ৪৭টি অঞ্চলের মধ্যে ৩৯টি থেকে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হয়েছে। জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে মডেল। প্রত্যেক আইনেই আইন প্রয়োগ করার জন্য শর্তের সঙ্গে আইন তুলে নেওয়ার জন্যও কিছু শর্ত থাকে। শর্তগুলো যেন ন্যায্য ও নিরপেক্ষ হয় সেজন্য সরকার বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগিয়েছে। তৈরি করেছে সর্বজনীন একটা মডেল। ওসাকায় তৈরি হয়েছে বলে এটার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওসাকা মডেল’। এ মডেল অনুযায়ী নতুন আক্রান্তের সংখ্যা গড়ে ১০ জনের কম, পিসিআর টেস্টে পজিটিভ হার গড়ে সাত শতাংশের কম ও আইসিইউ ব্যবহার ক্যাপাসিটির ৬০ শতাংশের কম হতে হবে। এমন অবস্থা টানা সাত দিন চলতে থাকলে সেই শহরের জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া যাবে। অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ধাপে ধাপে শুরু করতে পারবে।
নতুন জীবনযাত্রা
মহামারী থেকে বের হওয়ার জন্য জাপানিদের নতুন জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে। তিনি বলেন, ক্লোজড স্পেস, ক্রাউডেড স্পেস, ক্লোজড কন্ট্যাক্ট এই থ্রি সি এখন জন্য মেনে চলা খুব জরুরি। এগুলোর কোনো একটা কমে গেলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে। নতুন জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হওয়ার জন্য এখন থেকেই আমাদের চিন্তায় পরিবর্তন আনা জরুরি। হাতের কাছে সব সময় হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে এবং সেটি নিয়মিত ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। খাবারের স্যাম্পল দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। সবাইকেই নিজ নিজ ব্যবসার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
অর্থনীতির চাকা
যেহেতু টোকিও, হোক্কাইডোসহ বাকি এলাকাগুলোতেও জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হয়েছে তাই আশা করা যাচ্ছে সংক্রমণের হারের ওপর নজর রেখে দ্রুতই অর্থনীতির চাকা ঘুরবে জাপানে। জুলাইতেই তিন সপ্তাহের জন্য মোটামুটি সবকিছু খুলে দেওয়া হবে। জটিল কোনো সমস্যা দেখা না দিলে আগস্ট নাগাদ অর্থনীতি সচল হতে শুরু করবে জাপানে। জুলাই মাস দেশের মানুষের জন্য কভিড-১৯ এর সতর্কতা বজায় রেখে নতুন জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হওয়ার সময়। অন্যান্য জায়গায় এমন ঘোষণা থাকলেও একমাত্র ব্যতিক্রম টোকিও। ২৬ মে থেকে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার পরপর জুন মাসের শুরুতেই জিম, সিনেমা হল খুলে দিচ্ছে শহরটি। তবে লাইভ গানের শো নিয়ে এখনো কোনো তথ্য আসেনি। মিউজিয়ামগুলো ইতিমধ্যে খুলে দেওয়া হয়েছে। বুলেট ট্রেন এবং হাইওয়ের বাসগুলো ১ জুন থেকেই চলবে। স্টেডিয়ামে শিডিউল অনুযায়ী ১০ জুন থেকে খেলা শুরু হবে। আপাতত বেসবল এবং জে-লিগ শুরু করার কথা রয়েছে। স্টেডিয়ামে বেশি মানুষের প্রবেশ এখনই নয়। বেশি দর্শকসমৃদ্ধ খেলাগুলো শুরু হবে আগস্ট থেকে। টোকিওর রেস্টুরেন্টগুলো খোলা থাকবে রাত ১০টা পর্যন্ত। শিশুদের জন্য পার্ক খুলে দেওয়া হয়েছে টোকিওতে। আগস্টের শেষে বাইরের দেশ থেকে প্রবেশের অনুমতি মিলবে। বৈশ্বিক মহামারীতে অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে ওঠাটাই জাপানের জন্য এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটি প্রযুক্তি খাতেও অবদানের শীর্ষে যেতে চাচ্ছে এখন। এ জন্য ছোট বড় অনেক প্রতিষ্ঠানকেই সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ দেওয়া হচ্ছে। জাপানের অর্থনীতি সচল হওয়া শুরু হলে অন্য দেশগুলোও হয়তো জরুরি অবস্থার ঘোষণা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসবে।
