করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সঙ্গে মিল রেখে টানা ৬৬ দিন বন্ধ থাকার পর পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু হচ্ছে আজ রবিবার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অধীনে এটিই হবে প্রথম লেনদেন। নতুন কমিশনের সম্মতিতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে প্রতি কার্যদিবসে ৩ ঘণ্টা করে লেনদেন চলবে। তবে করোনাকালে ব্রোকারেজ হাউজে বিনিয়োগকারীদের সশরীরে উপস্থিতির পরিবর্তে ফোন, অনলাইন কিংবা মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে লেনদেনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হবে।
এদিকে এসইসির নতুন কমিশন এমন একটি সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে দেশ বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। করোনা সংক্রমণ রোধে সরকারের সাধারণ ছুটির কারণে শিল্প, কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যও দুই মাসের বেশি সময় বন্ধ ছিল। উৎপাদন ও পণ্য বিক্রি বন্ধ থাকায় তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানি লোকসানে পড়েছে।
অন্যদিকে পুঁজিবাজার গত আড়াই বছর ধরেই টানা দরপতনে রয়েছে। বিদেশিরাও বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। এ সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিশেষ করে ব্যাংক খাতে তারল্য-সংকট চলছে। ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের চেয়ে বেশি মনযোগী প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনা বাস্তবায়নে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সৃষ্ট আস্থাহীনতায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ফিরে গেছে ছয় বছর আগের অবস্থানে। আবার ড. এম খায়রুল হোসেনের কমিশন কর্র্তৃক তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের ফ্লোর প্রাইস বেঁধে দেওয়ায় লেনদেনও তলানিতে নেমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করে পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক লেনদেন ফিরিয়ে আনাই অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত নতুন কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এ বিষয়ে এসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখন একটি কঠিন সময় পার করছি। করোনার কারণে আমাদের অর্থনীতি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা যাতে আমাদের বাজারের ওপর আস্থা রাখেন, তারা যাতে ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি নিয়ে আসেন। তাদের কস্টের টাকা যাতে কোনোভাবেই ভুল বিনিয়োগে না যায়। আমরা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। একটি সুস্থ বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
এসইসির সম্মতি পাওয়ার পর আজ থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন শুরু হতে যাচ্ছে। করোনা-পরিস্থিতির কারণে ৬৬ দিন লেনদেন বন্ধ থাকার পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে আপাতত সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত লেনদেন চলবে। এ সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে প্রবেশের ব্যবস্থা থাকবে। তবে স্টক এক্সচেঞ্জ চাইছে, বিনিয়োগকারীরা সশরীরে ব্রোকারেজ হাউজে উপস্থিত না হয়ে বিকল্প উপায়ে লেনদেনে অংশ নিক।
এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী সানাউল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইতিমধ্যেই কভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে লেনদেন শুরু করতে ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তবে ঝুঁকি কমাতে আমরা বিনিয়োগকারীদের সশরীরে উপস্থিতিকে নিরুৎসাহিত করছি। এখন ফোনে, অনলাইনে কিংবা মোবাইলে লেনদেন করতে পারেন। আমরা বলছি, জরুরি না হলে বিনিয়োগকারীরা সশরীরে উপস্থিতির পরিবর্তে বিকল্প উপায়ে লেনদেনে অংশ নিতে পারেন। বিষয়টি আমরা ট্রেকহোল্ডারদের জানিয়ে দেব। পাশাপাশি ডিএসইর অনলাইন নিউজেও আহ্বান জানানো হবে।’
করোনাভাইরাসের প্রভাবে চলতি বছরের মার্চে মাত্র ১৩ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়। এতে গত ১৮ মার্চ সূচকটি ফিরে যায় সাড়ে ছয় বছর আগের অবস্থানে। এমন পরিস্থিতিতে আরও পতনরোধে সিকিউরিটিজের সর্বনিম্ন সীমা বেঁধে দিয়ে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে ড. খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কমিশন। এতে করে কোনো লেনদেন না হলেও গত ১৯ মার্চ অধিকাংশ সিকিউরিটিজের দর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে যায়। কৃত্রিমভাবে এই দরবৃদ্ধির কারণে সূচকও একইদিনে ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। অন্যদিকে ফ্লোর প্রাইসের কারণে শেয়ারের সর্বনিম্ন সীমা বেঁধে দেওয়ায় লেনদেনে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। এতে লেনদেন তলানিতে নেমে যায়। গত ২৬ মার্চ থেকে সরকারি সাধারণ ছুটি শুরু হলে স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেনও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ৬৬ দিন পর লেনদেন চালু হতে যাচ্ছে।
এদিকে সাধারণ ছুটির মধ্যেই মেয়াদ শেষ হওয়ায় ড. খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন এসইসি থেকে বিদায় নেয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বে নতুনভাবে কমিশন গঠিত হয়।
২০১০ সালে পুঁজিবাজার ধসের পর ২০১১ সালের ১৫ মে ড. খায়রুল হোসেন এসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন। তিনি যেদিন কমিশনের দায়িত্ব নেন, সেদিন ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি ছিল ৫৭৮৮ পয়েন্টে। পুঁজিবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় টানা নয় বছর খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন এসইসির দায়িত্বে থাকলেও বাজার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। উল্টো বাজে আইপিওসহ (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) খায়রুল কমিশনের বেশকিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আস্থাহীনতার প্রকাশ ঘটেছে। বিদেশি ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন নেমে আসে তলানিতে। গত ১৪ মে খায়রুল হোসেন এসইসির চেয়ারম্যানের পদ থেকে বিদায় নেন। তার বিদায়কালে স্টক এক্সচেঞ্জ স্বয়ংক্রিয় না থাকায় লেনদেন বন্ধ ছিল। তার আমলের শেষ কার্যদিবস গত ২৫ মার্চ ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটির অবস্থান ছিল ৪০০৮ পয়েন্টে। দীর্ঘ নয় বছরে পুঁজিবাজার থেকে অনেক বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হয়ে বিদায় নিয়েছেন। আর এ সময়ে ডিএসই হারিয়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ পয়েন্ট।
