করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারঘোষিত টানা ৬৬ দিনের ছুটি শেষে আজ রবিবার থেকে চালু হতে যাচ্ছে গণপরিবহন। এ অবস্থায় ক্রাইম ও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ঢেলে সাজানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিক কার্যক্রম চলমান রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন ও সাধারণ মানুষের চলাচলে নজর রাখার কথা জানানো হয়েছে। যদিও চলমান সাধারণ ছুটিতে সংগত কারণে বাংলাদেশ পুলিশের ক্রাইম ও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট কিছুটা ভিন্ন ছিল। সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় সীমিত আকারে চলবে। তবে অফিস খোলার পরের দিন থেকে সীমিত পরিসরে চলাচল শুরু করবে গণপরিবহনও। এ সুযোগে অনেকেই ঢাকামুখো হবেন। যেকোনো উপায়েই রাজধানীতে প্রবেশ করতে চাইবে দিনমজুর ও শ্রমবীবী মানুষ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আগের চেয়ে আরও দ্রুত বাড়ার এই সময়ে রাজধানীতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গতকাল শনিবার পর্যন্ত পুলিশের ৪ হাজার ৫৪৪ সদস্য কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ডিএমপিতে। তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পূর্ণ মনোবল নিয়েই মাঠে থাকবে তারা। এ জন্য নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রস্তুতি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন বাস্তবতা বিবেচনায় হয়তো আরও কিছুদিন এই করোনার সঙ্গে সহাবস্থান করতে হতে পারে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার জনস্বার্থে গণপরিবহন সীমিত আকারে চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং নতুন করে ছুটিও বাড়ানো হয়নি। ফলে জনগণের চলাচল বেড়ে যাবে, গণপরিবহনে অধিক হারে চলাচল শুরু হবে। এই বাস্তবতায় পুলিশকে অবশ্যই নতুন করে ট্রাফিক ও ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট আরও বেগবান করতে হবে। আমরা ট্রাফিক ও ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট নতুন করে ঢেলে সাজাচ্ছি। একই সঙ্গে করোনা নিয়ন্ত্রণের যে কার্যক্রম আমরা শুরু থেকে করে আসছিলাম, সেটা চলমান থাকবে। তিনি আরও বলেন, তবে এটা সত্য যে বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন সব মানুষের চলাফেরা বেড়ে যাবে, তখন এটি আমাদের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে যাতে গণপরিবহন ও সাধারণ মানুষ সরকারের যে স্বাস্থ্যবিধি রয়েছে তা যথাযথভাবে মেনে চলাচল করে। এ ক্ষেত্রে জনসাধারণের ও সংশ্লিষ্ট সবার সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া আমাদের যে লক্ষ্য সেটি অর্জন করা সহজ হবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকায় গণপরিবহন ও কর্মচাঞ্চল্য বাড়লে পুলিশের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, করোনা সংক্রমণের হারে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান ৯তম, আর ভারত চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ৫২তম থেকে এখন ১০ম অবস্থানে নেমেছে। এ থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিটা আমাদের কত? তারা আরও বলছেন, আমাদের মতো সীমিত সম্পদের দেশে দিন আনে দিন খায় এমন লোকের সংখ্যাই বেশি। তাদের অধিকাংশই করোনার প্রাদুর্ভাব রোধে প্রায় দুই মাসের বেশি সময় সাধারণ ছুটিতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অনেকে এত দিন ভেঙে খেয়েছে নিজস্ব সঞ্চয়। অনেকে সরকারি সহায়তা ও ত্রাণের ওপর নির্ভর ছিল। জীবিকার প্রয়োজনসহ নানা তাগিদে এসব মানুষ এখন ঢাকামুখো হবে, এটাই স্বাভাবিক।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, এখন একটু চ্যালেঞ্জিং হয়তো হবে। তবে করোনা প্রতিরোধের সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে ডিএমপির সদস্যরা কাজ করছেন ও চালিয়ে যাবেন। অপ্রয়োজনীয় লোক ঢাকায় প্রবেশ করতে পারবে না। সরকারের আরও কিছু নির্দেশনা রয়েছে। সে বিষয়ে আমরা কঠোর হব। তিনি আরও বলেন, সুরক্ষা ও চিকিৎসার বিষয়ে অনেক সচেতন রয়েছি আমরা। সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করেই ডিএমপির সদস্যরা কাজ করছেন। আক্রান্তদের জন্য চিকিৎসা ও সেবাব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আক্রান্ত অধীনদের পাশে বসে কথা বলছেন ও খোঁজ নিচ্ছেন। ফলে মনোবল বাড়ছে। ডিএমপিতে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেকই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এ ছাড়া ঝুঁকি কমাতে আমরা ডিএমপির ৩৪ হাজার সদস্যকেই কভিড-১৯ শনাক্তকরণ পরীক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছি। ৫ হাজারের মতো পরীক্ষা হয়ে গেছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনো নতুন কৌশল না নিলেও প্রয়োজনে তা নেওয়া হবে।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক গতকাল বলেন, কাল (আজ রবিবার) থেকে সব খুলে দেওয়া হলে তা মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ভাইরাসটি যেভাবে সংক্রমিত হয় লোক চলাচল বাড়লে এ ঝুঁকিটা বেড়ে যাবে। আমাদের বুঝতে হবে প্রয়োজনের অনুপাতে আমাদের পুলিশ বলেন, চিকিৎসক বলেন, অনেক কিছুর সংখ্যাই সীমিত। পুলিশকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণেই ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে এবার এর পাশাপাশি মহামারীতে মানুষকে ঘরে রাখা, আইন মানানো, লকডাউন, ত্রাণ কার্যক্রমসহ নানা কর্মকাণ্ড করতে হচ্ছে। স্বাভাবিক অবস্থায় পারলেও এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন। কারণ পুলিশও আক্রান্ত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঝুঁকিতে পড়বে। তবে সরকার যেহেতু দেশের চাকা সচল রাখতে এমন সিদ্ধান্তে গেছে। তাই করেনাভাইরাস প্রতিরোধে এ সম্মুখ যোদ্ধাদের সুরক্ষার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা ও তা কঠোরভাবে মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই। তাদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্র্তৃপক্ষকেও নিশ্চিত করতে হবে অধীনরা যেন পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিয়েই সেবা দিতে পারে। পুলিশকে শতভাগ পরীক্ষার আওতায় এনে র্যাপিড অ্যান্টিজেন বা অ্যান্টিবডি টেস্ট করাতে হবে। জনগণকে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে ও ঘরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
