কেমন হতে পারে করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারী পরবর্তী বিশ্ব? এমন প্রশ্ন নিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক আলোচনা হচ্ছে। করোনাভাইরাসের আক্রমণে বিশ্ব-অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি যেমন টলে গেছে, মানুষের সামাজিক সম্পর্কের চিরাচরিত রূপ যেমন পাল্টে গেছে তেমনি রাজনৈতিক সমীকরণের হিসাবও দেশে দেশে পাল্টে যাওয়ার আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নাগরিক জীবনে আগের মতো স্বাধীনতা নেই। রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ নিজের ইচ্ছের চেয়ে পরিস্থিতি ও আইনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র কর্তৃক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে এই ছাঁচেই গড়ে তোলা হচ্ছে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাঝে বিশ্বাসগতভাবে স্বাভাবিক জীবন প্রণালীতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বিষয়টি বৈধতা পাচ্ছে। এর ফলে এখন প্রাত্যহিক নাগরিকজীবন রাষ্ট্রীয় সার্ভিল্যান্সের আওতাভুক্ত হওয়ার বিষয়টি বৈধতা পেয়েছে। যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক সমাজে সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভখ্যাত গণমাধ্যমও বিভিন্ন কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে একদিকে যেমন নাগরিক জীবনে, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতন্ত্র ব্যাহত হচ্ছে অন্যদিকে গণমাধ্যমের নানা সংকটের কারণে গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন।
করোনাভাইরাস দেশে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রের হিসাব পাল্টে দিয়েছে। ‘সমাজ’ এখন গুরুত্বহীন হচ্ছে। জাতীয়তাবাদের আশ্রমে ভিড় বাড়ছে, রাষ্ট্র হচ্ছে কর্তৃত্ববাদী। বিশ্বের অনেক দেশেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির হাতে আরও অধিক ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। প্রকারান্তরে যা গণতন্ত্রকে একনায়কতন্ত্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমন ঘটনা যেমন ইউরোপে ঘটছে তেমনি ঘটছে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাসহ অন্যান্য অঞ্চলেও বাড়ছে। গত ৩০ মার্চে ইউরোপের দেশ হাঙ্গেরির পার্লামেন্টে আইন পাস করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানকে জরুরি প্রয়োজনে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই আইন অনির্দিষ্টকালের জন্য। এজন্য তাকে কোনো ধরনের জবাবদিহি করতে হবে না। এ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ওরবান ইচ্ছা করলে দেশের প্রচলিত আইনের বিরুদ্ধেও যেতে পারবেন। প্রয়োজনে সংবিধান স্থগিতসহ যে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন। যা প্রকারান্তরে একনায়কতন্ত্র। তিনি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পুরো ক্ষমতা নিজের হাতে কব্জা করেছেন। কেবল হাঙ্গেরি নয়, অনেক দেশেই ক্ষমতাসীনরা এ ধরনের আইন পার্লামেন্টে পাস করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন। রাশিয়া, আজারবাইজান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, পোল্যান্ড, ইসরায়েল ও তুরস্কের মতো দেশ যারা নিজেদের গণতন্ত্রের প্রতি ‘কমিটমেন্টে’র কথা বলে তারাই এসব কাজ করছে। দেশগুলোতে সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ আইন প্রণয়ন, শীর্ষ নেতার হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, পার্লামেন্টের ক্ষমতা হ্রাস, বিরোধীদের ধরপাকড়, অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় থাকার ব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যমে কণ্ঠরোধ করার মতো চরম গণতন্ত্র পরিপন্থি কাজ করছে। করোনা পরিস্থিতি তাদের সবার জন্য এ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কারণ এর প্রতিবাদে জনগণ রাস্তায় নেমে আসতে পারছে না। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের চাপে ও আর্থিক কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমও স্বাভাবিক সময়ের মতো স্বাধীন থেকে ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
আজারবাইজানে প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ ২০০৩ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন। দেশটিতে করোনাভাইরাসের কারণে সভা-সমিতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুতার্তে গত মার্চে আইন পাস করে নিজের হাতে প্রবল ক্ষমতা নিয়েছেন। সামাজিক দূরত্ব বাস্তবায়নে তিনি অত্যন্ত কড়াকড়ি করছেন। মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে গুলি করার নির্দেশও দিয়েছেন। তিনি করোনাকালীন সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছেন। পার্লামেন্টে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে জরুরি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। দেশটিতে সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ করতে প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে নতুন ডিক্রিও জারি করেছেন। পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজের ক্ষমতা আরও বাড়িয়েছেন। হাঙ্গেরির মতো একদলীয় পথে হাঁটছে ইউরোপের অপর দেশ পোল্যান্ড। দেশটিতে নতুন আইন করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন ‘ল’ অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি’ হু’র সব ধরনের পরামর্শ উপেক্ষা করে জুন মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে। করোনার দোহাই দিয়ে বিরোধী দলকে কোনো নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে দিচ্ছে না। এই সুযোগে দলীয় প্রার্থী আন্দ্রেই দুদাকে জিতিয়ে নিতে চায়। গত ৩ এপ্রিল ওয়াশিংটন পোস্ট হুন সেন, ভিক্টর ওরবান, দুতার্তের নাম উল্লেখ করে বলেছে, উক্ত রাষ্ট্রনায়করা ক্রমে নিজ দেশকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন।
১৯৮৫ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন করোনা পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে নিজের ক্ষমতা আরও পোক্ত করেছেন। তিনি বিরোধী দল ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণাসহ সব শীর্ষস্থানীয় নেতাকে জেলে বন্দি করে একদলীয় শাসন চালুর পথে হাঁটছেন। বর্তমানে দেশটিতে বিরোধী দল বলতে কিছু নেই। এই পরিস্থিতি করোনাকালে আরও গতি পেয়েছে। রাশিয়ায় করোনা পরিস্থিতিতে কাজে লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন নতুন নতুন আইন তৈরি করছেন। মূলত তিনি এসবের আড়ালে আইনের দোহাই দিয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা পোক্ত করছেন। দেশটিতে করোনা মোকাবিলার জন্য চীনের মতো নাগরিকদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। যা মূলত ফেসিয়াল রিকগনাইজেশন টেকনোলজির সার্ভিল্যান্সকে বৈধতা দিচ্ছে। একই কাজ করছে সিঙ্গাপুরের সরকার। দেশটিতে নাগরিকদের ‘ডাটা’ সংগ্রহ করা হচ্ছে। মহামারী মোকাবিলায় রাষ্ট্রের এমন উদ্যোগ মানুষ মেনেও নিয়েছে।
অন্যদিকে করোনার কারণে দেশে দেশে নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। সান্ধ্য আইন, গণজমায়েতে নিষেধাজ্ঞা, ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, পার্কে বা অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্রে যাতায়াত বন্ধকে আর গণতন্ত্র পরিপন্থী মনে করা হচ্ছে না। ইইউ কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভেরা জুরোভা এ সত্য স্বীকার করে বলেছেন, ইউরোপের দেশগুলোয় এখন ‘জরুরি আইন’ কার্যকর করেছে। যা এখন আর স্বৈরশাসনের অংশ মনে করা হচ্ছে না। একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক পদ্ধতির রাজনীতি থেকে অনেক দেশের ক্ষমতাসীনরা সরে আসছেন, নাগরিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৈধতা পাচ্ছে অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে। ফলে করোনা-পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতিতে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী হবে সেটাই এখন আশঙ্কার বিষয়।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
