টানা ৬৬ দিন বন্ধের পর রবিবার থেকে খুলেছে অফিস, দোকানপাট ও মার্কেট। গত বুধবার ‘ঈদের ছুটির পর আর সাধারণ ছুটি বাড়ছে না’ সরকারের এমন ঘোষণার পর থেকেই দীর্ঘদিন ছুটির আমেজে এবং গ্রামের বাড়িতে থাকা মানুষ অস্থির হয়ে পড়েন কর্মস্থলে ফেরার জন্য। অনেকেই এ তথ্য শোনার পর থেকে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, পণ্যবাহী পিকআপ ভ্যান, এমনকি সিএনজি অটোরিকশায়ও শহরের দিতে রওনা হন। এর মধ্যে সীমিত আকারে লঞ্চ চালু করায় ২৯ মে থেকেই ঘাটে ভিড় দেখা যায়। অনেক বেশি ভাড়ায় মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এমন জায়গায় নিয়েও যাত্রা করে কর্মস্থলের উদ্দেশে। এরই মধ্যে দীর্ঘদিন গ্রামে থাকা মানুষের যাতায়াতের হয়রানি কমাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত হয়। সঙ্গে সঙ্গে দাবি জোরালো হয় গণপরিবহনের বড় জায়গা বাস চালুর। সরকারের পক্ষ থেকে মালিকদের প্রস্তাব দেওয়া হয়, বিধি মেনে অন্যন্য সময়ে তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ যাত্রী নিয়ে বাস চালু করার। মালিকপক্ষ রাজি হয়। তবে সেটা ৮০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে। এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকের পর গতকাল থেকে ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে বাস চালুর সিদ্ধান্ত হয়।
একইভাবে সচিবালয়সহ অন্যান্য সরকারি অফিস, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, মার্কেট, বাজার, দোকানপাট স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু গত রবি ও গতকাল সোমবার দুদিনেই রাজধানীসহ দেশের সব বিভাগীয় শহর এবং গ্রামগঞ্জে স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনা একেবারেই ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে গতকাল চালু হওয়ার পর বেশি ভাড়া আদায় এবং আগের মতোই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে বাস চলতে দেখা যায়। সেই সঙ্গে জোর করে যাত্রীদের বাসে উঠতে দেখা যায়। বাসের ড্রাইভার, হেলপার ও যাত্রীদের মধ্যে তুমুল মারামারি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল সরেজমিন বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল এবং রেলস্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, সরকারের নির্দেশনার কোনো ধারই ধারেনি পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ ও যাত্রীরা। রেল স্টেশনের ভেতরে ও ট্রেনের ভেতরে নিয়ম পালন করা হলেও স্টেশনের বাইরে হুড়োহুড়ি। আর দোকাপাট, বাজার, অফিস পাড়ায়ও কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি।
এ পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে আবারও লকডাউনে ঘোষণা করা উচিত। তারা বলেন, রাজধানীতে করোনার সংক্রমণ বেশি। আবার এটাই কর্মসংস্থানের বড় জায়গা। ফলে এখানে ঢালাওভাবে সবকিছু খুলে দেওয়া ঠিক নয়। আর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা অসম্ভব। বিশেষ করে ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে যাত্রীদের কোনো উপকার হবে না। এরা গাদা গাদা লোক টানবে এবং সঙ্গে ১০ টাকার ভাড়া ১৬ টাকা নেবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকালই প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আরও দুয়েক দিন দেখে প্রয়োজনে আবারও লকডাউন দিতে পারে। এদিকে গত তিন দিনে সচিবালয়, সংসদ সচিবালয় এবং প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তার করোনা আক্রান্তের ঘটনায় প্রশাসনও কিছুটা উদ্বিগ্ন। গতকাল জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই সরকার সবকিছু সীমিত আকারে খোলার নির্দেশ দিয়েছে। এখন থেকে অফিসে একসঙ্গে ২৫ শতাংশ লোক থাকবে। তবে গণপরিবহনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা এ বিষয়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন। প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা দেওয়া হচ্ছে।
গতকাল থেকে শুরু হয়েছে সিটি সার্ভিসসহ গণপরিবহন চলাচল। সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব পরিবহন পরিচালনার নির্দেশনা থাকলেও সেটা পুরোপুরি অনুসরণ করতে দেখা যায়নি। তবে এ ক্ষেত্রে বাসের আসন ফাঁকা রাখার যে নির্দেশনা ছিল সেটি অনুসরণ করতে দেখা গেছে। এছাড়া স্বাস্থ্যবিধি পালন হচ্ছে কি না সেটি দেখার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো মনিটরিং তেমন চোখে পড়েনি। গতকাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘরে ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিন সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে গণপরিবহনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশে বাসে যাত্রীদের উঠতে দেখা গেছে। হেলপাররা আগের মতো করেই টেনে টেনে যাত্রী তুলছে। এ সময় কোনো পরিবহনে জীবাণুনাশক ছিটাতে দেখা যায়নি। তবে পরিবহনগুলো বের হওয়ার আগেই জীবাণুমুক্ত করে রাখা হয়েছে।
সায়েদাবাদ টার্মিনালে ৮ নম্বর রুটের বাসচালক হোলাল মিয়া জানান, তাদের মিনিবাসগুলো সার্ফএক্সেল ও ডেটলমিশ্রিত পানি দিয়ে জীবাণুমুক্ত করেছেন। তারা মালিকের কাছ থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার পাননি। যাত্রীদের তারা লাইন মেনে বাসে ওঠাচ্ছেন এবং সবাইকে মাস্ক পরতে বলছেন। পাশাপাশি দুটি সিটে কাউকে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। হেলাল আরও জানান, কিছু স্টপেজে যাত্রীরা তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করেন।
মতিঝিল-মোহাম্মদপুর রুটের সিটি বাসের চালক সেকান্দর বলেন, ‘যাত্রী কম। আমরাও মানুষকে ডাকাডাকি করি না। যাত্রীদের দূরত্ব বজায় রাখতে অনুরোধ করছি। বাসের এক সিট পরপর বসতে অনুরোধ করছি। যাদের মুখে মাস্ক নেই তাদের উঠতে দিচ্ছি না।’ বাসে ওঠার সময় যাত্রীদের কেন হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া হচ্ছে না এমন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মালিক এখনো দেননি। তবে তারা দোকান থেকে হেক্সিসল কিনেছেন।
করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যেই অফিস খোলা ও গণপরিবহন সীমিত আকারে চলাচলের সরকারি সিদ্ধান্তের পর বাসের ভাড়া ৮০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করে সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। পরে রবিবার সড়ক যোগাযোগ ও সেতু বিভাগ ২০ শতাংশ কমিয়ে সব ধরনের বাস ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
তরঙ্গ পরিবহনের যাত্রী ইসলাম বলেন, ‘মোহাম্মদপুর থেকে বনশ্রীতে বোনের বাসায় যেতে বাসে উঠেছেন। যেসব স্বাস্থ্যবিধির কথা বলা হয়েছে সেগুলো পুরোপুরি পালন করা হচ্ছে না।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘আজকের (গতকাল) সার্বিক পরিস্থিতি অনেক ভালো। যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেগুলো পুরোপুরি পালনের চেষ্টা চলছে। দূরপাল্লার গাড়িগুলোও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালানো হচ্ছে। আমি এবং আমাদের মালিকরা সব স্থানেই তদারকি করছি। মহাখালীসহ বিভিন্ন টার্মিনালে জীবাণুমুক্ত টানেল স্থাপন করা হয়েছে। যাত্রীদের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর যারা স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করবে তাদের গাড়ি রাস্তায় নামতে দেওয়া হবে না।’
সদরঘাটে বেহাল দশা : এদিকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গতকাল ছিল যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ছোট-বড় ৭৫টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে ও ভিড়েছে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্র্তৃপক্ষ। তারা জানায়, পন্টুনে উপচেপড়া ভিড় হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হচ্ছে না। দুপুরে সদরঘাটে গিয়ে দেখা যায় বিকেলের লঞ্চ ধরতে মানুষ দলে দলে টার্মিনালের দিকে হেঁটে চলেছে। তাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব দূরে থাক, করোনা আক্রান্ত হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে কোনো বিধিই মানা হচ্ছে না। বেশিরভাগেরই মাস্ক থাকলেও সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। প্রয়োজনের তুলনায় লঞ্চ কম হওয়ায় ভিড় বেশি বলেও বলছেন তারা।
সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টায় লঞ্চের সময় থাকলেও যাত্রী এসে হাজির হয়েছেন দুপুর ১২টায়। আবদুর রশিদ পরিবার নিয়ে বরিশাল যাবেন। পরিবারের সবাই মাস্ক পরে আছেন। কিন্তু একটু পরপর সেটি খুলে হাতে রাখছেন। তিনি বলেন, ‘লঞ্চ সব ছাড়বে শুনে আগেভাগে এসেছি। পরিবার নিয়ে যাত্রা করব বলে এসে এখন দেখি ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই।’ করোনার মধ্যে নিয়ম না মেনে এ ভিড়ে থাকা কতটা নিরাপদ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘উপায় নেই। এর মধ্যে কিসের নিয়ম মানতে বলেন?’ চাঁদপুরগামী যাত্রী ফয়সাল বলেন, ‘ভিড় দেখে ভয় লাগছে। কিন্তু গ্রামে যেতেই হবে। একটু সাইডে দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু এই পন্টুনে এত মানুষ, আলাদা থাকার কোনো সুযোগই নেই। কর্র্তৃপক্ষের কোনো দিকনির্দেশনা আমি গত দুই ঘণ্টায় দেখিনি। মানুষজন সবাই নিজে থেকে সব মানবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।’
ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের যুগ্ম পরিচালক আরিফউদ্দিন বলেন, ১০ নম্বর পন্টুনসহ কিছু পন্টুনে যাত্রীদের ভিড় আছে। এখান থেকে হাতিয়া-বেতুয়ার লঞ্চ ছাড়ে। এ দুটো লঞ্চ ৫টা ও সাড়ে ৫টায় ছাড়ার কারণে যাত্রীদের ভিড় বেশি হয়। বাকি পন্টুনগুলোয় স্বাভাবিকের চেয়েও কম যাত্রী আছে। এ লাইনে যে কয়টি লঞ্চ ছাড়ার কথা তার মধ্যে মাত্র একটি যাবে। ফলে উপচেপড়া ভিড় ঠেকানো যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিধি মানা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বাকি ঘাটগুলোয় কোনো সমস্যা নেই। ভোর ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ৪৮টি লঞ্চ এসেছে। ছেড়ে গেছে ২৭টি।
ট্রেনে সামাজিক দূরত্ব : গতকাল দ্বিতীয় দিনে আটটি আন্তঃনগর ট্রেন ঢাকায় এসেছে। বিকেলে ও রাতে এগুলো আবার ফিরে যায়। কমলাপুর রেল স্টেশনের কর্মকর্তারা জানান, ৫০ ভাগ আসন বাধ্যতামূলকভাবে খালি রেখে ট্রেন চলছে। কোথাও একজনও বাড়তি যাত্রী তোলা হচ্ছে না। অনেক স্টেশনে অতিরিক্ত যাত্রী ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করেন। রেলওয়ে পুলিশ তাদের ফিরিয়ে দেয়।
ঢাকা থেকে যারা বিভিন্ন জেলায় গেছেন ট্রেনে ওঠার আগে তাদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয়। স্টেশনে প্রবেশ করতে হয় সামাজিক দূরত্ব মেনে। প্রথম দিনে ঢাকায় আসা যাত্রীরা জানিয়েছেন, ট্রেনে সামাজিক দূরত্ব মেনেই যাত্রী পরিবহন করা হয়েছে।
রেলওয়ের পুলিশের ঢাকা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দুদিনে কমলাপুর থেকে যে কটি ট্রেন এসেছে এবং ছেড়ে গেছে আমরা সেগুলোতে যাত্রীদের পুরোপুরিভাবে সামাজিক দূরত্ব মানাতে বাধ্য করেছি। মাস্ক ছাড়া কাউকে ট্রেনে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না। ওমর ফারুক আরও বলেন, ট্রেন ছাড়ার আগে আমি নিজে ও আমার সিনিয়র-জুনিয়র অফিসার এবং রেলওয়ে পুলিশের সদস্যরা স্টেশনে হাজির থেকে কার্যক্রম তদারকি করছি। এখনো সেরকম কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। কিন্তু যাত্রীর চাপ অত্যধিক বাড়লে স্বাস্থ্যবিধি মানা কতটুকু সম্ভব হবে বোঝা যাচ্ছে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি যাতে যাত্রীরা স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি অনুসরণ করেন।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধাপে ধাপে সবকিছু চালু করলে ভালো হতো। কাজ হারানোর ভয়ে অফিস খোলার কথা শুনে গ্রাম থেকে মানুষ আসতে শুরু করেছে। তাছাড়া এমনিতেই স্বাভাবিক সময়ে গণপরিবহনে সংকট থাকে। বাসগুলোতে দেড়গুণ লোক উঠে। লঞ্চেও একই অবস্থা। এটা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। আর দুই মাসের বেশি সময় আয় ছিল না এসব গণপরিবহনে, এখন ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধিতে পুষিয়ে নিচ্ছে। এখানে শৃঙ্খলা না আনতে পারলে কঠিন অবস্থা হবে।
