সাতক্ষীরার বেড়িবাঁধ সংস্কারে বড় উদ্যোগ

আপডেট : ০২ জুন ২০২০, ০৬:০৩ এএম

সুপার সাইক্লোন আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরার বেড়িবাঁধ (পোল্ডার) সংস্কারে তড়িঘড়ি করে বড় উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এজন্য অনুমোদন পেতে পাচ্ছে ৪৭৫ কোটি টাকার প্রকল্প। যেখানে অনেক আগে থেকেই সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের বাসিন্দারা জলোচ্ছ্বাস থেকে নিজেদের রক্ষায় শক্ত করে বাঁধ পুনর্নির্মাণের আকুতি জানিয়ে আসছিলেন। এখন এই শতাব্দীর সুপার সাইক্লোন আম্পানের পর তড়িঘড়ি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটি আগে অনুমোদন পেলে আম্পানে সাতক্ষীরার এত ক্ষতি হতো না। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আম্পান গত ২০ মে বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত আনার পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে সাতক্ষীরার  শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের। আম্পানের প্রভাবে ১০ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে গেছে উপকূল রক্ষার বাঁধ। পানির তোড়ে ধসে গেছে ঘরবাড়ি, ভেসে গেছে মাছের ঘের। বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। জেলার যত জায়গায় সুপেয় পানির উৎস ছিল, লোনা পানি ঢুকে সব নষ্ট করে দিয়েছে। আম্পান চলে যাওয়ার পর জেলার অনেকেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে বেড়িবাঁধ সংস্কারে নেমেছেন। যতগুলো বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সবগুলোর সংস্কারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এমন প্রেক্ষাপটে বাঁধ সংস্কার সংক্রান্ত একটি প্রকল্প অনুমোদন পেতে চলেছে। আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ভার্চুয়াল সভায় ৪৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সাতক্ষীরায় বাঁধ পুনর্নির্মাণ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই ৪৭৫ কোটি টাকা জোগান দেওয়া হবে। ২০২৩ সাল নাগাদ প্রকল্পের কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১, ২, ৩ নম্বর পোল্ডার। ৬, ৭ ও ৮ নম্বর পোল্ডারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আম্পানের প্রভাবে এসব পোল্ডারের মোট ৭৭টা পয়েন্ট ভেঙে গেছে। সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে ২৩টি পয়েন্ট। এসব পোল্ডার সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায় অবস্থিত। যদিও জেলার মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে এরইমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পোল্ডারগুলোর সংস্কারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘সাতক্ষীরা জেলার ১, ২, ৩ পোল্ডার এবং ৬, ৭, ৮ নম্বর পোল্ডার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ শিরোনামের প্রকল্পটির আওতায় ১১৩ কিলোমিটার বাঁধ পুনঃআকৃতি করা হবে। অর্থাৎ যেসব বাঁধ আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব বাঁধ নতুন আকৃতিতে তৈরি করা হবে। উদাহরণ দিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, যে বাঁধ ছয় ফুটের আছে, সেই বাঁধের উচ্চতা বাড়িয়ে ১২ ফুট করা হবে। প্রস্থে তিন ফুটের বাঁধ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় ১১৩ কিলোমিটার বাঁধের আগে যেখানে নিচু ছিল, সেখানে উঁচু করা হবে। যেখানে বাঁধ চিকন ছিল, সেখানে দ্বিগুণ প্রশস্ত করা হবে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, এই প্রকল্পের আওতায় ৮৮টি খাল পুনঃখনন করা হবে। এছাড়া বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর ৬০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। এরমধ্যে বেতনা নদী পুনঃখনন করা হবে ২০ কিলোমিটার। বাকি ৪০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে মরিচ্চাপ নদীর। এছাড়া এই প্রকল্পের আওতায় স্লুইস গেট মেরামত করা হবে ৬টি। আর ২১টি রেগুলেটর মেরামত করা হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মন্টু কুমার বিশ্বাস বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ায় গত আড়াই মাস একনেক সভা হতে পারেনি। তাই প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন পায়নি। এই প্রকল্পের আওতায় শুধু বাঁধ পুনর্নির্মাণই নয়, সাতক্ষীরা জেলার জলাবদ্ধতা নিরসনেও কাজ করা হবে। যেসব জায়গায় বাঁধ ছয় ফুট আছে, সেসব জায়গায় বাঁধ দ্বিগুণ উঁচু করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, প্রকল্পটি আজ একনেক সভায় অনুমোদন পেলে প্রশাসনিক আদেশ জারি থেকে শুরু করে অন্যান্য আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও এক থেকে দুই মাস সময় লাগবে। ততক্ষণে পুরো বর্ষাকাল। ফলে চাইলেই আগামী অক্টোবর কিংবা নভেম্বরের আগে প্রকল্পটির কাজ শুরু করা সম্ভব হবে না। পানিসম্পদ ও পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি যদি আগে অনুমোদন করা যেত, তাহলে আম্পানে সাতক্ষীরার এত ক্ষতি হতো না। আম্পানে বেড়িবাঁধ ভাঙার পর টনক নড়ল সংশ্লিষ্টদের।

পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা শনাক্ত হয়। আর প্রথম করোনা সংক্রমণে মারা যায় ১৮ মার্চ। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে গত আড়াই মাস ধরে চলেছে সাধারণ ছুটি। ফলে ছুটির কারণে একনেক সভাও হতে পারেনি। দীর্ঘ আড়াই মাস পর আজ ফের একনেক সভা হতে যাচ্ছে। তবে সভা হবে ভার্চুয়াল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থাকবেন গণভবনে। আর অন্য মন্ত্রী ও সচিবরা থাকবেন রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে। তবে সব মন্ত্রী ও সচিবকে থাকতে হবে না। শুধু যারা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট, তারাই থাকবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত