পরিবেশ দূষণের এ যুগে পরিবেশবান্ধব অথচ অফুরন্ত জ্বালানির স্বপ্ন মানুষকে আরও উদ্যোগী করে তুলছে। সূর্যের মতো পৃথিবীর বুকেও হাইড্রোজেন ফিউশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চলছে একাধিক প্রচেষ্টা। বেশ কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা সেই শক্তি কাজে লাগানোর চেষ্টা করে চলেছেন।
মৌলিক বিজ্ঞান অনুযায়ী সূর্যের মতো অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা, যথেষ্ট ঘনত্ব ও সময়ের কারণে হাইড্রোজেন পরমাণু একটির সঙ্গে আরেকটি মিলে হিলিয়াম সৃষ্টি করে। সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ জ্বালানিও সৃষ্টি হয়। সমুদ্রের পানি থেকে হাইড্রোজেন পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ এভাবে অফুরন্ত কাঁচামাল কাজে লাগানো যেতে পারে।
এ পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা ‘ফার্স্ট লাইট ফিউশন’ কোম্পানির প্রধান নিকোলাস হকার বলেন, ‘ফিউশন আসলে প্রচলিত পারমাণবিক প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রে ভারী কোনো মৌলিক উপাদান স্পিøটিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জ্বালানি ছাড়ে। তার ফলে যা পাওয়া যায়, তা সামলানো বেশ কঠিন। ফিউশন এমন কোনো “চেন রি-অ্যাকশন” নয়। পালাবার কোনো পথ থাকে না বলে মেল্টডাউন ঘটে।’
কোনো ফিউশনভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কাগজে-কলমে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় নিরাপদ। এর কারণ খুব সহজ। ফার্স্ট লাইট ফিউশন কোম্পানির জানলুকা পিসানেলো বলেন, ‘প্রচলিত পরমাণু জ্বালানি ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া আটকে রাখতে বিশাল উদ্যোগ নিতে হয়। অন্যদিকে ফিউশনের ক্ষেত্রে সেই প্রতিক্রিয়া চালু রাখতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়।
সেই সমস্যার সমাধান করতে প্রোজেক্টাইল মোশনের গতিবেগ এতটাই বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ফিউশন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যেতে পারে। একটি কিউবের ছোট বুদ্বুদের মধ্যে হাইড্রোজেন বন্ধ রাখতে চান গবেষকরা। প্রোজেক্টাইল যখন সেকেন্ডে প্রায় ১৫ কিলোমিটার গতিবেগে কিউবের ওপর আছড়ে পড়বে, তখন সেই কিউবের শক্ত উপাদান তরলের মতো আচরণ করবে। বুদ্বুদের মধ্যে গ্যাস সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে প্রবল চাপ সৃষ্টি করবে। গবেষকদের আশা, এমন অবস্থায় ফিউশন প্রক্রিয়া ঘটবে। নিকোলাস হকার বলেন, কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে প্রত্যেক লক্ষ্যবস্তু এক পিপে তেলের সমান জ্বালানি তৈরি করবে। এটাই হলো এনার্জি ফিউশন।
কাগজে-কলমে প্রত্যেকটি ক্ষুদ্র কিউব প্রায় ৬ গিগাজুল মাত্রার উত্তাপ বা নির্মল জ¦ালানি সৃষ্টি করবে। এর মাধ্যমে একটি রেফ্রিজারেটরের তিন বছরের বেশি জ¦ালানির চাহিদা মেটানো সম্ভব। ফিউশনভিত্তিক জ্বালানির স্বপ্ন বাস্তবে রূপান্তর করতে আরও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। যেমন ফ্রান্সের দক্ষিণে আইটার নামের আন্তর্জাতিক প্রকল্পের আওতায় বিশাল এক গবেষণামূলক চুল্লি তৈরির কাজ চলছে। সেখানে কমপ্রেশন প্রযুক্তির বদলে উত্তাপের মাধ্যমে হাইড্রোজেন ফিউশনের চেষ্টা চালানো হবে। এ ধরনের চুল্লিকে টোকামাক বলা হয়। বিশাল ফাঁপা আংটির মতো দেখতে চক্রের মধ্যে অত্যন্ত গরম হাইড্রোজেন প্লাজমা ভরে দেওয়া হবে। ত্বরিতগতিতে চক্রাকারে সেটি ঘুরতে থাকবে এবং শক্তিশালী চুম্বকের মাধ্যমে তার অবস্থান স্থির রাখা হবে। প্রায় ১০ বছর ধরে আইটার প্রকল্পের চুল্লি নির্মাণের কাজ চলছে। চলতি দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম পরীক্ষার জন্য সেটি প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার কথা।
