বিচ্ছিন্ন লকডাউন আসতে পারে

আপডেট : ০৪ জুন ২০২০, ০২:১০ এএম

কঠোর শর্ত ও নির্দেশনা মেনে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী অফিস, দোকানপাট, গণপরিবহন খোলার অনুমতি দিয়ে বিপাকে পড়েছে সরকার। গত চার দিনে সংক্রমণ, শনাক্ত ও মৃত্যুর হারে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সবকিছু খুলে দেওয়ার পর প্রথম দিনের মৃত্যু ও শনাক্ত ছিল রেকর্ড ছাড়ানো। আবার সচিবালয়সহ অফিসগুলোতে রোস্টার বা কত শতাংশ একসঙ্গে অফিস করবে এরকম কোনো নির্দেশনা না থাকায় সবাই কর্মস্থলে এসেছে। ফলে প্রথম দিন সচিবালয়েই স্বাস্থ্যবিধির বালাই ছিল না। গতকাল বুধবারও মৃত্যুর রেকর্ড ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আর শনাক্তের হার বেড়ে হয়েছে ২১ শতাংশের বেশি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সচিবালয়ের একাধিক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ পরিস্থিতিতে করোনা নিয়ন্ত্রণে ছুটি বাড়ানো এবং লকডাউনের সিদ্ধান্তে ফিরতে যাচ্ছে সরকার। তবে এখনই নয়। আরও অন্তত পাঁচ থেকে সাত দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এ ঘোষণা দেবে। তবে এবার পুরো ছুটি কিংবা পুরো লকডাউন নয়, এলাকাভিত্তিক লকডাউন এবং আগের মতো সীমিত পরিসরে অফিসে লোকজনের উপস্থিতির নির্দেশনা আসবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঈদের আগে থেকেই দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন খুলে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা দাবি করতে থাকেন। তাদের নিয়ে দফায় দফায় মিটিং করা হয়। করোনা প্রতিরোধে গঠিত টেকনিক্যাল কমিটির পরামর্শ নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি ঠিক রেখে কীভাবে সবকিছু খুলে দেওয়া যায় সেই ব্যাপারে নির্দেশনাও তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ঈদের আগে মার্কেট খোলা রাখতে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি। সেই সময় অনেক দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনীতির কথা চিন্তা করে সরকারপ্রধান শর্ত দিয়ে সবকিছু খুলে দিয়েছেন। কিন্তু জনগণ এবং সংশ্লিষ্টরা কেউই শর্তের তোয়াক্কা করছেন না। আবার প্রতিদিন করোনা শনাক্তের হার ওপরের দিকে উঠছে। সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর হার। কাজেই পরিস্থিতি খারাপ হলে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংক্রমণের মাত্রা থামাতে না পারলে স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়বে। গত এক সপ্তাহ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর মধ্যে জোন করার সিদ্ধান্ত এসেছে। স্বাস্থ্য পরামর্শকরা এলাকাভিত্তিক লকডাউন এবং একেবারেই সীমিত আকারে চলাচলের ওপর জোর দিয়েছেন। তারা বলেছেন, গণপরিবহন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক হতে হবে। না হয় পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। যেহেতু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে সেহেতু এদের আলাদা করতে কমিউনিটি আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাপক অবনতি ঘটলে তো লকডাউন বা ছুটির বিকল্প কিছু থাকবে না। সবাইকে বুঝতে হবে আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো চালিয়ে নেওয়ার জন্যই সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। মানুষ যাতে মাস্ক পরে নিরাপদ দূরত্বে থাকে, আমরা সেটা বলছি। সবার জীবন-জীবিকার কথা মাথায় রেখে নির্দেশনাগুলো মানলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। যখন মানুষ এটা করতে ব্যর্থ হবে এবং এটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে তখন তো ঘরে থাকা ছাড়া উপায় থাকবে না। সংক্রমণ যাতে না বাড়ে সেজন্য আমরা ব্যাপকভাবে চেষ্টা করছি। ছোট দেশ বিশাল জনসংখ্যা, ম্যানেজ করা কঠিন হচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে পুলিশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করেছি।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) ও করোনাসংক্রান্ত মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, আমরা পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন দেখব। এ ব্যাপারে গঠিত টেকনিক্যাল কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেব। আর পরিস্থিতির উন্নতি হলেও তো কোনো সমস্যা নেই। তবে অবনতি হতে থাকলে আমরা বসে তখন করণীয় সিদ্ধান্ত নেব।

টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণপরিবহনের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে বিপদ অনেক বাড়বে। রোগটা কমিউনিটিতে ব্যাপক হারে ছড়িয়েছে। ঈদের আগেই সবকিছু খোলার ব্যাপারে যখন দাবি ওঠে তখন আমরা নির্দেশনাগুলো ঠিক করে দিয়েছি। কিন্তু কিছুই মানা হচ্ছে না। গত সাত দিনের মতো যদি সংক্রমণ বাড়ে তাহলে নতুন করে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেহেতু সব খুলে দিয়েছে এবং অর্থনীতির কথা চিন্তা করে লকডাউন এবং ছুটি ঠিক করতে হবে সে ক্ষেত্রে সারা দেশে এলাকাভিত্তিক লকডাউন দিতে হবে। কমিউনিটি আইসোলেশনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। যাতে সংক্রমিতরা ভাইরাসটাকে বেশি দ্রুত অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে না পারে। গণপরিবহনের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম মানতে হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে এ বার্তা গত দুদিন আগেই সরকারপ্রধানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। লকডাউনে ও গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলার কথাও বলা হয়েছে। আরও পাঁচ-সাত দিন পরিস্থিতি দেখে উচ্চপর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

প্রসঙ্গত, মার্চ মাসের শুরুতে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী প্রথম ধরা পড়ে। পরিস্থিতি ক্রমে অবনতির দিকে যেতে থাকলে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এরপর দফায় দফায় ছুটি বাড়তে থাকে। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী গত ৩০ মে ছুটি শেষ হয়।

সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্ততপক্ষে গত সাত দিনে মন্ত্রীদের তথ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে আক্রান্তের ঘটনায় আরও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রথম দিনের অফিসের পরই একসঙ্গে ২৫ শতাংশের অফিস করার পাল্টা একটি প্রজ্ঞাপন দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তাতেও সংক্রমণের গতি থামেনি। এ পর্যায়ে গতকাল আরেকটি নির্দেশনা দেওয়া হয় কারও কাজ দুই ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে গেলে তিনি কর্মস্থল ত্যাগ করবেন। আর কেউ যদি অফিস বাসা থেকে করতে পারেন তাও মেনে নেওয়া হবে।

এদিকে সরকারি অফিসগুলোতে লোক সমাগমের নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব হলেও গণপরিবহন এবং দোকানপাটসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের আর্থিক বিষয় বিবেচনায় বাসের ভাড়া ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাবও মেনে নিয়েছে সরকার। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি।

জানা গেছে, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের পরিবহন মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, দ্রুত গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না আনতে পারলে সরকার আবারও কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে। এছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মানতে জনগণকে সচেতন করে তোলা এবং স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার সহযোগিতাসহ দলের নেতাকর্মী ও দলসমর্থিত জনপ্রতিনিধিদের পাঁচ দফা সাংগঠনিক নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ প্রতিপালনে দলের সাধারণ সম্পাদক এ সাংগঠনিক নির্দেশনা দেন। এর আগে সোমবার ওবায়দুল কাদের এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘হুড়োহুড়ি, বাড়তি যাত্রী হওয়া, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে দেশকে আরও সংকটে নিমজ্জিত করতে পারে। আমি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সংকটে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপনের অনুরোধ জানাচ্ছি। আমাদের অসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানায় পরিস্থিতির যদি আরও অবনতি হয় তাহলে জনস্বার্থে সরকার আবারও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত