করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকারঘোষিত সাধারণ ছুটিতে বন্দরে আটকে পড়া কনটেইনারে ডিটেনশন চার্জ অনাদায়ে নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে দুই দফা নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা অনুসরণ করছে না শিপিং লাইনগুলো। নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনকে জরুরি চিঠি পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারি স্থবির হয়ে যায়। এ সময় আটকে পড়ে বিপুল পরিমাণ কনটেইনার। এ পরিস্থিতিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ কনটেইনারের ওপর স্টোর রেন্ট শতভাগ মওকুফের ঘোষণা দিলেও শিপিং লাইনগুলো ফ্রি টাইমের অতিরিক্ত সময়ের জন্য কনটেইনারের ওপর ডিটেনশন চার্জ আরোপ করে। এতে বড় আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েন আমদানিকারকরা।
নৌপরিবহন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বিষয়টি একাধিক ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ এপ্রিল নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম সাধারণ ছুটিকালে কোনো ধরনের কনটেইনার ডিটেনশন চার্জ আদায় না করার জন্য শিপিং লাইনগুলোকে নির্দেশনা দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করেন। কিন্তু এতে শিপিং লাইনগুলোর পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বিষয়টি নিয়ে গত ১৭ মে নৌপরিবহন অধিদপ্তরে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে সভা করেন মহাপরিচালক। সভায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম আবুল কালাম আজাদ, বিজিএমইএ পরিচালক হাসান আবদুল্লাহ ছাড়াও বাংলাদেশ শিপার্স কাউন্সিল, শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় করোনা পরিস্থিতি ও সাধারণ ছুটির কারণে ৩০ মে পর্যন্ত কনটেইনার ডিটেনশন চার্জ না আদায়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এর আগে আদায় করা ডিটেনশন কিংবা ডেমারেজ চার্জ সমন্বয় করারও নির্দেশনা দেন ডিজি শিপিং।
শিপিং এজেন্টরা জানিয়েছেন, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের এ নির্দেশনার বিষয়টি বৈদেশিক প্রিন্সিপালকে অবহিত করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ মে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন মার্সক বাংলাদেশ ২৬ মার্চ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত কনটেইনার ডিটেনশন চার্জ ৫০ শতাংশ মওকুফের ঘোষণা দেয়। বিষয়টি তারা গ্রাহকদের চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়। ইতিপূর্বে যারা শতভাগ চার্জ পরিশোধ করেছে, তাদের বাড়তি অর্থ সমন্বয় কিংবা ফেরত দেওয়া হবে বলেও চিঠিতে জানানো হয়। কিন্তু অন্যান্য শিপিং লাইন এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো ঘোষণা দেয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করার বিষয়টি উল্লেখ করে সম্প্রতি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে তৈরি পোশাক খাতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাসহ বন্দর থেকে দ্রুত পণ্য খালাসের নিমিত্তে কনটেইনার ডিটেনশন চার্জ আদায় না করা এবং আদায় করা অর্থ সমন্বয়ের বিষয়ে শিপিং লাইনগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য বন্দর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ জুন বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের কাছে চিঠি পাঠায় বন্দর। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালকের (ট্রাফিক) দপ্তর থেকে পাঠানো চিঠিতে নৌপরিপহন অধিদপ্তরের দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, কনটেইনার ডিটেনশন চার্জ মওকুফের ক্ষমতা শিপিং এজেন্টদের নেই। বিদেশি প্রিন্সিপালরাই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের জারি করা সার্কুলারটি বিদেশি প্রিন্সিপালদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তারা যে সিদ্ধান্ত দেবে এজেন্টরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
জাহাজ থেকে আমদানি পণ্যের কনটেইনার বন্দরে নামানোর পর শিপিং কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে ১৪-২১ দিন পর্যন্ত ফ্রি টাইম থাকে। ওই সময়ের মধ্যে পণ্য ডেলিভারি নিয়ে কনটেইনার খালি করে শিপিং লাইনকে কনটেইনার হস্তান্তর করলে তাতে কোনো চার্জ থাকে না। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কনটেইনার বুঝিয়ে দিতে না পারলে শিপিং লাইনগুলো বিভিন্ন হারে ডিটেনশন চার্জ আদায় করে থাকে।
