ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলে উদ্বেগ কাটছে না গ্রাহকের

আপডেট : ০৫ জুন ২০২০, ০৩:২৭ এএম

করোনাভাইরাস উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বকেয়া বিদ্যুৎ বিলে জরিমানার বিষয়টির সুরাহা হলেও অতিরিক্ত বিল নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না গ্রাহকের। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও এখনো সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দেয়নি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো। ফলে দুর্যোগকালীন সময়ে রাজধানীসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় করোনাঝুঁকি নিয়ে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে ধরনা দিচ্ছেন অনেকেই।

এ বিষয়ে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানির মধ্যে তিনটির বক্তব্য পাওয়া গেছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে মিটার না দেখে আনুমানিক হারে বিদ্যুৎ বিল করায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। আগামীতে বিল সমন্বয়ের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে কোম্পানিগুলো।

করোনাভাইরাস সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটির ঘোষণার পর পরবর্তী দুই মাসের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রাখার সুযোগ দেয় সরকার। এ সময়ের জন্য গ্রাহককে জরিমানা গুনতে হবে না বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে গত মে মাসে বিতরণ কোম্পানিগুলো জরিমানাসহ বিদ্যুৎ বিল গ্রাহকদের পাঠায়।

ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এপ্রিল ও মে মাসের বিল আগের মাসগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। আর গ্রামে প্রতি মাসে যে বিল করা হতো তার সঙ্গে অতিরিক্ত ২০০ টাকা যোগ করে দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর পল্টন এলাকার বাসিন্দা আরিফ আহমেদ জানান, আগে তার বাসায় মাসে বিল আসত ১ হাজার ২০০ টাকার কম। কিন্তু এপ্রিল মাসের বিলে সেটা হয়েছে ১ হাজার ৭৫০ টাকা। তিনি বলেন, ‘কীভাবে এ বিল করা হলো? এমনিতে করোনায় চরম আর্থিক সংকটে আছি। গ্রাহকরা তো কেউ বলেনি বিল বাকি রাখা হোক। সরকার নিজেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন দ্বিগুণ বিল ধরে দুই-তিন মাসের বিল পরিশোধ করবে কে?’

শংকর এলাকার বাসিন্দা শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘আমার ছোট পরিবার। আয়ও সীমিত। কোনো মাসে ৫০০ টাকার বেশি বিল আসেনি। অথচ মার্চ-এপ্রিল দুই মাসে বিল এসেছে ১ হাজার ৭৬৫ টাকা। তারা অনুমান করে বিল ধরবে আর তার খেসারত কেন সাধারণ মানুষ দেবে?’

দিনাজপুর থেকে নাসরিন সুলতানা ও কুমিল্লা থেকে শামীমা নাসরিন জানান, এক মাসের বিলে অন্তত ২০০ টাকা অতিরিক্ত এসেছে। এজন্য ক্ষোভে তারা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেননি।

এ নিয়ে সর্বত্র সমালোচনা শুরুর হলে বিষয়টির সুরাহা করেন বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। গত ৩১ মে সচিবালয়ে তিনি বলেন, ‘চলতি জুন মাস পর্যন্ত বিদ্যুতের বকেয়া বিলে জরিমানা নেওয়া হবে না।’ এরপর পিছু হটে বিতরণকারী কোম্পানিগুলো। একইদিন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ভুতুড়ে বিলের বিষয়টি সমন্বয় অথবা নতুন বিল ইস্যু করে সমাধানে বিতরণকারী কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিলেও বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি।

জানা গেছে, বিল নিয়ে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে গ্রাহকদের একটি বার্তা পাঠানো হয়েছে। ওই বার্তায় বলা হয়েছে, বর্তমান বিলের সঙ্গে গ্রাহকের প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ কম বা বেশি অথবা কোনো অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হলে পরবর্তী মাসের বিলের সঙ্গে তা সমন্বয় করা হবে। কোনো অবস্থাতেই ব্যবহৃত বিদ্যুতের বেশি বিল গ্রাহককে পরিশোধ করতে হবে না।

তিন কোম্পানির বক্তব্য : এ বিষয়ে ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অতিরিক্ত যে বিলের বিষয়টি বলা হচ্ছে সেটা ইচ্ছাকৃত নয়। আমাদের কোম্পানির ১৭ জন কর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। তারা গ্রাহক পর্যায়ে যেতে পারছে না। ফলে গড় হিসাব ধরে বিল করা হয়েছে। এতে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।’

এ বিষয়টির সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মে মাসের যে বিল তৈরি হচ্ছে সেটি মিটার দেখে প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে সে অনুযায়ী যোগ-বিয়োগের পর অতিরিক্ত বিল সমন্বয় করা হবে। দুয়েক দিনের মধ্যে গ্রাহকরা সমন্বয় করা বিল হাতে পেয়ে যাবেন।’ এ নিয়ে গ্রাহকদের দুশ্চিন্তা না করারও অনুরোধ জানান তিনি।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানি ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শফিকউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি অনাকাক্সিক্ষতভাবে হয়েছে। তবে গ্রাহকদের প্রতি আমাদের অনুরোধ, এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। প্রয়োজনে নতুন বিল ইস্যু করে টাকা নেওয়া হবে।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাওসার আমীর আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংকট নিরসনে ইতিমধ্যে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। গ্রাহক তার নিজের রিডিং দেখে আমাদের এসএমএস, ইমেইল অথবা অন্য কোনো উপায়ে জানালে সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেটা ঠিক করে দেব। এ ক্ষেত্রে আমাদের বিলের কাগজে দেওয়া টেলিফোন নম্বরে তারা ফোন দিতে পারেন। আর মে মাসের বিল রিডিং দেখে করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

এদিকে বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন নারায়ণগঞ্জের গ্রাহকরা। বিষয়টি সুরাহার জন্য স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে ভিড় করছেন তারা। তাদের ভাষ্য, এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর মিলছে না। এ নিয়ে গত ২ জুন গণশুনানির আয়োজন করে ডিপিডিসির নারায়ণগঞ্জ শীতলক্ষ্যা জোন। এতে গ্রাহকরা বিল প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান।

ওই শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন ফতুল্লা এনওসিএস সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কামাল হোসেন। মিটার না দেখে বিল করায় এ সমস্যা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তিন মাস যাবত বিদ্যুৎ বিল বকেয়া আছে। চলতি জুনের মধ্যে বিল শোধ না করলে ডিপিডিসি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।’ এজন্য গ্রাহকদের যথাসময়ে বিল পরিশোধের অনুরোধ করেন তিনি। তবে ভুতুড়ে বিলের কী হবে, এ বিষয়ে কিছু বলেননি প্রকৌশলী কামাল হোসেন।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিলের ভোগান্তি নিরসনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে চিঠি দিয়েছে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ক্যাবের জ¦ালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, যেকোনো পাবলিক বডির কাছে পেশ করা কোনো নাগরিকের যেকোনো আবেদনপত্র ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হতে হবে, ক্যাবের করা রিট মামলায় হাইকোর্টের এমন আদেশ হয়েছে। ফলে কমিশন দ্রুত তাদের আবেদনের পক্ষে পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত