‘করোনা ইউনিটে’ আগুন লেগে ৫ মৃত্যু

তদন্ত কমিটি ইউনাইটেডের ‘মারাত্মক অবহেলা’ পেয়েছে

আপডেট : ০৬ জুন ২০২০, ০৩:৩২ এএম

রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের ‘করোনা ইউনিটে’ অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে কর্র্তৃপক্ষের ‘মারাত্মক গাফিলতি ও অবহেলা’ খুঁজে পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তদন্ত কমিটি। সেখানে চিকিৎসাধীন পাঁচজনেরই প্রাণহানির জন্য হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে দায়ী করা হচ্ছে তাদের প্রতিবেদনে। আগামীকাল রবিবার কমিটি সংস্থার মহাপরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। কমিটির প্রধান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গত ২৭ মে বুধবার রাতে রাজধানীর গুলশানের এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তদন্ত প্রতিবেদনও শিগগির দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির প্রধান গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল আহাদ। আলোচিত ওই ঘটনা তদন্তে পরদিন বৃহস্পতিবার ফায়ার সার্ভিস এবং ৩০ মে শনিবার ডিএমপিও একটি তদন্ত কমিটি করে। দুই কমিটিরই সাত কার্যদিবসে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির প্রধান দেবাশীষ বর্ধন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অবহেলাজনিত মৃত্যুর কারণ, অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও প্রতিকারের বেশকিছু সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছি। রবিবার (৭ জুন) আমরা প্রতিবেদন জমা দেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা রোগীর স্বজন, হাসপাতালে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ২০ জনের সাক্ষ্য নিয়েছি। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বিভিন্ন আলামত ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছি। আমরা গুলশান বিভাগের পুলিশের সঙ্গেও তদন্তের বিষয়ে সমন্বয় করছি।’ তিনি জানান, পুরনো একটি এসি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। তারা  এ বিষয়ে হাসপাতালের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কথা বলেছেন।

ডিএমপি তদন্ত কমিটির প্রধান আবদুল আহাদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। যথাসময়ই জমা দেওয়া হবে। তদন্তের প্রয়োজনে রোগীর স্বজন ও হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ২৫ জনের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গত বুধবার রাতে ভারনন অ্যান্থনি পলের জামাতা রোনাল্ড মিকি গোমেজ বাদী হয়ে অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে একটি মামলা করেন। সেটিও আমরা খতিয়ে দেখছি।’

ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা সংক্রমিত বা উপসর্গ সংবলিত রোগীদের রাখার জন্য আলাদা আইসোলেশন করতে দায়সারাভাবে কাজ করেছে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। এটা উচ্চমাত্রার ঝুঁকি ছিল। যে পাঁচজন মারা গেছেন তাদের সানশেডের ঠিক নিচে রাখা হয়েছিল। অস্থায়ীভাবে তৈরি ওই ইউনিটের পার্টিশনগুলো পারটেক্স জাতীয়, যা ছিল অতিমাত্রায় দাহ্য। আগুন যখন লেগেছে তাৎক্ষণিকভাবে একসঙ্গে পুরোটায় লেগে যায়। দায়িত্বরত কর্মকর্তারা নিজের প্রাণ বাঁচাতে সবাই বেরিয়ে নিরাপদে চলে যান। আগুন লাগার পর একজন রোগীও বের হতে পারেননি। সেখানে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ অতিদাহ্য অনেক পদার্থ রাখা ছিল। যার ফলে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তা দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালটির নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলেও তারা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেনি। তাছাড়া নতুন যে আইসোলেশন ইউনিট বা করোনা ইউনিট করা হয়েছে সেটার ফায়ার সনদ ছিল না।’

অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো মুক্তিযোদ্ধা ভারনন অ্যান্থনি পলের জামাতা রোনাল্ড মিকি গোমেজ বাদী হয়ে গুলশান থানায় গত ৩ জুন বুধবার রাতে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ এনে মামলা করেন। মামলায় হাসপাতালের চেয়ারম্যান, এমডি, সিইও, পরিচালক, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্স, সেফটি ও সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আসামি করা হয়েছে।

মিকি গোমেজ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোগীদের আইসোলেশন কক্ষটিতে কোনো ফায়ার এক্সিট বা জরুরি নির্গমন পথ ছিল না। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ কর্র্তৃক রোগী বের করার কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বা তারা কোনো রোগীকে বের করতে সহযোগিতাও করেনি। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অস্থায়ীভাবে নির্মিত আইসোলেশন ইউনিটটি বৈধ কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি ও ফায়ার অ্যাপ্রুভাল ছিল না। ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির কাছেও এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

লাশ মর্গে রাখার বিল দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন জানিয়ে মিকি গোমেজ বলেন, ‘লাশ হস্তান্তরে অসহায়তা করা হয়। মর্গের বিল ছাড়াও প্রায় দেড় লাখ টাকার একটি বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ বিলের স্পেসিফিকেশন না দেখাতে পারায় আমি বিল দিইনি।’

তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো অনুমতি ছাড়াই আলাদাভাবে হাসপাতালটিতে করোনা ইউনিট খোলা হয়েছিল। যদিও কর্র্তৃপক্ষ দাবি করেছে তাদের অনুমোদন ছিল। বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে তদন্ত করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত