বিয়র্ন বর্গ : ঘাস আর ধুলার কোর্টের রাজা

আপডেট : ০৬ জুন ২০২০, ০৫:২০ এএম

কোনো দিন অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জেতেননি। ফ্ল্যাশিং মিডোতেও সফল নন। এমন একজনকে কি সর্বকালের সেরা বলা যায়? যায়, কারণ তিনি বিয়র্ন বর্গ, যিনি ছিলেন ঘাস আর ধুলার কোর্টের রাজা। আজ তার জন্মদিন।

সব মিলিয়ে ১১টা গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছেন। উইম্বলডন পাঁচটি। ফরাসি ওপেন ছয়টি। চারবার ইউএস ওপেন ফাইনাল খেললেও জিততে পারেননি। একবার তো জিমি কনর্সকে প্রায় হারিয়ে দিয়েছিলেন। ইনজুরির কারণে পারেননি। খেলার সময় বুড়ো আঙুলে এমন ব্যথা পেলেন যে র‌্যাকেট ধরতে পারছিলেন না। পেইন কিলার খেয়েও কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত ইনজেকশন নিতে হয়েছিল। ইউএস ওপেন না জেতার কারণ হিসেবে এখনো ভাগ্যকে দায়ী করেন বর্গ, ‘আমি খুব দুর্ভাগা। ফ্ল্যাশিং মিডোয় খেলতে গেলে প্রায় প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে ইনজুরিতে পড়তাম। যে কারণে শিরোপা জিততে পারিনি।’ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে অবশ্য দুর্ভাগ্যের কোনো গল্প নেই। এক রহস্যময় কারণে ফাইনাল দূরের কথা তৃতীয় রাউন্ডের বাধা টপকাতে পারেননি বর্গ।

বিয়র্ন বর্গের বয়স তখন ২৩। টানা তিন উইম্বলডন জেতা শেষ। অল ইংল্যান্ড ক্লাব কোর্টের প্রেস রুমে সাংবাদিকরা জানতে চাইলেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। উত্তরে বর্গ বলেছিলেন, ‘আমি চাই লোকে যেন সর্বকালের সেরা টেনিস তারকা হিসেবে আমায় মনে রাখে।’ সুইডেন তারকার স্বপ্ন কিন্তু পূরণ হয়েছে। আধুনিক টেনিস যতই নাদাল-ফেদেরার-জকোভিচের গল্প হোক, বিয়র্ন বর্গ এখনো কিংবদন্তি। আধুনিক যুগের গ্রাফাইট র‌্যাকেট ছাড়াই দুরন্ত সার্ব করতে পারতেন। পেশাদারি মনোভাবের সঙ্গে অ্যাথলেটিজম মিলিয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতেন। তাছাড়া বর্গ-বেকার-ম্যাকেনরোদের হাত ধরেই তো পেশাদার টেনিসে পাওয়ারের আমদানি হয়েছিল।

বর্গ টেনিস তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন মাত্র ৯ বছর বয়সে। সুইডেনের শহর স্টকহোমে মুদির দোকান চালাতেন বর্গের বাবা রুনে। স্থানীয় পর্যায়ে একটা টেবিল টেনিস টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে তিনি চ্যাম্পিয়ন হন। পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন র‌্যাকেট। সেটাই তুলে দিয়েছিলেন ছেলে বিয়র্ন বর্গের হাতে। ৯ বছরের বালকের জন্য র‌্যাকেটের ওজন বেশি ভারী ছিল। সেই র‌্যাকেট নিয়েই বাড়ির গ্যারাজ ডোরে সার্ব করতেন বর্গ। সেই সময় সুইডের আর আমেরিকার ডেভিস কাপ ফাইনাল চলছিল। বর্গ পরে বলেছেন, ‘আমার মনে আছে গ্যারাজ ডোরে টানা পাঁচবার বল মারতে পারলে সুইডেন পয়েন্ট জিতত। আর চারবার মেরে থামলে পয়েন্ট পেত আমেরিকা।’

নজরে আসতে ১৪ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল বর্গকে। সেই বয়সে সুইডেনের সব জুনিয়র টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতে সারা ফেলে দিয়েছিলেন। উইম্বলডনের জুনিয়র শিরোপাও জেতেন। মাত্র ১৫ বছরে সুইডেনের ডেভিস কাপ দলে বর্গের অভিষেক। জুনিয়র উইম্বলডন টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়ে প্রথম জনপ্রিয়তা টের পান। মিষ্টি চেহারার কিশোর বর্গকে পেয়ে পাগলের মতো টানাটানি করেছিল ব্রিটেনের স্কুলপড়–য়া মেয়ের দল।

১৯৫৬ সালের ৬ জুন বর্গের জন্ম স্টকহোমে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ফরাসি ওপেন জিতে সারা ফেলে দেন। পরের বছর জিতেছিলেন টেনিসের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ। সেবার দেশকে ডেভিস কাপের শিরোপাও এনে দেন। বর্গ প্রথম উইম্বলডনের শিরোপা জেতেন ২০ বছর বয়সে। ১৯৩১ সালে সিডনে উডের পর আর কেউ এত অল্প বয়সে ঘাসের কোর্টে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি। টানা পাঁচবার উইম্বলডন জিতেছেন বর্গ। ঘাসের কোর্টে ১৯৭৭ সালে তিনি জিমি কনর্সকে হারিয়েছিলেন। প্রথম দুই সেট হারের পর ঘুরে দাঁড়ান। এরপর তৃতীয় সেটে আবার ৪-৪ অবস্থায় কামব্যাক করেন। পরের বছর কনর্সকে সরাসরি সেটে হারিয়েছিলেন। উইম্বলডনে ওটাই বর্গের সেরা ম্যাচ।

প্রথম উইম্বলডন জেতার পরই রোমানিয়ার টেনিস সুন্দরী মারিয়ানা সিমনেস্কুর প্রেমে পড়েন। তাদের বিয়ে হয় ১৯৮০-তে। সেই বিয়ে চার বছরের বেশি টেকেনি। ১৯৮৫ সালে সুইডিশ মডেল জেনিক বোর্লিংকে বিয়ে করেন বর্গ। দ্বিতীয় বিয়েও স্থায়ী হয়নি। বর্গ ২০০২ সালে তৃতীয় বিয়ে করেন প্যাট্রিসিয়া ওস্টফেল্ডকে, যা এখনো টিকে আছে।

বর্গ একবার বলেছিলেন, ‘টেনিসে উন্নতি করতে হলে দরকার বড় হৃদয়। মানে খেলাটাকে পাগলের মতো ভালোবাসতে হবে।’ সেটা কেমন? শোনা যায় পেশাদার জীবনে ম্যাচের আগে তো বটেই, ম্যাচ শেষ হলেও প্র্যাকটিস করতেন বর্গ। প্র্যাকটিসই তাকে পারফেক্ট করেছিল। এরপর মাঠে যা করতেন তা টেনিসের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত